বেশিরভাগ মানুষেরই চা ছাড়া দিন শুরু হয় না। তবে দুধ চা বা লাল চা ছাড়াও বেশ িকছু ভেষজ চা বা হার্বাল টি রয়েছে, যেগুলি খেলে স্বাদ তো বদলাবেই, শরীরও ভালো থাকবে। পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এই ধরনের ভেষজ চা সারাদিনে অন্তত একবার হলেও খেতে পারেন। লিখেছেন কোচবিহারের নাটাবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতালের সিনিয়ার আয়ুর্বেদিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ বাসবকান্তি দিন্দা।
ভেষজ চা টিসানেস নামে পরিচিত। থেরাপিউটিক পানীয় হিসেবে এই চা ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ভেষজ চা ক্যাফিনমুক্ত। ঐতিহ্যবাহী িচনা সংস্কৃতিতে শরীরের শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য পঁাচ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভেষজ চা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি আয়ুর্বেদে ভেষজ চা চিকিৎসার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তৈরির পদ্ধতি
ভেষজ উদ্ভিদের ফুল, অপরিণত ফল, পাতা, বীজ এবং শিকড়ের মতো ভোজ্য তাজা বা শুকনো অংশগুলিকে গরম জলে ফুটিয়ে ভেষজ চা তৈরি করা হয়। ফলে উপকারী যৌগগুলি নিষ্কাশিত হতে পারে। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের উপাদানগুলিকে ৫ থেকে ১৫ মিনিট জলে ফোটানো হয়। তারপর ছেঁকে খাওয়া হয়।
কোন চায়ে কী উপকার?
আদা চা
তৈরির পদ্ধতি – এক কাপ জলে ১ চা চামচ আদা গুঁড়ো মিশিয়ে ইনফিউশন বা আদা চা তৈরি করা হয়।
উপকারিতা – আদা চা হজম প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে। ফেনল উদ্বায়ী তেল, জিঞ্জেরল ইত্যাদি হল আদার সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান। আদা বমিবমি ভাব কমায়, রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে, হজম উন্নত করতেও সাহায্য করে। বাতের রোগীরা আদা চা খেতে পারেন। কারণ, এর প্রদাহ নিরাময়কারী বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
দারুচিনি চা
তৈরির পদ্ধতি – প্রায় ৩ চা চামচ দারুচিনির ছাল ১ কাপ জলে ৫ মিনিটের জন্য মিশিয়ে ফুটিয়ে চা তৈরি করা হয়।
উপকারিতা – দারুচিনি চা স্বাস্থ্যকর, হজমশক্তিকে উদ্দীপ্ত করে। এটি কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে।
পুদিনা চা
তৈরির পদ্ধতি – এক্ষেত্রে শুকনো পুদিনা পাতার গুঁড়ো নিতে পারেন। ১ কাপের জন্য ২-৩ গ্রাম লাগবে। অথবা শুকনো পাতা ৪-৫ মিনিট ফুটিয়ে ছেঁকে নিতে পারেন।
উপকারিতা – এটি পেট এবং হজমের সমস্যা প্রতিরোধ করে। এছাড়া মানসিক চাপ উপশমের জন্য ভালো। এটি প্রায়শই মাউথফ্রেশনার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি পেট ফাঁপা কমাতে এবং ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস)-এর লক্ষণগুলি উপশম করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়া ব্যথা এবং মাথাব্যথা উপশম করার ক্ষমতা আছে।
তুলসী চা
তৈরির পদ্ধতি – তুলসীর তাজা পাতাগুলি জলে ধুয়ে ড্রায়ারে বা ছায়াতে শুকনো করতে হবে। শুকনো পাতা গ্রাইন্ডাের গুঁড়ো করে নিন। প্রতি কাপের জন্য ২ গ্রাম করে গুঁড়ো নিতে হবে।
উপকারিতা – তুলসী চায়ে ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনল এবং প্রয়োজনীয় তেল সহ জৈব-সক্রিয় যৌগ রয়েছে। এইসব যৌগগুলি তুলসী চায়ের স্বতন্ত্র সুগন্ধ, স্বাদ এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতায় অবদান রাখে। মূল উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে ইউজেনল, রোসমারিনিক অ্যাসিড এবং অসিমুমোসাইড, যার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহ নিরাময়কারী, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এবং অ্যাডাপ্টোজেনিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তুলসী চা-কে একটি অ্যাডাপ্টোজেন হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যার অর্থ এটি শরীরকে চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে সহায়তা করে। শ্বাসযন্ত্র ঠিক রাখার জন্য বহু শতাব্দী ধরে তুলসী চা ব্যবহার করা হয়ে আসছে। এটি কাশি, সর্দি এবং হাঁপানির মতো শ্বাসযন্ত্রের রোগের লক্ষণগুলি উপশম করতে সাহায্য করে। তুলসী চায়ের এক্সপেক্টোরেন্ট এবং ব্রংকোডাইলেটর বৈশিষ্ট্যগুলি শ্বাসপ্রশ্বাসে স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে সহায়তা করে।
বেল চা
তৈরির পদ্ধতি – কাঁচা ফল ২ মিমি পুরু টুকরো করে কেটে রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে চালুনির মাধ্যমে ছেঁকে ২ গ্রাম জলে ৩-৪ মিনিট ফোটাতে হবে।
উপকারিতা – গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বেল-এ অ্যাস্ট্রিঞ্জেন্সি, অ্যান্টিডায়ারিয়া, অ্যান্টিডিসেন্ট্রিসিটি, অ্যান্টিপাইরেটিক, অ্যান্টিআলসার, অ্যান্টিডায়াবিটিক, অ্যান্টিব্যাকটিরিয়াল, অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিইনফ্ল্যামাটরি, অ্যান্টিক্যানসার, অ্যানালজেসিক প্রভৃতি গুণ রয়েছে।
মরিঙ্গা চা
তৈরির পদ্ধতি – শুকনো মরিঙ্গা বা সজনে পাতা পিষে গুঁড়ো করে নিন। প্রতি কাপের জন্য ২ গ্রাম করে গুঁড়ো নিতে হবে।
উপকারিতা – সজনে পাতা রুচিকারক ও ক্ষুধাবর্ধক। এছাড়া হজমে সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্য ও অতিনিদ্রা কমাতে সাহায্য করে।
লেমনগ্রাস চা
তৈরির পদ্ধতি – গাছের পরিণত পাতা ভালোভাবে পরিষ্কার করে শুকনো করে ১/২-১ ইঞ্চি ছোট ছোট টুকরো করে কেটে প্যাকেট করে রাখা হয়। ১ কাপে ৩ গ্রাম পরিমাণ নিয়ে ৪-৫ মিনিট ফুিটয়ে ছেঁকে নিতে হবে। এটি গ্রিন টি’র সঙ্গে মিশিয়েও খেতে অনেকে পছন্দ করেন।
উপকারিতা-লেমনগ্রাস সাধারণত রান্নায় ব্যবহৃত হয়। চাপ, ব্যথা কমাতে এবং মেজাজ উন্নত করতে অ্যারোমা থেরাপিতে এটি ব্যবহৃত হয়। লেমনগ্রাসে আইসোরিয়েন্টিন, ক্লোরোজেনিক অ্যাসিডের মতো অসংখ্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা রোগ সৃষ্টিকারী মুক্ত র্যাডিক্যালগুলি খুঁজে পেতে সহায়তা করে। এছাড়া দাঁতের ক্ষয় রোেধ ব্যবহৃত হয় লেমনগ্রাস। এতে জৈব সক্রিয় সাইট্রালের উপস্থিতি অ্যাপোপটোসিস বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে। এছাড়া বদহজম এবং গ্যাস্ট্রিক আলসার নিরাময়ে, উচ্চ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে ও অতিরিক্ত ওজন কমাতে সাহায্য করে।
