ভালো কিংবা মন্দ, ‘দুয়ার আজি খুলে গেছে’ পদ্মের

ভালো কিংবা মন্দ, ‘দুয়ার আজি খুলে গেছে’ পদ্মের

শিক্ষা
Spread the love


গৌতম সরকার

এসো এসো এসো সবে…। ভালো, মন্দের ভেদ আর নেই। যে কারও জন্য দরজা চিচিংফাঁক। ধীরে ধীরে একেবারে ১৮০ ডিগ্রি ডিগবাজি। প্রথম ঘোষণা ছিল, সব তৃণমূলি চোর। ফলে তাদের নেওয়া নৈব নৈব চ। পরে ঘোষণা হল, ভালো তৃণমূলি হলে জালে তোলা যায়। সরাসরি না হলেও। কীভাবে? কাউকে এনসিপিআই-তে পাঠিয়ে। কাউকে ঋতব্রত তৃণমূল বানিয়ে।

তৃতীয় অবস্থান নাকি একেবারে ‘ব্যতিক্রমী’ রাজ্যসভার তিন পদত্যাগী তৃণমূল সাংসদের হাতে সরাসরি গেরুয়া ঝান্ডা ধরিয়ে দিয়ে। শমীক ভট্টাচার্য বললেন, এটা দলের লাইনের বিচ্যুতি নয়। ব্যতিক্রম মাত্র। সেই ব্যতিক্রম নিয়ে বিজেপির অন্দরে ঝড় উঠল। বিশেষ করে আলিপুরদুয়ারের প্রকাশ চিকবড়াইকের সাদর অন্তর্ভুক্তিতে। যাঁর বিরুদ্ধে বিজেপির পুরোনো কর্মীদের অভিযোগ ও ক্ষোভের শেষ নেই। ভোট প্রচারে যাঁকে গোরু, কয়লা পাচারকারী বলেছিলেন দেশের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার।

ব্যতিক্রমের ব্যাখ্যা দিলেন শমীক, সুকান্তরা। দলের চেয়ে নাকি দেশ বড়! মানে দেশের স্বার্থ বড়! কী সেই স্বার্থ? তাঁর ব্যাখ্যার ধার-পাশ দিয়ে অবশ্য হাঁটলেন না পদ্ম-নেতারা। তা না হাঁটুন, বুঝতে অসুবিধা হয় না স্বার্থটা! আসন পুনর্বিন্যাস বিল পাশ করাতে ধাক্কা খাওয়ার যন্ত্রণাটা যে এখনও খচখচ করছে। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে কোনওরকমে উতরে যাওয়া গিয়েছে। আসন পুনর্বিন্যাস যদি হিন্দু-হিন্দির দিকে ঝুঁকিয়ে দেওয়া না যায়, তাহলে ২০২৯-এ যে সমূহ বিপদের আশঙ্কা।

বাঁকিপুর ও দাতিয়া সেই বার্তা দিয়ে গেল যে! তরুণ প্রজন্মের চাপে পিছু হটতে হয়েছে। তারপর বাঁকিপুর ও দাতিয়া বুঝিয়ে দিল, অল ইজ নট ওয়েল (সবকিছু ভালো নেই)। বিজেপির ভোট ব্যাংকেই ভাঙন ধরেছে। যতই বৃহত্তম দল হোক আর রাজ্যের পর রাজ্যে গেরুয়া নিশান উড়ুক না কেন, থরহরিকম্প নরেন্দ্র মোদি-অমিত শা শিবিরে।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘও কিছুটা বেসুরো। যন্তরমন্তরের আন্দোলনে বলপ্রয়োগের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মোহন ভাগবত। অন্তত মুখে তো বটেই। হতে পারে সেটা চিত্রনাট্য মেনে পরস্পরের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে। কিন্তু তাতে মোদি-শা’ বিড়ম্বনা গোপন রাখতে পারছেন না। মুশকিল আসান তাই আসন পুনর্বিন্যাস ও মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করানো। একবার পাশ করাতে পারলে বিন্যাস তো সরকারের হাতেই।

বুঝতে অসুবিধা নেই, আসন পুনর্বিন্যাসটা এখন বিজেপি নেতাদের ভাষায় দেশের স্বার্থ। তাই ‘দুয়ার আজি খুলে গেছে’ পদ্ম মন্দিরের! ওরে কে আসবি আয়! যাঁরা আসার জন্য হ্যাংলামো করছিলেন, তাঁদের আগলে রাখা শুরু হয়ে গিয়েছে। এনসিপিআই এখনও লোকসভায় দল হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি। অথচ খাতিরদারি দেখুন। এই প্রতিবেদন লেখার সময় খবর পেলাম, নয়াদিল্লিতে নিজের বাসভবনে ডেকে এনসিপিআই সাংসদদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক করছেন প্রধানমন্ত্রী।

ওই সাংসদদের মধ্যে সেই তিন ‘শুক্রবারি’ও (শুভেন্দু অধিকারীর ভাষায়) আছেন। যাঁরা বিজেপিতে যোগ দিতে চান না, এনডিএ থেকে দূরে থাকতে চান। খাতিরদারি এমনই যে প্রধানমন্ত্রীর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এনসিপিআই সাংসদদের সঙ্গে তো বটেই, ওই তিন ‘শুক্রবারি’র সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেছেন। বাকি এনসিপিআই সাংসদদের বিজেপিতে মিশে যেতে আপত্তি নেই। সেজন্য হ্যাংলামোর চূড়ান্ত চলছে। দিল্লিতে রোজই কোনও না কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কাছে দরবার করছেন তাঁরা।

শেষপর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নয়াদিল্লিতে। তার আগের কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্বিগ্ন হয়ে চলে গিয়েছিলেন নবান্নে। খাতিরদারি রাজ্যেও। বিধানসভায় পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যানের পদটি উপঢৌকন দেওয়া হয়েছে ঋতব্রত শিবিরকে। বিরোধী দলনেতার পর এই পদটি ধারে-ভারে বিরোধীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কালীঘাট শিবিরকে বঞ্চিত করে ঋতব্রত গোষ্ঠীর বিধায়কদের বিধানসভার সব স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

শুধু সাংসদ, বিধায়ক নন, একেবারে অঞ্চল স্তর পর্যন্ত তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী গায়ে গেরুয়া রং মাখার জন্য মরিয়া হয়ে আছেন। ‘একবার ডাকিলেই হয়…।’ কেউ অপকর্ম আড়াল করতে, কেউ গ্রেপ্তারি এড়াতে, কারও আবার গেরুয়া জামা গায়ে ফের ধান্দাবাজি শুরু করার উদ্দেশ্য। তাঁরা যেন বিজেপিকে বলছেন, ‘খোলো খোলো দ্বার, রাখিও না আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে…।’ দরজা খুলে দিলে বানের জলের মতো এঁদের স্রোতে পদ্ম নদী উথালপাতাল হবে। তা হোক, দেশের স্বার্থ যে বড়! রাজ্যের স্বার্থও হয়তো!

বাঁকিপুর, দাতিয়া শুধু নয়, যন্তরমন্তর বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছে, শাসক শিবিরের দূর্গে ফাটল ধরেছে। পদ্ম-ঘরের ছেলেমেয়েরা নিজেদের সদর দপ্তরে কামান দাগছেন। উপনির্বাচনে কমিটেড ভোটারদের সমর্থন হাতছাড়া হয়েছে। তাছাড়া যতদিন যাবে, তত কেউ কমিটিতে জায়গা না পেয়ে, কেউ ধান্দাবাজি কিংবা তোলাবাজিতে বাধা পেয়ে, কেউ দলের নীতি বা কাজকর্মে বীতশ্রদ্ধ হবেন। তাঁদের সবাই না হলেও কেউ কেউ দলের বিরুদ্ধাচরণ করতে পারেন।

বিরোধীরা ছন্নছাড়া বা দূর্বল হলে কী হবে, ১২ বছরের কেন্দ্রীয় শাসনে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া দেশজুড়ে আছে। বাঁকিপুর ও দাতিয়া তার প্রমাণ। তাই নতুন রক্ত চাই। ভালো রক্ত হোক কিংবা দূষিত- বাছবিচার করার সময় আর নেই। তাতে আদি কর্মীরা গোঁসা করতে পারেন। কেউ নিষ্ক্রিয় হতে পারেন, এমনকি দল ছেড়ে দিতে পারেন। তাতে পরোয়া নেই নেতৃত্বের।

মাসখানেক আগে কলকাতায় এসে রাজ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে বিজেপির পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল দলের নেতাদের ঢালাও যোগদানের নির্দেশ দিয়েই গিয়েছিলেন। দিল্লির নেতাদের সরল সমীকরণ, ধান্দাবাজির উদ্দেশ্য হোক বা গুছিয়ে নেওয়ার ছক হোক, পুরোনোরা বিরূপ হলেও ভালো ও মন্দ তৃণমূলিদের সমর্থনে দিল্লিতে বিল পাশ করানো যাবে, বাংলায় ক্ষমতায় টিকে থাকা সহজ হবে।

The publish ভালো কিংবা মন্দ, ‘দুয়ার আজি খুলে গেছে’ পদ্মের appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *