- জয়ন্ত চৌধুরী
রাজ্যে ভোটের বুথ ৮১ হাজার ৬৬১। ভোটের ফলাফল বাংলায় কী হবে, তা নিয়ে জ্যোতিষগিরি নয়। তবে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করতে গেলে অন্তত পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বুথের সংখ্যা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নির্বাচন সর্বস্ব রাজনীতিতে শেষ কথা বলে বুথই। আর বুথকে কথা বলায় কিন্তু ‘ভোট মেশিনারি।’ বাংলার রাজনৈতিক সমাজ (পলিটিকাল সোসাইটি, সূত্র ঃ পার্থ চট্টোপাধ্যায়, নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ) বহুযুগ ধরে কলুষিত হয়ে চলেছে। ভোট মেশিনারি শব্দবন্ধটি বামেরা তাদের পূর্বসূরি সাতের দশকের কংগ্রেসের থেকে পেয়েছিল।
বামেরা ভোট ছাড়াও সারাবছর নানা কিসিমের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত রাখত দলীয় কর্মীদের। সেই কর্মকাণ্ডের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, ভোটার তালিকা ধরে বুথভিত্তিক জনসংযোগ। যদিও ধীরে ধীরে এই জনসংযোগ যান্ত্রিকতায় আক্রান্ত হয়। অপরদিকে সেই যুক্তফ্রন্ট, নকশাল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলায় যে পলিটিকাল সোসাইটি গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে শাসকের স্বার্থের সংঘাত বাড়তে লাগল।
শাসকের দলীয় আধিপত্য যত তীব্র হল, জনসংযোগের বাঁধন তত আলগা হয়ে গিয়েছিল। ক্ষমতার ঔদ্ধত্যে বামপন্থার মূল্যবোধ ভেসে গিয়েছিল। যার অভিঘাত এমনই যে, নিজেদের জনবিচ্ছিন্নতা তারা টের পায়নি। ফলে ২০০৬ সালে বিপুল বিজয়ের মাত্র দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে বাম সরকারের পতনের বীজ বোনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনি নিরিখে বললে ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন হাতেনাতে বুঝিয়ে দিয়েছিল, বামেদের বিদায় আসন্ন। এককথায়, ভোট মেশিনারি ক্রমে দুর্বল হচ্ছিল সিপিএমের।
তৃণমূল সরকার সূচনা থেকেই ভোট মেশিনারি নির্মাণে গুরুমারা বিদ্যা রপ্ত করেছে। বরং বামেরা যা পারেনি, তা এখন হয়ে গিয়েছে তৃণমূলের বাঁ হাতের খেল। বাম জমানায় যত দুর্বলই হোক, বিরোধীদের একটা অস্তিত্ব ছিল। ২০১১ সালের পর থেকে ক্রমে বিরোধীশূন্য হয়ে গিয়েছে বাংলা। যেটুকু বিরোধী পরিসর পরিষদীয় রাজনীতিতে বঙ্গে টিকে আছে, তা এখন গেরুয়া শিবিরের দখলে। যারা বাস্তবে এখনও পরিষদীয় রাজনীতি রপ্তই করতে পারেনি।
রাজ্যে প্রশাসনিক স্বৈরাচার ও কিয়দংশে ভ্রষ্ট বিচার বিভাগের কল্যাণে এবং শাসকের বেনজির পরাক্রমের সুবাদে পরিষদীয় স্তরে বিরোধী শক্তি বস্তুত অস্তিত্বহীন। পরিষদীয় রাজনীতিতে প্রত্যাখ্যাত বামেরা পথের লড়াইয়েও দিশা দেখতে ব্যর্থ। কংগ্রেসের অবস্থা তথৈবচ। এই পরিপ্রেক্ষিত মনে রেখে বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর (এসআইআর) ভবিষ্যৎ আলোচনা করা উচিত।
যেকথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, বাংলায় যে ৮০ হাজারের বেশি বুথে বিএলএ অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি জোগাড়ের ক্ষমতা তৃণমূল ছাড়া যে আর কারও নেই, সেটা হলফ করেই বলা যায়। উত্তরবঙ্গে সেই ক্ষমতা কিছুটা বিজেপির রয়েছে। মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের অংশ বিশেষে কংগ্রেস থাকলেও পুলিশ ও প্রশাসনের মদতে সেখানে তৃণমূল খোলা ময়দান ছেড়ে দেবে ভাবার কারণ নেই।
শুনতে যতই কর্কশ শোনাক, সমস্ত জেলার পুলিশ সুপার থেকে থানার আইসি পর্যন্ত আসলে তৃণমূলের সাংগঠনিক পরাক্রমের অন্যতম সহায়ক। এই পরিস্থিতিতে কমিশন নিয়োজিত বিএলও-ও শাসক অনুগত হবে। ফলত বাড়ি বাড়ি গিয়ে মৃত ভোটার শনাক্ত করা বা ভুয়ো নাম চিহ্নিত করার কাজ পরোক্ষে রাজ্যের শাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
বছরের পর বছর ধরে ভুয়ো আধার কার্ড, এপিক (সচিত্র পরিচয়পত্র) করে দেওয়া যাদের রাজনৈতিক হোমটাস্ক ছিল, যতই বিএলও থাকুক সেই ব্যবস্থাকে খতম করার মতো আত্মঘাতী শাসকদল হবে, এটা ভাবাটাই বাতুলতা। ভুয়ো হলেও ‘এপিক’ করার জন্য কাস্ট সার্টিফিকেট একটা দরকারি নথি। দুয়ারে সরকার চালু হওয়ার পর সেকাজ অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সেরে ফেলছে শাসকদল।
তাই এসআইআর মানছি না বলে জনসমক্ষে যতই হুমকি দিক না কেন, তৃণমূল পুরো প্রক্রিয়াটায় বাধা দিয়ে অহেতুক জটিলতা বাড়াবে না। বরং এসআইআর আতঙ্ক জাগিয়ে রেখে বিজেপি বিদ্বেষের পালে হাওয়া দেওয়ার কাজটা তৃণমূলের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বিজেপি শুধু মুসলমান নয়, বাংলাদেশ থেকে আসা মতুয়া বা নমশূদ্র সহ অনেক হিন্দুর মনেও সংশয়ের কারণ হয়ে উঠছে।
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) গাজর ঝুলিয়ে হিন্দু উদ্বাস্তুদের মনে আস্থা অর্জন করতে পারেনি কেন্দ্র বা বিজেপি। সেকাজ করার মতো সাংগঠনিক তাগদ বিজেপির নেই। নেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়য়ের মতো সংগঠনকে নিজের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে রাখার মুরোদও। অনুপ্রবেশের মোড়কে তীব্র মুসলমান বিদ্বেষ আর উগ্র হিন্দুয়ানা বাংলার ভোটের রাজনীতির ময়দানে এতদিন তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি।
বরং রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় সত্তর শতাংশ হিন্দু ভোটের সত্তর-পঁচাত্তর ভাগের সমর্থন না পেয়ে দলের জেতা কঠিন করে ফেলেছে বিজেপি। তাছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ওই হারে ভোটারকে বুথ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মতো সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ছিটেফোঁটা নেই বঙ্গ বিজেপির। যতটুকু ভোট বিজেপির ঘরে জমা হয়, তার সিংহভাগ সামাজিক বিভাজনের ফল। অর্থাৎ তাদের বুথমুখী করে তোলার নেপথ্যে মুরলীধর সেন লেনের কর্তাদের বিশেষ ভূমিকা নেই।
অন্যদিকে বামপন্থী সমর্থক ও কর্মীবাহিনীর কিছু ভোট পদ্ম ফুলে জমা হয়ে আছে কট্টর তৃণমূল বিরোধিতার কারণে। সেখানে বিজেপিকে অন্তর্বর্তীকালীন মিত্র বলে ভাবনা আছে। অথচ বাংলায় কমবেশি অবাম ভোট বরাবরই আছে, যার একটা সামাজিক ভিত্তিও আছে। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে সেই ভিত্তি ঝান্ডা বদলে ফেলেছে। ফলে কংগ্রেসের সেই ভিত্তিও এখন তৃণমূলের দখলে।
তৃণমূল ক্ষমতায় বসার পর থেকেই বিভিন্ন কিসিমের সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পের নামে টাকা দিতে শুরু করে। ফলে একটা উপভোক্তা ভোট ব্যাংকও তৈরি হয়েছে তৃণমূলের। বিজেপির চালিকাশক্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সৌজন্যে বাংলায় যেটুকু হিন্দুত্ব মাথাচাড়া দিয়েছে, তৃণমূলের নরম হিন্দুত্বের অনুশীলন তাকে মোকাবিলাও করতে পারছে।
সন্দেহ নেই, তৃণমূল ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল। যেখানে দলনেত্রীর জনপ্রিয়তাই শেষ কথা। তাই দলের ডজনখানেক নেতাকে হাত পেতে টাকা নিতে দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে তৃণমূলের বিশেষ ক্ষতি হয় না। কেননা, নেত্রীর ভরসায় দল চলে। এসআইআর নিয়ে প্রথম থেকে আতঙ্কের আবহ তৈরি হয়েছে বিজেপি বিশেষত শুভেন্দু অধিকারীর কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার হুমকির কারণে।
অন্যদিকে, রাজনীতিতে দৃশ্যমানতা বুঝতে মমতার দক্ষতা মানতেই হয়। অভিষেককে সঙ্গে নিয়ে ময়দান থেকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি হেঁটে আমআদমির দৃশ্যপটে পিসি-ভাইপোর যুগলবন্দির ঠাঁই করে দিলেন। একইসঙ্গে দলকে রাস্তায় নামিয়ে দিলেন। অথচ ভোটের এখনও অন্তত ছয় মাস বাকি। বুথ স্তরে হেল্প ডেস্ক খুলেছে তৃণমূল। বিএলও’র সঙ্গে বিএলএ একা নন, একাধিক দলীয় কর্মী ঘুরছেন। অনেক জায়গায় দলীয় পতাকা নিয়ে তারা বিএলও’র সঙ্গী।
রাজ্যের বাকি দলগুলোর বুথ স্তরে জোরদার অস্তিত্ব না থাকায় গোটা এসআইআর প্রক্রিয়াকে একাই হাতের মুঠোয় নিয়ে ফেলেছে রাজ্যের শাসকদল। কেননা বুথ স্তরে দৃশ্যমান একমাত্র তৃণমূল। নির্বাচনি মেশিনারি নির্মাণের প্রাথমিক শর্তও বুথের নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখা। গণতন্ত্রের নিরিখে এই নেতিবাচক প্রবণতাই সবটা নয়। বুথভিত্তিক সংগঠন মানে বছরভর তৃণমূল স্তরে জনসংযোগ। এভাবেই গড়ে ওঠে, বুথ যার মেশিনারি তার। কে না জানে, মেশিনারি যার, ভোট তার।
সেই বিচারে এসআইআর বিপাকে ফেলেনি, বরং বিধানসভা ভোটের প্রায় ছয় মাস আগেই সাংগঠনিক ট্র্যাকে ফিরিয়েছে তৃণমূলকে। রাজ্যে তৃণমূলের বুথভিত্তিক কমিটি তৈরি শুরু হয় মুকুল রায়ের উদ্যোগে। এখন সেটা চলছে আইপ্যাক-এর কড়া নজরদারিতে। সমস্ত বিডিও, কিছু ক্ষেত্রে মহকুমা শাসকের দপ্তরে ওপরতলার নির্দেশে নাক গলাচ্ছে আইপ্যাক। অর্থাৎ বেসরকারি নজরদারি সর্বত্র চলছে। একইরকম নজরদারি থাকছে প্রশাসন ও পুলিশের। ‘মেরা বুথ সব সে মজবুত’ স্লোগান দিয়ে বঙ্গ বিজেপি দায় সারলেও, তৃণমূল সেটা আগেই সেরে রেখেছে।
