চা বাগান, জনপদ ও সেনাছাউনির বিস্তৃত জনসমাগমে গয়েরকাটার দশমীমেলা পেয়েছে ডুয়ার্সজোড়া পরিচয়।
মনোমিতা চক্রবর্তী
ডুয়ার্সের গয়েরকাটার পরিচয় শুধু চা বাগান, বনভূমি আর নদীকে ঘিরে নয়। শারদোৎসবের শেষে আংরাভাসা নদীর ঘাটে বিসর্জনকে কেন্দ্র করে বসা দশমীর মেলাও এই জনপদের নিজস্ব পরিচয়ের অংশ। আশপাশের বহু চা বাগান, বনবস্তি, গ্রাম ও শহরতলির মানুষের সমাগমে মেলাটি স্থানীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর এলাকার মিলনস্থল হয়ে ওঠে। গয়েরকাটার ঐতিহ্যবাহী দশমীমেলার উল্লেখ স্থানীয় এলাকার তো বটেই, বাইরের বহু সংবাদমাধ্যমেও রয়েছে। এই মেলার বিশেষত্ব শুধু দোকানপাটের পসরা কিংবা প্রতিমা নিরঞ্জনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। ভিন্ন ভিন্ন জনপদের মানুষ একই নদীর ঘাটে এসে মিলিত হন, ভাগ করে নেন উৎসবের আনন্দ ও বিদায়ের বিষাদ। ডুয়ার্সের মানুষের সামাজিক যোগাযোগ এবং লোকায়ত উৎসবের ধারাকে বুঝতে এই সমাগম তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
গয়েরকাটার বিসর্জনের টানে এথেলবাড়ি, সরুগা, হলদিবাড়ি, বিন্নাগুড়ি, তেলিপাড়া, মোরাঘাট, পলাশবাড়ি, কাঁঠালগুড়ি, চামুর্চি, আমবাড়ি, ডায়না, দেবপাড়া ও ডিমডিমা সহ বিভিন্ন চা বাগান ও জনপদের মানুষ আসেন। বিন্নাগুড়ির সেনাছাউনি এবং আংরাভাসা, নাথুয়া, দুরামারি, খুট্টিমারি, তেলিপাড়া, বীরপাড়া সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষও প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য ভিড় করেন নদীর ঘাটে। নানা এলাকা থেকে আসা প্রতিমার শোভাযাত্রা এবং দর্শনার্থীদের সমাগম মেলাটিকে বিস্তৃত আঞ্চলিক চরিত্র দিয়েছে। এখানে একদিকে যেমন পুজোর উদ্যোক্তা ও তাঁদের পরিচিতরা আসেন, তেমনই আসেন মেলা দেখতে আগ্রহী সাধারণ মানুষ। এই বহুমুখী সমাগমই গয়েরকাটার বিসর্জনকে নিছক স্থানীয় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বদলে ডুয়ার্সের পরিচিত উৎসবের পরিসরে নিয়ে গিয়েছে।
গয়েরকাটার পুজোকে ঘিরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণের স্মৃতিও রয়েছে। সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, তাঁর ছেলেবেলায় গয়েরকাটা বাজারের পাঠশালার বারান্দায় পুজো হত। চা বাগানের শ্রমিকেরা দল বেঁধে এসে মণ্ডপের সামনে মাদল বাজাতেন। সেই স্মৃতি থেকে বোঝা যায়, এই জনপদের উৎসবের পরিসরে চা বাগানের জীবন ও বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। বিসর্জনের মেলায়ও সেই বৃহত্তর সামাজিক যোগাযোগের প্রতিফলন দেখা যায়। প্রতিমা যখন নদীর জলে মিশে যায়, তখন ‘আসছে বছর আবার হবে’ উচ্চারণে বিদায়ের বিষাদের পাশাপাশি ফিরে আসার প্রত্যাশাও তৈরি হয়। নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে একই মুহূর্তের শরিক হন নানা এলাকার মানুষ।
এই সমাগমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে মেলা। মাঠজুড়ে সারি সারি দোকান, রঙিন খেলনা, খাবারের পসরা আর জিলিপির গন্ধে উৎসবের পরিবেশ জমে ওঠে। বহুদিন পর দেখা হওয়া আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা গল্পে মেতে ওঠেন। শিশুরা খেলনা কিংবা খাবারের দোকানে যেতে আবদার করে, বড়রা চায়ের কাপে আড্ডা জমান। মেলার এক কোণে যত্ন করে সাজানো থাকে মাটির সরা। দুর্গাপুজোর কয়েক দিন পরেই লক্ষ্মীপুজো, তাই এখান থেকে বাড়ির জন্য সরা কিনে নিয়ে যান অনেকে। এই ছোট্ট কেনাকাটার মধ্যেও রয়েছে উৎসবের ধারাবাহিকতা। দুর্গার বিদায়ের সঙ্গে লক্ষ্মীর আগমনের প্রস্তুতি জুড়ে গিয়ে মেলাকে স্থানীয় জীবনের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।
গয়েরকাটার বিসর্জনের মেলার গুরুত্ব এখানেই। প্রতিমা নিরঞ্জনকে কেন্দ্র করে একই জায়গায় এসে মেশে চা বাগান, বনবস্তি, গ্রাম ও শহরতলির মানুষের যোগাযোগ। মেলার কেনাবেচা স্থানীয় অর্থনীতিতে সাময়িক প্রাণচাঞ্চল্য আনে, আর দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ নতুন করে জুড়ে দেয় পুরোনো সম্পর্ক। আংরাভাসা নদীর ঘাট তাই একদিনের জন্য কেবল প্রতিমা বিসর্জনের স্থান থাকে না, হয়ে ওঠে ডুয়ার্সের একটি বিস্তৃত সামাজিক মিলনস্থল। বছর ঘুরে প্রতিমা আসে, আবার বিসর্জনে বিদায় নেয়। কিন্তু সেই উপলক্ষ্যে তৈরি হওয়া সমাগম, মেলার স্মৃতি এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ গয়েরকাটার দশমীমেলাকে স্থানীয় ঐতিহ্যের স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়।
(লেখক শিক্ষক ও অক্ষরকর্মী।)

