- দেবাশীষ সরকার
মনেপ্রাণে তখন অঙ্গচ্ছেদের দুঃখ-ব্যথা। ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের পর দেশ তখন সবে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বিদ্যা, বুদ্ধি ও সম্পদের অসীম ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও এই দেশটাকে বারবার নানা বহিঃশত্রুর আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। পরাধীন হতে হয়েছে নানা শক্তির কাছে, হারাতে হয়েছে অঢেল সম্পদ। তাই এবার আবার, আরও একবার নতুন করে তৈরি হওয়ার সময়ে পেশিশক্তি হয়ে দাঁড়াল এক অন্যতম মুখ্য লক্ষ্য।
কিন্তু আর্থিক দুর্বলতা ছিল এক বিরাট অন্তরায়। তাই গোটা পৃথিবী থেকে জোগাড় করা শুরু হল সস্তা অথচ উপযোগী সমরাস্ত্র। ছোট-মাঝারি নানা কেনাকাটার পরে প্রথম এক পাহাড়প্রমাণ যুদ্ধাস্ত্র কেনা হয় ১৯৫৭ সালে। সেটি ছিল ইংল্যান্ডের ভাইকার আর্মস্ট্রং জাহাজ কোম্পানির কারখানায় ফেলে রাখা, আধা-তৈরি হওয়া এক ম্যাজেস্টিক-ক্লাস জাহাজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহারের জন্য একে ছকা হয়েছিল ১৯৪২-এ। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়াতে আর জল পায়নি জাহাজটা। তাকে কেনা হল; সে তৈরি হল এবং সুসজ্জিত হল। এরপর নারকেল ফাটিয়ে ও শঙ্খ বাজিয়ে সে জলে নামল ১৯৬১-তে। এশিয়ার প্রথম এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার—নাম হল ‘আইএনএস বিক্রান্ত’। অলিখিতভাবে ভারত হয়ে দাঁড়াল এশিয়ার অন্যতম মুখ্য সমর শক্তিধর দেশ।
নতুন পথে চলার শুরু
কিছুটা ইচ্ছা এবং কিছুটা বাধ্যবাধকতা মিলিয়ে ভারতের সমরাস্ত্র আমদানির অঙ্ক শুরুতে ছিল বছরে কয়েকশো কোটি ডলার মাত্র। তবে সেই সময়ের ১০ টাকার কম ডলারের বিনিময় মূল্য ধরলে এই অঙ্কটা নেহাত কম ছিল না। মূলত ব্রিটেন, আমেরিকা আর ছয়ের দশকে রাশিয়া থেকেই মূল আমদানি হতে থাকল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ব্রিটিশ সেঞ্চুরিয়ন ট্যাংক, এম-৪৭ বা এম-৪৮ প্যাটন ট্যাংক এবং এনফিল্ড রাইফেল। যুদ্ধবিমানের মধ্যে স্পিটফায়ার, টেম্পেস্ট, ভ্যাম্পায়ার—এগুলো দেশেই ছিল। নতুন এল ফরাসি ওরাগন। এল সুইডেনের বফর্স-১৭০ বিমানরোধী কামান।
তবে এগুলো সব ছিল মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের সমরাস্ত্র। এগুলো দিয়ে লড়া ১৯৬২-র ভারত-চিন যুদ্ধ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আধুনিক যন্ত্রের প্রয়োজন। ফলত আমূল বদলে গেল ভারতের সমরাস্ত্র আমদানির চিন্তাভাবনা। চুক্তির মাধ্যমে দেশেই তৈরি শুরু হল সোভিয়েত রাশিয়ান সমরাস্ত্র। সমর শক্তিতে আত্মনির্ভরতার পথে এটিই ছিল প্রথম বড় পদক্ষেপ।
ক্রমে শুরু হল একা পথ চলা। অন্যের হাত ছেড়ে নিজের প্রযুক্তিতে একে একে তৈরি হল এলসিএ তেজস বা আওয়াক্স (AWACS) প্লেনের নীল নকশা। দেশের গবেষণাগারে জন্ম নিল পরমাণু শক্তিধর অগ্নি কিংবা ব্রহ্মসের মতো মিসাইল; আইএনএস আরিহান্ত বা বিক্রান্তের মতো জাহাজ। হ্যাঁ, আমদানি করা সেই পুরোনো বিক্রান্তের পরে ভারত এবার নিজেই বানিয়েছে অন্য এক ‘আইএনএস বিক্রান্ত’। এল ‘বিশাখাপত্তনম’ সাবমেরিন, জন্ম হল মাটি থেকে আকাশগামী ‘আকাশ’ মিসাইল। ‘আটাগস’ বা ‘ধনুষের’ মতো আধুনিক বন্দুক সহ এই তালিকা অনেক দীর্ঘ। শুধু অস্ত্র নয়, পাশাপাশি তৈরি হল নানা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা। এখন তৈরি হচ্ছে ‘দুর্গা-২’এর মতো অত্যাধুনিক লেসারভিত্তিক সমর ব্যবস্থা। যুদ্ধ চালানোর জন্য এআই (AI) বা কোয়ান্টাম বিদ্যাভিত্তিক নানা যন্ত্র-মস্তিষ্ক। এই বিষয়ে আমরা যেটুকু বাইরে থেকে দেখতে পাচ্ছি, গবেষণাগারের গভীরে কাজ হয়ে চলেছে আরও অনেক বেশি।
চেনা ছবির বদলে যাওয়া
পৃথিবীর সমরাস্ত্র বাজারে শুধুই আমদানিকারক ক্রেতা থেকে এখন নিজের সংজ্ঞা বদলে ভারত হয়ে উঠেছে এক গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারক ও বিক্রেতা। গত দশকের গোড়ার তুলনায় বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ ২০২৪-২০২৫’এ ৩৪ গুণ বেড়ে হয়েছে ২৩,৬২২ কোটি টাকা (২.৮ বিলিয়ন ডলার)। যা ২০২৩-২০২৪’এর তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। ১০০০ বিলিয়ন ডলারের বিশ্বজোড়া অস্ত্র রপ্তানির বাজারে এই অঙ্ক কিন্তু নেহাতই ছোট। এখানে ৪৪০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রপ্তানি করে একা আমেরিকা। ২০ শতাংশ বাজার ধরে রেখেছে ফ্রান্স আর রাশিয়া মিলে। আর বাকিটা আছে চিন (৫.৮ শতাংশ), জার্মানি (৫.৬ শতাংশ), ইতালি (৪ শতাংশ), স্পেন (২ শতাংশ) সহ নানা দেশ। তাবড় তাবড় শক্তিধর দেশগুলোর এই দৌড় দেখে বোঝাই যায় অস্ত্রবাজারে কত কঠিন লড়াই ভারত লড়ছে এখন।
এখানে দেখার বিষয় হল ভারতের উত্থানের বেগ। ২০১৩-’১৪ সালে আমাদের রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৪৬ কোটি টাকার। কিন্তু এখন ভারতের রাডার, টর্পেডো, হেলিকপ্টার ও মিসাইলের যন্ত্রাংশ পৃথিবীর ১০০-র বেশি দেশে রপ্তানি হওয়া শুরু করেছে। এখন আমেরিকা, ফ্রান্স বা আর্মেনিয়ার মতো দেশগুলোও আমাদের থেকে অস্ত্র আমদানি করছে। সমরাস্ত্রের এই দৌড়ে ২০২৫ আমাদের দেশের জন্য এক বিরাট মাইলফলক। এই বছরের অন্যতম প্রাপ্তি হল ১.৫১ লক্ষ কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র তৈরি, যা ২০২৪-এর থেকে ১৮ শতাংশ বেশি। এই বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের ৭৭ শতাংশ যদিও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সরকারি সংস্থাগুলো থেকেই এসেছে, বাকি ২৩ শতাংশ এসেছে বেসরকারি সংস্থাগুলি থেকে। এখানে বেসরকারি সংস্থাগুলির বেড়ে ওঠার গতি সরকারি সংস্থাগুলির তুলনায় অনেকটাই বেশি।
দ্রুতগতিতে স্বপ্নের উত্থান
২০২৫ সালে সমর-প্রযুক্তিতেও অসাধারণ উন্নতি করেছে ভারত। ড্রোন, কাউন্টার-ইউএএস সিস্টেম, ইলেক্ট্রনিক ওয়ারফেয়ার সুট, স্বায়ত্তশাসিত জাহাজ আর নির্ভুল অস্ত্রের দেশীয় গবেষণা ও উৎপাদন প্রচুর বেড়েছে। ডিআরডিও-র মতো সংস্থাগুলো হাত মিলিয়েছে নানা শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। আর এতেই ‘প্রোটোটাইপ-টু-প্রোডাকশন’ এগিয়েছে ঈর্ষণীয় গতিতে। আইডেক্স (iDEX) এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিলের মতো ব্যবস্থাগুলোর মাধ্যমে স্টার্টআপ সংস্থাগুলির হাত খুলে দেওয়া হয়েছে এআই, রোবোটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা ও সেন্সর সহ অনেক উন্নত উপকরণে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের কর্মক্ষমতা বেড়েছে এবং লাভবান হয়েছে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র।
এতক্ষণ দেখলাম পেছনে ফেলে আসা আর বর্তমান পথচলার ছোট্ট এক ছবি। তাহলে এবার সামনে কী? অতীতের আমদানি নির্ভরতা আর কাগজপত্রের দীর্ঘসূত্রিতা ছেড়ে এখন চটজলদি নীতি নিয়ে গবেষণা, উৎপাদন আর রপ্তানিনির্ভরতার স্তরে পৌঁছেছে ভারত। এই দশকের শেষ নাগাদ প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ৩ লক্ষ কোটি টাকা এবং রপ্তানিতে ৫০,০০০ কোটি টাকার আকাশছোঁয়া লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সামনে। কাশ্মীরের পহলগাম কাণ্ড বেদনাদায়ক। তবে এর জেরে ভারতের প্রত্যাঘাতে ব্যবহার হওয়া সমরাস্ত্র বিশ্বের বাজারে বিরাট সম্মান কুড়িয়েছে। এর অন্যতম হাতিয়ার হল ব্রহ্মস মিসাইল বা বিশেষ মিলিটারি ড্রোন। ভারতের এক নতুন সংস্থা গোটা পৃথিবী থেকে ‘এমআর ১০’ আর ‘এমআর ১০-আইসি’ ড্রোনের বরাত পেতে শুরু করেছে। আগামী চার বছরে ভারত পাখির চোখ করেছে সমরাস্ত্রের রপ্তানি ২০২৫-এর ২.৮ বিলিয়ন ডলার থেকে দ্বিগুণ করে ৫.৮ বিলিয়নে নিয়ে যাওয়াকে। বলাই বাহুল্য, এই এগিয়ে যাবার পথ নিজেই এক যুদ্ধ— ‘সিকিউসি’ (CQC) বা ‘ক্লোজ কোয়ার্টার কমব্যাট’। সরাসরি, সোজাসুজি, হাড্ডাহাড্ডি।
(লেখক সাংবাদিক)
