ক্যামাক স্ট্রিট কাণ্ডে কি তবে ‘শাসকের আইন’-ই প্রতিষ্ঠিত হল?
গোপীকৃষ্ণ সামন্ত
শিব ঠাকুরের আপন দেশে,/ আইন কানুন সর্বনেশে! সুকুমার রায়ের ‘একুশে আইন’ কবিতার এই পংক্তিটিই যেন বাংলার বর্তমান রাজনীতিতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। কবিতায় যেমন রাজার খেয়ালখুশিই ছিল আইনের একমাত্র ভিত্তি, ঠিক তেমনই ক্ষমতার পালাবদল হলেও বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সেই খেয়ালখুশির শাসন সত্যিই বদলেছে কি না, সেই প্রশ্ন আরও প্রাসঙ্গিক হয়েছে।
নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব গ্রহণের পরেই ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে, কোনও শাসকের আইন চলবে না।’ বিগত দিনের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও পুলিশি রাজ থেকে প্রশাসনকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূল নেতা তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয়ে যে ঘটনা ঘটল, তা রাজ্যের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড়ো প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
একটি বিলবোর্ড খোলা নিয়ে কলকাতা পুরনিগম (কেএমসি) কর্তৃপক্ষ যে অবস্থান নিল, তাতে বিলবোর্ডের বিষয়টিকে ছাপিয়ে, যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয়টিই আরও স্পষ্ট হল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসের উপরে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের বিলবোর্ডটিকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে তা সরাতে কর্তৃপক্ষ পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে যেভাবে সক্রিয়তা দেখিয়েছে, শহরের অন্যত্র শয়ে-শয়ে থাকা এমন অনুমোদনহীন হোর্ডিং খুলতে কি পুর কর্তৃপক্ষ একই উৎসাহ দেখাবে বলে অনেকেরই প্রশ্ন।
কিন্তু ঠিক কী ঘটেছে তৃণমূল নেতার অফিসে? পুর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসের উপরে থাকা তৃণমূলের বিশালাকার বিলবোর্ডটি অবৈধ। ফলে সেটি সরিয়ে ফেলা হবে। সেইমতো পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে পুর কর্তৃপক্ষ হাজির হয়। তবে সমস্যা বাধে এরপরেই। মুহূর্তেই পরিস্থিতি যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তাতে প্রশাসনিক অভিযানের চেহারা বদলে যায় রাজনৈতিক সংঘাতে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনাস্থলে এসে আধিকারিকদের কাছে লিখিত নির্দেশিকা দেখতে চান। যা নিয়ে দু’পক্ষের তর্কাতর্কি শুরু হয়। পরে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে পুরকর্মীরা অফিসের ভিতরে প্রবেশ করতেই দু’পক্ষ ধস্তাধস্তিতে জড়ায়। পরে মামলা, গ্রেপ্তারি এবং পালটা আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়। এরইমধ্যে শনিবার রাতে এই ঘটনা নিয়ে সমন দিয়ে অভিযেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে শেক্সপিয়র সরণি থানায় হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কলকাতা পুরনিগমের আইন অনুযায়ী, শহরের বুকে যে কোনও হোর্ডিং, বিলবোর্ড বা পরিকাঠামো সরানোর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রোটোকল রয়েছে। যদি কোনও পরিকাঠামো সাধারণ মানুষের জীবন বা সম্পত্তির জন্য তাৎক্ষণিক বিপদের কারণ না হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা মালিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। এমনকি পরিকাঠামোটি যদি বেআইনি প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে আগাম নোটিশ দিতে হবে। কিন্তু ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় সেই ন্যূনতম আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল হলেও বিরোধী দলের ওপর প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার আগে তাদের মূল স্লোগান ছিল ‘বদলা নয়, বদল চাই’। কিন্তু পরবর্তীতে তা কতটা পালন হয়েছে, বিতর্ক সাপেক্ষ। সময়ের নিয়মে রাজ্যে ফের ক্ষমতার হাতবদলের পর প্রশাসনের এমন পদক্ষেপ সেই প্রশ্নটিকে আবারও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যখন বিরোধী আসনে ছিলেন তখন তিনি যে পুলিশি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন, আজ তাঁরই পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ ওঠা নিঃসন্দেহে এক চরম রাজনৈতিক পরিহাস।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের অধিকার, তাদের স্বাধীন রাজনৈতিক প্রচারের পরিসর এবং মতপ্রকাশের অধিকার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আইনি ব্যবস্থার চোখে শাসক ও বিরোধী দলের অধিকার সর্বদা সমান হওয়া উচিত। তাই ক্যামাক স্ট্রিটের বিলবোর্ড খোলার ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি কাঠামো ভেঙে ফেলার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক সহনশীলতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিরও এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকার ও কলকাতা পুর কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে জনসমক্ষে স্পষ্ট করতে হবে যে, ঠিক কোন আইনি যুক্তিতে এই অভিযান চালানো হল। তা না হলে রাজ্যের মানুষের মনে এই ধারণাই বদ্ধমূল হবে যে, রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিশ্রুত ‘আইনের শাসন’-এর বদলে সেই পুরোনো ‘শাসকের আইন’-ই নতুন মোড়কে স্বমহিমায় ফিরে এসেছে।
(লেখক সাংবাদিক)

