বিখ্যাত প্রয়াত সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরী এক সময় ছিলেন চেন-স্মোকার। ঠোঁটে একটা সিগারেট থেকে আর-একটা ধরাতেন। কোনও বন্ধু তাঁকে একদিন বললেন, ‘এইভাবে সিগারেট খেও না, মারণরোগ হয়। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আরে আমি তো সস্তার দেশি সিগারেট খাই। ভেজাল তামাক। খাঁটি তামাক থেকে বড় বড় ব্যামো হয়।’
সাহিত্যিকের এই উক্তির বিদ্রুপাত্মক সারবার্তাটি হল, এ দেশে সিগারেটের তামাকেও ভেজাল। সত্যিকথা বলতে, মাতৃদুদ্ধের পরে এই যুগের বাঙালি আর কখনও নির্ভেজাল খাদ্য ও পানীয়র স্বাদ পেয়েছে বলে তো মনে হয় না। যত সুসভ্য হচ্ছি আমরা, যত উঁচু হচ্ছে আমাদের আপাত যাপনের নিরিখ, প্রাত্যহিক বিন্যাসের বাহার, ততই নামছে আমদের খাদ্যের মান-ইজ্জত, বিশুদ্ধির মাত্রা। তবে এই ট্রাজিক ডাইকোটমি, বেদনাদায়ক বৈপরীত্যে আমরা এত দূর অভ্যস্ত যে, আমাদের দেহ ও হজমশক্তি বিচিত্র মাপের ভেজাল ও পচা খাবারের সঙ্গে বেশ আপস করে মানিয়ে নিতে শিখে গিয়েছে। আমরা খাদ্যের দেখনদারি, সাজগোজ, গার্নিশিং দেখে বাচ্চাদের মতো ভুলে যাই, এবং রেস্তরাঁ থেকে বাসি, পচা, ফাঙ্গাস আক্রান্ত খাবার বাইকবাহনে বাড়িতে এনে সপরিবার ভক্ষণ করি। এবং পার্ক স্ট্রিটকে আমরা এখনও ভাবি খাদ্যের ভূস্বর্গ। দামে গলাকাটা হয় হোক, স্বাস্থ্যকর তো বটে- এই হচ্ছে আমাদের পার্ক সিঁট স্বপ্ন।
আরও পড়ুন:
এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কঠোর ঘোষণা হল— সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এইভাবে ছিনিমিনি খেলা আর চলবে না।
আরও পড়ুন:
কিন্তু সেই সুখস্বপ্নে বালি ছড়িয়ে দিয়েছে গত তিনদিন ধরে প্রায় আড়াই হাজার রেস্তরাঁ-হোটেলের রান্নাঘর এবং খাদ্যবস্তুর রক্ষণব্যবস্থার অন্দরমহলে ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ ডিপার্টমেন্টের টানা গোয়েন্দাগিরি। পরীক্ষা হয়েছিল প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার খাবারের নমুনা। তার মধ্যে ১২০০-র মতো খাবার নিরাপদ মানদণ্ডই ছুঁতে পারেনি। এটি সরকারের নিজস্ব রিপোর্টে উল্লেখিত তথ্য। আরও একটি গা শিউরে ওঠার মতো তথ্য হল, এক বছরে ‘খারাপ’ খাবার ৮.৩৯ শতাংশ। উদ্বেগজনক বিষয় আরও এই পরীক্ষায় পার্ক স্ট্রিটের দু’-একটি রেস্তরাঁ ছাড়া প্রতিটি ‘ফেল’। মনে পড়ে যাচ্ছে ৮ বছর আগে কলকাতার রেস্তরাঁয় ভাগাড়ের মাংসের বিস্ফোরক স্কান্ডাল। তাও ক্রমে চাপা পড়ে গেল। এখনও নামী-দামি পার্ক সিটি রেস্তরাঁয় পাওয়া যাচ্ছে বাসি মাংস, পচা মাছ, ফাঙ্গাস-ধরা খাদ্য। তবে এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কঠোর ঘোষণা হল— সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এইভাবে ছিনিমিনি খেলা আর চলবে না।
এ বছরের ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপে নরগুয়ের ফুটবল টিম গিয়েছিল আমেরিকায়। সেই দলে ছিলেন হালান্ড এবং ওডেগার্ডের মতো প্লেয়ার। নরওয়ে বিশ্বাস করেনি খাদ্যদ্রব্যের মার্কিন স্ট্যান্ডার্ডে এবং তাদের খাদ্যদ্রব্যের সুরক্ষণ ব্যবস্থায়। সুতরাং তাদের খেলোয়াড়দের জন্য তারা খাবার বয়ে নিয়ে গিয়েছিল। ছিল নরওয়ের মাছ ৫০০ কেজি। এবং নরওয়ের গরু ও ছাগলের দুধ দিয়ে তৈরি বিখ্যাত ও বিশুদ্ধ ব্রনস্ট চিজ। ভাগ্যিস, মেসি কলকাতায় আসার আগে শহরের খাদ্যমানের এই শোচনীয় অবস্থা প্রকাশ্যে আসেনি। তাহলে হয়তো মেসি রিস্ক নিতেন না।।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
