কৌশিকরঞ্জন খাঁ
সাম্প্রতিককালে কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় সরকারেরই বাজেট পেশ হয়েছে। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় বাজেট হল একটি দিশারি দলিল, যা আগামী এক বছরের উন্নয়নের পথচিত্র তৈরি করে। কিন্তু মানুষ যখন তুলনামূলক পর্যালোচনা করতে বসছে, তখন উভয় সরকারের বাজেটের অন্দরমহলে একটি মৌলিক এবং উদ্বেগজনক মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে উভয় বাজেটেই সরকারি কর্মসংস্থান সৃষ্টির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ব্রাত্য রয়ে গিয়েছে। কেন্দ্রীয় বাজেট এখন সাধারণ মানুষের কাছে কেবল বার্ষিক হিসাবনিকাশের খতিয়ানে পরিণত হয়েছে—যেখানে নজর থাকে কোন কোন জিনিসপত্রের দাম বাড়ল বা কমল এবং আয়করের নিম্নসীমা কতটা বদলাল। অন্যদিকে, রাজ্য বাজেটের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ‘পাখির চোখ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ভাতার পরিমাণ বাড়ছে কি না।
পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ তাদের দৃষ্টি এর বেশি আর প্রসারিত করতে পারছে না, অথবা বলা ভালো, করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। মানুষের চাহিদা আজ এতটাই সীমিত হয়ে পড়েছে যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হতাশায় তারা বড় কিছু আশা করতেও ভয় পায়। ‘কোনওমতে দিন কেটে গেলেই হল’—এই ধরনের এক গভীর নেতিবাচক মানসিকতা আজ আমাদের সমাজকে গ্রাস করে নিচ্ছে। এর ফল কিন্তু হাতেনাতেই পাওয়া যাচ্ছে। বড় শহরের কৃত্রিম চাকচিক্য বাদ দিলে উত্তরবঙ্গের জেলা বা মহকুমা শহরগুলো আজ এক অদ্ভুত স্থবিরতার ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে পড়ছে। গ্রামীণ জীবন হতাশার তলানিতে এসে ঠেকছে, যেখানে ভবিষ্যতের কোনও নিশ্চিত আলো নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু দপ্তরে স্থায়ী কর্মী অল্প হলেও নিযুক্ত হয়, কিন্তু সেখানে মেধাবীরাই অগ্রাধিকার পায়। সাধারণ মানুষের জন্য আশার কথা শোনানোয় তো ক্ষতি নেই! বালুরঘাটের সাংসদ কেন্দ্রীয় সরকারের নানা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ‘কর্মসংস্থান’ অ্যাপ খুলেছেন। উদ্যোগী নেতৃত্ব এই জাতীয় আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বেকার তরুণ–তরুণীদের সমস্যার সমাধানের আন্তরিকতা দেখাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান না হলে কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারে দারিদ্র্য ঘুচবে না।
অস্থায়ী নিয়োগের দাপট ও মেধার অবমূল্যায়ন
রাজ্য সরকারের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বিষয়টি নিয়ে কোনও দিশারি কর্মসূচি বা ভাবনাচিন্তা নেতা-মন্ত্রীদের তরফে চোখে পড়ে না। সর্বত্রই ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’ নীতিকে আঁকড়ে ধরা হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ জীবন নিয়ে কোনও বড় এবং স্থায়ী পরিকল্পনা করতে রীতিমতো ভয় পাচ্ছে। সমাজের সবচেয়ে উঁচু স্তরের সরকারি কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনা করলে প্রথমেই আসে ‘ডাক্তারি’ পেশার কথা। অথচ করুণ বাস্তবতা হল, বহু বছর ধরে অমানুষিক পরিশ্রম করে পড়াশোনা করার পর দেখা যাচ্ছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্থায়ী পদ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ডাক্তারের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পেশাও এখন চলছে চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী নিয়োগের মাধ্যমে।
সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত ডাক্তারদের নাম ফলাও করে জেলা শহরগুলোর পলিক্লিনিক ও নার্সিংহোমগুলোতে বিজ্ঞাপনের মতো দেখা যায়। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সেই সব নামের ৮০ শতাংশই আসলে চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী ডাক্তার। এত মেধা, এত সময় অপেক্ষা করে যদি নামমাত্র বেতনে অস্থায়ী হিসেবে জীবন শুরু করতে হয়, তবে আগামীদিনে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা কেন এই পেশায় আসবে? হয়তো উত্তরবঙ্গের মেডিকেল কলেজগুলোর দশাও রাজ্যের বিএড কলেজগুলির মতোই হবে। একের পর এক গজিয়ে ওঠা বিএড কলেজ যেমন শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা নিয়মিত না হওয়ায় আজ ‘ভূতুড়ে বাড়ি’ হয়ে উঠেছে, মেডিকেল কলেজগুলোর ভবিষ্যৎও হয়তো তাই। অথবা উপযুক্ত পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় আগামীদিনের ডাক্তারদের হয়তো অপারেশন থিয়েটারে ‘ইউটিউব’ খুলে অস্ত্রোপচার শিখতে হবে—যা একটি উন্নত সমাজের পক্ষে চরম লজ্জার।
উচ্চশিক্ষায় অনীহা ও শিক্ষিত যুবসমাজের গন্তব্য
সরকারি কর্মসংস্থানের আশা-ভরসা না থাকায় গ্রামীণ অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কলেজ শিক্ষা গ্রহণের প্রবল অনীহা তৈরি হয়েছে। সরকার ব্লকে ব্লকে কলেজ খুলে দিলেও সেখানে না আছে পর্যাপ্ত স্থায়ী অধ্যাপক, না আছে নিয়মিত ছাত্রছাত্রী। পড়াশোনা শেষ করে যদি কাজই না পাওয়া যায়, তবে সেই ডিগ্রির মূল্য কোথায়? এই অনিশ্চয়তা থেকেই যুবসমাজ আজ সময় নষ্ট না করে নানা ছোটখাটো পেশায় ঝুঁকে পড়ছে। ডেলিভারি বয়, ক্যাবচালক, মলে সাধারণ কর্মী, কোম্পানির সেলসম্যান বা লোন রিকভারি এজেন্টের মতো পেশাই এখন গ্রাম-শহরের শিক্ষিত বেকারদের শেষ আশ্রয়। কিন্তু এই পেশাগুলোর ভবিষ্যৎ কী? এখানেও তো সেই শ্রম শোষণের নগ্ন রূপ প্রকট।
সহজলভ্যতার কারণে কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে তারা কি ন্যায্য পারিশ্রমিক পায়? মাত্র পনেরো-বিশ হাজার টাকার এই অস্থায়ী চাকরি কোনওভাবেই জীবনের স্থায়ী পরিকল্পনা করতে দেয় না। এই সীমিত আয়ে কোনওমতে দিনগুজরান হয়তো সম্ভব, কিন্তু সংসার রচনা বা পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার মতো গুরুদায়িত্ব পালন করতে অনেকেই আজ সাহস পাচ্ছে না। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গ তথা উত্তরবঙ্গের সামাজিক ও পারিবারিক সংগঠন ভেঙে পড়ছে। বিয়ে হচ্ছে না, আর সংসার হলেও পরবর্তী প্রজন্মকে পৃথিবীতে আনতে ভয় পাচ্ছে আর্থিক নিরাপত্তাহীন বাবা-মায়েরা। অস্থির অর্থনীতি আজ আমাদের সাংসারিক ও সামাজিক বন্ধনের ভিতকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে। মেধা ও শ্রম—উভয়েরই মর্যাদা আজ শূন্যের কোঠায়।
বিপন্ন কৃষি পরিকাঠামো ও উন্নয়নের অন্তঃসারশূন্যতা
যাঁরা এ রাজ্যের মায়া কাটিয়ে গুজরাট বা মহারাষ্ট্রে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে চলে যাচ্ছেন, তাঁরা হয়তো বিদেশের মাটিতে খেটেখুটে দু-পয়সার মুখ দেখছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে থেকে যাওয়া মানুষগুলো আজ কৃষিক্ষেত্র থেকে পর্যাপ্ত আয় করতে পারছে না। চাষাবাদের বিপুল ব্যয়ভার বহন করে ফসল ওঠার পর যখন কৃষক উপযুক্ত দাম পায় না, তখন সমগ্র গ্রামীণ জনপদে এক অন্ধকারময় বিষণ্নতা ছেয়ে যায়। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কথাই যদি ধরা যায়, তবে দেখা যাবে এবছর ধানের দাম সরকারি রেটের চেয়ে অনেক কম দামে হাটেবাজারে পাইকারি বিক্রি হয়েছে। কৃষিমান্ডিগুলিতে সরকার ধান কেনা বন্ধ করলে দাম আরও পড়ে যাবে—এই ভয়ে কৃষকরা তড়িঘড়ি যা পাচ্ছেন তাতেই ফসল বিক্রি করে দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে উন্নয়নের জৌলুস দেখানো হচ্ছে, তার বেশিরভাগটাই অন্তঃসারশূন্য। ঘটা করে রিভারড্যাম বা নদীবাঁধ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বছর ঘুরতেই বর্ষার জলে তা ধসে যাচ্ছে। রাস্তাঘাট হচ্ছে, কিন্তু তড়িঘড়ি করা সেই পিচের তলা থেকে কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ছে কয়েক মাসেই। এমনকি লোহার রডের বদলে কঞ্চি দিয়ে স্ল্যাব ঢালাই করার মতো ঘটনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে ঠিকাদারদের। জনগণের অর্থ জনগণের কাজে লাগছে না, যেন ভস্মে ঘি ঢালা হচ্ছে। কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার না থাকায় মানুষের মূল্যবোধের মান যেমন কমছে, তেমনি কাজের মানও তলানিতে ঠেকছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রান্তিক সাধারণ মানুষকেই।
মফসসলের স্তিমিত অর্থনীতি ও বিপন্ন স্বপ্নের ভবিষ্যৎ
একসময়ের ছোট ছোট দোকানপসারে সাজানো মফসসল শহরগুলোতে জৌলুস না থাকলেও একটা শান্তি ছিল। এখন মহানগরের ছোঁয়ায় বিগ হাউস বা বড় শপিং মল ছোট শহরগুলোতে ছেয়ে গিয়েছে। কিন্তু শুধু আলো জ্বালিয়ে কি উন্নয়ন হয়? গ্রাম ও ছোট শহরের হতাশা আর অন্ধকার এই জৌলুসকে ম্লান করে দিচ্ছে। স্থায়িত্ব না থাকলে সবকিছুর ভিতই নড়বড়ে। ছোট শহরগুলোতে প্রোমোটার তৈরি হল, অসংখ্য ফ্ল্যাট তৈরি হল ; প্রথম দিকে কিছু কাটতি হলেও এখন বাজার স্থবির। কারণ কে কিনবে ওই চড়া দামের ফ্ল্যাট? দশ-পনেরো হাজার টাকার অস্থায়ী চাকরি করা তরুণ কি আবাসন কেনার স্বপ্ন দেখতে পারেন? রাজ্য সরকারের দেওয়া সামান্য ভাতা কি একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো অটুট রাখতে পারে?
(লেখক অক্ষরকর্মী। বালুরঘাটের বাসিন্দা।)
