পঞ্চানন কর্মকার একজন কৃতী অথচ বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি। বাংলা ভাষার বিকাশে কাজের পরিধি আর অবদানের গুরুত্বের বিচারে তাঁর পরিচিতি আর প্রাপ্য সম্মান অনেকটাই বেশি হওয়া উচিত ছিল। তাঁর জীবনী নিয়ে রজত চক্রবর্তীর লেখা ‘পঞ্চাননের হরফ’ নামে একটিমাত্র বই প্রকাশিত হয়েছিল। পরে অনীক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে দেবাশিসের নির্দেশনায় ‘আক্ষরিক’ বলে একটি নাটক মঞ্চস্থ হয় যেটির চিত্রনাট্য রজতবাবুর বইয়ের ভিত্তিতে লেখা হয়।
১৪৪০ সালে জার্মান স্বর্ণকার জোহানেস গুটেনবার্গ প্রথম আবিষ্কার করেন মেকানাইজড প্রিন্টিং প্রেস। অবশ্য তার আগেও ছাপার চল ছিল। গুটেনবার্গের মেশিন আসার পর ছাপার গতি বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে কম্পিউটার আর ডিজিটাল প্রযুক্তি আসার পর সবকিছুর মতো প্রিন্টার জগতেও আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। ভারতবর্ষের ছাপাখানার ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়া যাক। ভারতে প্রথম প্রিন্টিং প্রেস আমদানি করে পর্তুগিজরা৷ প্রায় সব ক্ষেত্রেই মূল উদ্দেশ্য থাকত ধর্ম সংক্রান্ত বই বা লিফলেট ছাপানো, প্রচারের জন্য। ভারতীয় ভাষার মধ্যে ছাপার আকার প্রথম আসে তামিল। ব্রিটিশরা বাংলাতে প্রিন্টিং প্রেস বসিয়েছিল বেশ কয়েক জায়গায়। কলকাতায় তখন ব্যবসা এবং কর্মসূত্রে বহু ইংরেজের আনাগোনা। স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য অন্তত কাজ চালানোর মতো বাংলাটা তাদের জানার প্রয়োজন ছিল। ওয়ারেন হেস্টিংস অনুরোধ করেন বাংলা শেখার মতো একটা ব্যাকরণ বই যদি হ্যালহেড সাহেব লিখে তাঁদের প্রেসে ছাপাতে পারেন, বড়ই উপকার হয় তাহলে। যেমন কথা তেমনি কাজ, সাহেবদের জন্য সহজে বাংলা শিক্ষার বই তৈরি হয়ে গেল ‘এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গোয়েজ’। লেখক হ্যালহেড। গোল বাধল বই ছাপতে গিয়ে। বইটির অনেকটাই ইংরেজিতে। সেটা সমস্যা নয়, কিন্তু প্রচুর বাংলাও তো আছে, আর সেটা ছাপতেও হবে বাংলা অক্ষরে, কিন্তু বাংলা টাইপফেস তখন কোথায়? ইংরেজিতে ২৬টি বর্ণ, বাংলায় স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ মিলিয়ে ৫০টি, তার ওপর গোদের ওপর বিষফোড়া যুক্তাক্ষর। সাহেব কারিগররা হিমসিম খেয়ে গেলেন সেই সব জটিল অক্ষরের টাইপফেস তৈরি করতে গিয়ে, কিছুতেই আর কিছু দাঁড়ায় না। সে সময় হ্যালহেড সাহেবের সহযোগী ছিলেন চার্লস উইলকিন্স, ছাপার প্রযুক্তিগত দিকগুলি দেখতেন তিনিই। অবস্থা দেখে তাঁরও মাথায় হাত, তবে কি আর বই বেরোবে না? অবশেষে হল মুশকিল আসান, উইলকিন্স সাহেব খুঁজে পেলেন পঞ্চানন কর্মকারকে।
পঞ্চানন কর্মকারের জন্ম হয়েছিল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, অধুনা হুগলি জেলার ত্রিবেণিতে৷ সেকালে বৃত্তি হিসেবে পদবি হত, এঁরা ছিলেন পেশায় কামার। তবে এই পরিবারের বিশেষ দক্ষতা ছিল সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মেটাল এনগ্রেভিংয়ের কাজে। পারিবারিক জিনগত কারণেই হয়তো পঞ্চাননেরও একাজে সহজাত প্রতিভা ছিল। উইলকিন্স সাহেবের জহুরির চোখ শিল্পী চিনতে ভুল করেনি। তিনি পঞ্চাননকে তুলে নিয়ে এলেন বেঙ্গল প্রেসে। উইলকিন্স সাহেবের তত্ত্বাবধানে এক নাগাড়ে কাজ করে, বহু পরিশ্রমে ধাতুর উপর এক এক করে ফুটিয়ে তুললেন নিখুঁত এক একটি বাংলা অক্ষর। তৈরি হল প্রথম বাংলা টাইপফেস। পঞ্চানন কর্মকারের বানানো টাইপফেসের কল্যাণে বাংলা অক্ষর সর্বপ্রথম ছাপার আকারে আত্মপ্রকাশ করল হ্যালহেড সাহেবের বাংলা ব্যাকরণের বইয়ে। সেটা ছিল ১৭৭৮ সাল। সে যুগে সাহেবরা এদেশীয়দের কৃতিত্ব দিতেন না সেভাবে, এখানেও ব্যতিক্রম হয়নি, কাজ করিয়ে নিলেও হ্যালহেড বা উইলকিন্স সাহেব প্রকাশ্যে খুব যে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছিলেন এমনটি জানা যায় না। পঞ্চানন রয়ে গিয়েছিলেন আড়ালেই।
এরপর আরেকটি মোড় আসে ১৮০০ সালে যখন ব্রিটিশ যাজক উইলিয়াম ক্যারি শ্রীরামপুরে এসে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস তৈরি করেন। ক্যারি সাহেব বাংলায় এসেছিলেন ধর্মপ্রচার করতেই। তিনি বুঝেছিলেন স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে যিশুর বাণী প্রচার করার জন্য বাংলায় বাইবেল ছাপানো একান্তই জরুরি। সে চেষ্টাতেই তিনি লেগে ছিলেন। তার আগেই পঞ্চাননের হাতে বাংলা টাইপফন্ট তৈরি হয়ে গিয়েছে বলে খবরও পেয়েছিলেন। কেবল দরকার ছিল একটা প্রিন্টিং মেশিন। সেক্ষেত্রে কলকাতায় শুরু করতে চাইলেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তাঁর খিটিমিটি বাধে, ফলে খানিকটা পালিয়েই তিনি চলে আসেন ডেনমার্ক অধ্যুষিত শ্রীরামপুরে। এখানে সতীর্থ যাজক উইলিয়াম ওয়ার্ড আর জোশুয়া মার্শম্যানের সঙ্গে মিলে শুরু করেন ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’। এই তিনজনই ‘শ্রীরামপুর ট্রায়ো’ নামে বিখ্যাত। এই প্রেসে বাইবেল সহ অন্যান্য বইয়ের বাংলা অনুবাদ ছাপা শুরু হয়। এছাড়াও শুরু হয় টেক্সটবুক, ডিকশনারি প্রভৃতি ছাপার কাজ। অচিরেই কাজকর্ম ফুলেফেঁপে ওঠে। প্রথমে টাইপ সেটিং করতেন উইলিয়াম নিজেই। পরে কাজ যখন বাড়ে পঞ্চানন মিশন প্রেসে এসে যোগ দেন। এক্সপার্ট টাইপকাটার হিসেবে তাঁর তখন বেশ নামডাক। জামাই মনোহর কর্মকার, ভাই গদাধর কর্মকারকে কাজ শিখিয়েছিলেন আগেই। তাঁরা সবাই ছিলেন মিশন প্রেসে। তাঁর উদ্যোগেই এখানে বড়সড়ো টাইপকাস্টিং ফাউন্ড্রি তৈরি হয়।
পঞ্চাননের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ শ্রীরামপুরে ভারতবর্ষের প্রথম টাইপকাটিং প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন। মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পঞ্চানন অবশ্য বেশিদিন বাঁচেননি, মারা যান ১৮০৪ সনে। কিন্তু যে ভিত তিনি গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন তার সুফল পেয়েছিল মিশন প্রেস। পরের ৩০ বছরের মধ্যে মিশন প্রেস থেকে অন্তত ৪৫টি ভাষায় এবং ১৮ রকম ফন্টে বই প্রকাশ হয়েছিল। সবই সম্ভব হয়েছিল পঞ্চাননের নিজের হাতে শিখিয়ে যাওয়া টাইপফন্ট তৈরির সূক্ষ্ম কলাকৌশলের কারণে। কাজের পুরস্কার হিসেবে পঞ্চানন কর্মকার এবং তাঁর পরিবারের যে যথেষ্ট আর্থিক সাচ্ছল্য এসেছিল। প্রমাণ হিসেবে শ্রীরামপুরের জিটি রোডের ধারে তাঁর প্রাসাদোপম বাড়িটি আজও সগর্বে দাঁড়িয়ে। বাড়িটির আরেকটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। স্বয়ং বিদ্যাসাগর মশায়ের পদধূলিতে ধন্য এই বাড়ি। তিনি যখন বাংলা বর্ণমালা নিয়ে কাজ করছিলেন সেসময় কর্মকার পরিবারের প্রেসে বাংলা ফন্টের ব্যবহারের তত্ত্বাবধান করতে এসেছিলেন। শোনা যায় তিনি নিজের হাতে বর্ণমালার একটি ডায়াগ্রাম বানিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন টাইপফেস বানানোর সময় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। এতদিন বিস্মৃতপ্রায় থাকলেও আনন্দের কথা হল বর্তমানে পঞ্চানন কর্মকারের বংশের একমাত্র উত্তরসূরি প্রিয়াংকা মল্লিক সর্বতোভাবে চেষ্টা করছেন তাঁর পূর্বপুরুষের কাজকে জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য। প্রিয়াংকা হলেন পঞ্চানন কর্মকারের ভাই গদাধর কর্মকারের পরিবারের চতুর্থ প্রজন্ম। একদা কর্মকার পরিবারের পাওয়া উপাধি মল্লিকই তাঁরা ব্যবহার করেন। প্রিয়াংকা তাঁর বাবার একমাত্র সন্তান। বছর কয়েক আগে বাবার মৃত্যুর পর তিনিই পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী। পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
