পরীক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে যন্তরমন্তরে সোনম ওয়াংচুকের টানা ১৯ দিনের আমরণ অনশনের প্রতি আমজনতার এই চরম উদাসীনতা আসলে আমাদের পচে যাওয়া বিবেকেরই নগ্ন রূপ।
শুভঙ্কর চক্রবর্তী
রুপোলি পর্দায় যখন ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর ক্লাইম্যাক্স ঘনিয়ে আসে, তখন প্যাংগং হ্রদের ধারে ফুংসুক ওয়াংডুকে আবিষ্কার করে দর্শক হাততালিতে ফেটে পড়েছিল। পপকর্ন হাতে বসে থাকা আমজনতা ভেবেছিল, যাক, জিনিয়াস শেষপর্যন্ত তার যোগ্য সম্মান পেল! সিনেমায় চশমা পরা, রগচটা ডিন ‘ভাইরাস’-ও শেষমেশ নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফুংসুককে জড়িয়ে ধরেছিলেন। কিন্তু বাস্তবের চিত্রনাট্য তো আর বলিউডের কোনও পরিচালক লেখেন না। বাস্তবের মাটিতে তাই ফুংসুক ওয়াংডু, অর্থাৎ সোনম ওয়াংচুককে দিনের পর দিন না খেয়ে বসে থাকতে হয়। সিনেমা শেষ হলে হলের আলো জ্বলে ওঠে, কিন্তু লাদাখের এই স্বপ্নদ্রষ্টার বাস্তবের লড়াই শেষে আজও আলো জ্বলেনি। সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের শব্দ রাষ্ট্রের কান পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য নিজের শরীরটাকেই তিল তিল করে ক্ষয় করছেন সোনম। তবুও আমজনতার মূল্যবোধের বাতি টিমটিম করছে।
রাষ্ট্রের চরিত্রটি বরাবরই বড় অদ্ভুত। যতদিন সোনম তাঁর অভিনব ‘আইস স্তূপ’ বানিয়ে খরাপীড়িত লাদাখে জলের বন্দোবস্ত করেছেন, কিংবা সৌরশক্তিচালিত পরিবেশবান্ধব তাঁবু বানিয়ে সেনার সাহায্য করেছেন, ততদিন রাষ্ট্র তাঁকে মাথায় তুলে রেখেছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুরস্কার পেয়ে যখন দেশের নাম উজ্জ্বল হয়েছে, তখন বাহবা দিতে কেউ কার্পণ্য করেনি। কিন্তু গোল বাধল তখনই, যখন সেই ‘জাতীয় হিরো’ লাদাখের পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং শিক্ষার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। যখন তিনি ষষ্ঠ তফশিলের দাবি তুলে মনে করিয়ে দিলেন যে, কর্পোরেট লোভের হাত থেকে পাহাড়ের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রকে বাঁচানো দরকার, তখন হঠাৎ করেই রাষ্ট্র যেন কানে তুলো গুঁজে দিল। প্রশ্ন যখন জোরালো হল তখন হিরো থেকে রাতারাতি ‘দেশদ্রোহী’ তকমা সেঁটে দেওয়া হল সোনমের কপালে। সিনেমার ‘ভাইরাস’ তাও নিজের ভুল স্বীকার করেছিলেন, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক আর রাজনৈতিক ভাইরাসে আক্রান্ত আমাদের সিস্টেম বড্ড বেশি একগুঁয়ে।
ওয়াংচুকের এই লড়াইয়ের একেবারে কেন্দ্রে মিশে আছে তাঁর নিজস্ব শিক্ষাদর্শন। তিনি তাঁর বিকল্প স্কুল ‘সেকমোল’ তৈরি করেছিলেন তথাকথিত ফেল করা, বাতিল ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। হাতেকলমে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, সমতলের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে বানানো সিলেবাস লাদাখের রুক্ষ ভূপ্রকৃতির জন্য নয়। যে শিশুটি হিমাঙ্কের নীচে তাপমাত্রায় মাটি আর বরফের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার কায়দা জানে, তাকে সমতলের মডেলে কেরানি বানানোর এই যে বিশাল কারখানা, তার বিরুদ্ধেই তো ওয়াংচুক চিরকাল আওয়াজ তুলেছেন। আর আজ, দিল্লির যন্তরমন্তরে তাঁর চলতে থাকা এই আমরণ অনশনের মূলেও রয়েছে সেই শিক্ষারই চরম অবক্ষয়ের প্রতিবাদ।
সর্বভারতীয় স্তরের পরীক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারির পর শিক্ষার আমূল সংস্কার ও জবাবদিহির দাবিতেই মূলত তাঁর এই অনশন। তাঁর দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট— এই ভয়াবহ দুর্নীতির, বিশেষ করে ‘নিট’ প্রবেশিকা পরীক্ষার কেলেঙ্কারির নৈতিক দায়ভার কাঁধে নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। সোনমের জেদ পাহাড়ের মতোই অটল; যতক্ষণ না সরকার সরাসরি এই ছাত্র-আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সদর্থক আলোচনায় বসে এই ব্যর্থ সিস্টেমের সমাধান করছে, ততক্ষণ তিনি অনশন ভাঙবেন না। লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে তিনি আজ সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, কঠোর দুর্নীতিদমন নীতি এবং ভারতের কেন্দ্রীভূত পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল পুনর্গঠনের ডাক দিয়েছেন।
প্যাংগং হ্রদের ধারে হলুদ স্কুটার নিয়ে পর্যটকরা ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর স্মৃতি হাতড়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত। অথচ সেই সিনেমার আসল অনুপ্রেরণা একাকী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন চরম উদাসীনতার বিরুদ্ধে। তা নিয়ে সেই অর্থে কারও ভ্রূক্ষেপ নেই। রুপোলি পর্দার হিরোরা আড়াই ঘণ্টার শেষে জিতে যায় ঠিকই, কিন্তু বাস্তবের স্বপ্নদ্রষ্টাদের লড়তে হয় এক অনন্ত ক্লান্তিকর লড়াই। সোনম ওয়াংচুকের এই অনশন আসলে আমাদের গোটা ব্যবস্থারই এক চরম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে একজন বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদকে তাঁর মেধা, তাঁর উদ্ভাবন সবকিছু সরিয়ে রেখে, বেঁচে থাকার আর দেশের ভবিষ্যৎ বাঁচিয়ে রাখার দাবিতে অনশন করে শুকিয়ে যেতে হচ্ছে। তাই সিনেমার শেষের হাততালি, বাস্তবের শূন্যতায় নিষ্ঠুর ব্যঙ্গের মতো শোনায়।
১৪০ কোটির দেশে সোনমের পাশে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা নগণ্য। তবুও এক বুক পাহাড়প্রমাণ জেদ নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় আচমকা যখন তাঁর সেই পরিশ্রান্ত, শুকিয়ে যাওয়া মুখখানা ভেসে ওঠে, তখন যে কোনও সংবেদনশীল মানুষের বুকের ভিতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যেতে বাধ্য। তবুও ওই ক্লান্ত চোখের দৃষ্টিতে এখনও হিমালয়ের মতো অটল এক জ্বলন্ত আগুন। তবে দিনের শেষে দিল্লির বাতাসে ভাসছে একটাই প্রশ্ন, যাঁদের জন্য এই আত্মত্যাগ, সেই মানুষরা কি আদৌ তাঁর দিকে একবার ফিরে তাকাচ্ছেন?
সোনম লড়ছেন আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুরক্ষিত, দুর্নীতিমুক্ত ভবিষ্যৎ রেখে যাওয়ার জন্য। সেই প্রেক্ষিতে তাঁর এই লড়াই কেবল লাদাখের নয়, গোটা ভারতের। কিন্তু এক রূঢ় সত্য হল, যাঁদের জন্য মানুষটা তিলে তিলে নিজেকে শেষ করছেন, তাঁদের বিন্দুমাত্র কোনও হেলদোল নেই। চারদিকে সবাই যেন বধির। চরম স্বার্থপর নীরবতার বাতাস বইছে। যন্তরমন্তর একসময় দেশের প্রতিবাদের, অধিকার আদায়ের সবচেয়ে বড় প্রাঙ্গণ ছিল। আজ সেখানে সোনমের সমর্থনে লাখো মানুষের ঢল নেই, আকাশ-কাঁপানো কোনও স্লোগান নেই।
দেশের স্বার্থে, শিক্ষার স্বার্থে একজন বরেণ্য বিজ্ঞানী যখন অনাহারে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, তখন এই উপমহাদেশ যেন কুম্ভকর্ণের ঘুমে আচ্ছন্ন। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, এর চেয়ে বড় লজ্জা এই স্বাধীন দেশের আর কী হতে পারে? আমরা কি সত্যিই এক অকৃতজ্ঞ জাতিতে পরিণত হয়েছি? পাঠ্যবইয়ে ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম বা গান্ধিজির আত্মত্যাগের কথা পড়ে আমাদের চোখে জল আসে ঠিকই, কিন্তু চোখের সামনে যখন একজন জলজ্যান্ত মহামানব নিজের জীবন বিপন্ন করেন, তখন মেরুদণ্ড সোজা করে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর সাহসটুকু আমাদের হয় না। যে সমাজ আজ ভেতর থেকে পচে গিয়েছে, যে সমাজের বিবেক গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, সেই মৃত সমাজের জন্য এক সোনার মানুষের এই আত্মাহুতি বড় বেমানান।
যাঁদের অধিকারের জন্য সোনম গলা ফাটাচ্ছেন, তাঁরা যেন জন্ম থেকেই বধির। আসলে মূল্যবোধের চর্চায় আমরা বারে বারে গোল্লা পেয়েই আসছি। জীবিত অবস্থায় আমরা বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগর, রামমোহনকেও কটাক্ষ করতে ছাড়িনি, তীব্র যন্ত্রণা দিয়েছি। রবীন্দ্রনাথকেও সহ্য করতে হয়েছে আমাদের গঞ্জনা। স্বাধীন ভারতে দাঁড়িয়ে নেতাজিকে নিয়ে উপহাস করতেও আমরা পিছপা হচ্ছি না। তাই সোনমের অনশন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মিম তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যে মানুষটা সত্যিই ঘুমিয়ে আছে, তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগানো যায়। কিন্তু যে সমাজ সচেতনভাবে ঘুমিয়ে থাকার ভান করে আছে, তাকে প্রাণ দিয়েও জাগানো অসম্ভব। সোনমের এই অপরিসীম ত্যাগের মূল্য বোঝার মতো সংবেদনশীলতা এই দেশের মরে যাওয়া বিবেকের আর অবশিষ্ট আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। অনশনের দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ওয়াংচুকের শরীর যখন একটু একটু করে নিস্তেজ হয়ে আসছে, রক্তচাপ যখন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, তখন আমাদের মতো স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক মানুষগুলোর নির্লিপ্ততা দেখে শিউরে উঠতে হয়। এই পঙ্গু সমাজের কাছে সোনমের বেঁচে থাকার লড়াইটাই আজ সবচেয়ে বড় চপেটাঘাত হওয়া উচিত।
আমাদের সোনমের দরকার নেই, আমাদের প্রয়োজন বাতেলাবাজ একদল নেতার। তাদের পদযুগল মাথায় তুলে নাচতে পারলেই আমরা নিজেদের ধন্য মনে করি। কিন্তু ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার, ওই পাহাড়গুলোর বড্ড প্রয়োজন ওয়াংচুককে। তাঁর মস্তিষ্ক, তাঁর অদম্য জীবনীশক্তি, এগুলো কেবল ভারতের নয়, গোটা পৃথিবীর অমূল্য সম্পদ। তিনি না থাকলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর, অধিকার নিয়ে কথা বলার আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। তিনি ফিরে যান তাঁর পাহাড়ে, বেঁচে থাকুন নিজের শর্তে- এই অসহায় প্রার্থনাই করছেন দেশের সংবেদনশীল সমস্ত মানুষ।
(লেখক সাংবাদিক)

