বিমল দেবনাথ
হাড় হিম করা শীত পড়লে তোমার দেখা পাই। আনন্দে ভরে ওঠে প্রাণ। তবুও কেন যে মন গেয়ে ওঠে, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না…’। ডুয়ার্স তো বটেই, গোটা রাজ্যের মানুষের নিশ্চয়ই এমনই হয়। কারণ সে যে মানুষকে সবুজ হয়ে ওঠার নিশ্চয়তা দেয়। সে বাস্তুতন্ত্রের শিখরীর শিখর, ভালোবাসার পাত্র। ভাবছেন, কে এই রূপবান বা রূপবতী, যার জন্য এমন আর্তি? সে আমাদের ব্যাঘ্র- বক্সা বাঘবনের ব্যাঘ্র। আমরা চাক্ষুষ দেখতে না পেলেও ক্যামেরায় ওঠা ছবি দেখে মুগ্ধ হই। আবার বিষণ্ণও হই- কেন সব সময় দেখতে পাই না ভেবে।
বক্সার ইতিহাস
বন্যপ্রাণ আইন (১৯৭২) প্রয়োগের পূর্বে বন্যপ্রাণীর প্রাচুর্য বোঝা যেত শিকারের তথ্য থেকে। মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ৩৭ বছরে ৩৬৫টি বাঘ শিকার করেছিলেন। বাঘ শিকার ছিল একটি রাজকীয় ব্যাপার। এই কারণেই ‘বেঙ্গল টাইগার’-কে ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’ বলা হত। পুরাতন ‘ভিজিটিং রেজিস্টার’এ মন্তব্য দেখেছি- পাঁচই মার্চ ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে বক্সার পানবাড়িতে মুখ্যসচিব বাঘ শিকার করেছেন যার মাপ, ৮ ফুট ৬ ইঞ্চি। বাঘের সংখ্যা অত্যন্ত কমে যাওয়াতে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইউনাইটেড প্রভিন্সের গভর্নর ম্যালকম হেইলির নামে প্রথম হেইলি জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়, যা ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে বন্যপ্রাণ সংরক্ষক জিম করবেটের নামে নামাঙ্কিত হয়। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২৬০টি বাঘ রয়েছে। বাঘবনের আয়তন ১৩৮১ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে, ৭৬০.৯৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে বক্সা টাইগার রিজার্ভ গঠিত হয় ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে। বর্তমানে এখানে বাঘের সংখ্যা মাত্র এক। এই কারণে আইন অনুযায়ী ব্যাঘ্র পুনঃস্থাপনের প্রকল্প মঞ্জুর করা হয়।
আগমন ও গমন
জাতীয় ব্যাঘ্র সংরক্ষণ সংস্থার রিপোর্ট বলছে, বক্সাতে বাঘ আছে। ভারতে বাঘ বিষয়ে কথা বলার দক্ষতা ও অধিকার শুধু এই সংস্থারই আছে। ইতিহাসও বলছে, এই বন প্রকৃত অর্থেই বাঘের বন। সে কারণেই বাঘ পুনঃস্থাপনের প্রকল্পের মঞ্জুরি পেয়েছে। তাছাড়া এক অঞ্চলের সঙ্গে আর এক অঞ্চলের বাঘের জিন প্রবাহের সুযোগও রয়েছে। কারণ বক্সার বন সংযুক্ত ভুটানের বনের সঙ্গে। ভুটানে বারোটি ‘প্রোটেক্টেড এরিয়া’ আছে। সবক’টি ‘বায়োলজিক্যাল করিডর’-এর মাধ্যমে যুক্ত। বক্সা টাইগার রিজার্ভ ভুটানের ‘ফিবসো’ অভয়ারণ্য এবং ‘ন্যাওড়াভ্যালি’ জাতীয় উদ্যান হয়ে ‘জিগমে খেসার স্ট্রিক্ট নেচার রিজার্ভ’-এর সঙ্গে যুক্ত। বনের ভেতরে আন্তর্জাতিক সীমানার একটি কাল্পনিক রেখা থাকলেও এইসব বন মিলিয়ে একটি অবিচ্ছিন্ন বনভূমি- একটি বাস্তুতন্ত্র। দুই দেশের বনভূমিই বাঘের ‘হোম রেঞ্জ’-এর অন্তর্গত। ভুটান ও অসমের মানস টাইগার রিজার্ভের সঙ্গে আন্তঃসীমানা বাঘ গণনা শুরু হয় ২০১০ খ্রিস্টাব্দ থেকে। বাঘ গণনা–২০২২ অনুযায়ী ভুটানে বাঘের সংখ্যা ১৩১। ভুটানের অন্যান্য ‘প্রোটেক্টেড এরিয়া’-তে মানুষের বসতি থাকলেও ‘ফিবসো’ অভয়ারণ্য ও ‘জিগমে খেসার স্ট্রিক্ট নেচার রিজার্ভ’-এ কোনও মানববসতি নেই। এই নির্জন অঞ্চল বাঘের নিরাপদ আশ্রয়। অপরদিকে জনচাপে বক্সা টাইগার রিজার্ভ বিপর্যস্ত। এই কারণেই কি শীতকালীন পর্যটনের পর বেশিরভাগ বাঘ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যায়? আমাদের লোভ-লালসার অত্যাচার কি তাদের সর্বক্ষণ তাড়া করে বেড়াচ্ছে? এই বিষয়ে কোনও গবেষণা হয়েছে কি না, জানা নেই।
বক্সার জনমিতি
তথ্য বলছে, বর্তমানে বক্সা বনভূমিতে মোট ৩৭টি বনবস্তি ও চারটি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট হোল্ডিং এলাকা রয়েছে, যার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮,৫০৩। বনসন্নিহিত গ্রাম রয়েছে ৪০টি, যার জনসংখ্যা প্রায় ১,৭৬,৪৭৩। বনঘেঁষা অবস্থায় রয়েছে ৪৯টি চা বাগান, যেখানে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১,২৯,০৭৫। এই বিপুল জনসংখ্যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য পালিত পশু। এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট, বক্সা টাইগার রিজার্ভ ভেতর ও বাইরে- উভয় দিক থেকেই তীব্র জৈবচাপে জর্জরিত। এই চাপ কমাতে বক্সায় জাতীয় ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের (NTCA) রিপোর্ট অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে ১৩টি গ্রাম ও ২টি এফডি হোল্ডিং এলাকা স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। জয়ন্তীর ডলোমাইট খনিগুলি ১৯৯৩ এবং ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে দুই দফায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বনবস্তি স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে। একটি বনবস্তি আংশিকভাবে স্থানান্তরিত হওয়ার পর নানা কারণে সেই প্রক্রিয়া আর গতি পায়নি। পরবর্তীতে ২০২৩–’২৪ খ্রিস্টাব্দে আবার স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় দুটি গ্রাম স্থানান্তরিত হয়। বাকি রয়েছে আরও ১৩টি গ্রাম। এখন আবার বন্ধ রয়েছে স্থানান্তরের কাজ।
প্রকল্পের দ্বন্দ্ব
বক্সা বাঘবন নিয়ে নানা সময়ে নানা প্রকল্পের কথা খবরের কাগজে ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পায়। বনের অভ্যন্তরে দুর্গম বনবস্তির সঙ্গে শহরের যোগাযোগের জন্য রাস্তা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গবাদিপশু পালন, মৎস্য চাষ ইত্যাদির প্রস্তাব আসে। আবার কখনও গাছের ঝরা পাতা থেকে জ্বালানি উৎপাদন কিংবা পুরোনো কমলা চাষ ফিরিয়ে আনার কথাও শোনা যায়। এতে কোনও অন্যায্য বিষয় নেই। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এগুলি ন্যূনতম প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে জায়গাটা নিয়ে। আমরা কি আগ্নেয়গিরির মাথায় বসতবাড়ি বানাতে পারি? আমাদের বুঝতে হবে- সংরক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন একসঙ্গে সম্ভব নয়। যখন এই বনাঞ্চলকে বাঘবন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তখনই সেখানে উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হয়েছে। সরকার প্রস্তাব আনার সময়ই চুক্তিবদ্ধভাবে স্পষ্ট করেছে- বাঘবনে প্রথম অগ্রাধিকার বাঘ সংরক্ষণ, তার পরে অন্যান্য বিষয়। সে কারণেই জাতীয় ব্যাঘ্র সংরক্ষণ সংস্থা বনবস্তি স্থানান্তরের কথা বলেছে এবং তার মঞ্জুরিও দিয়েছে। এখন সরকারের দায়িত্ব সেই কাজগুলি সম্পন্ন করা। তাতে শুধু বাঘ নয়, বর্তমান মানুষের এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনও সুনিশ্চিত হবে। তা না হলে যেভাবে নদীগুলি ধেয়ে আসছে, তাতে গ্রাস করবে শুধু বন ও বাঘ নয়- মানুষের ভবিষ্যৎও।
বন দপ্তরের প্রতি ক্ষোভ
জনসাধারণ সরকারকে দেখে ও চেনে সরকারি দপ্তরগুলির কার্যকলাপের মাধ্যমে। বক্সা ব্যাঘ্র পুনঃস্থাপনের বর্তমান অবস্থার কোনও তথ্য জনসাধারণের জন্য অন্তর্জালে পাওয়া যায় না। যারা এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে, তারাও কিছু জানতে পারে না। ফলে তারা প্রকল্পের পক্ষে সহনাগরিকদের বোঝানোর কাজটাও করতে পারে না। অন্যদিকে, বনবস্তির মানুষের সঠিক উন্নয়ন হচ্ছে না বলেও তারাও ক্ষুব্ধ। এক কথায়, বন দপ্তর সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে। বন দপ্তর তো এই সরকারেরই অংশ, তাই চাপটাও শেষপর্যন্ত সরকারের উপরেই পড়ে। এখন দেখার বিষয়- সরকার কী করবে? বাঘ রাখবে, নাকি তাড়াবে?
যা না বললেই নয়
এই বনকে যখন ব্যাঘ্র-প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তখন সরকারের সম্মান রক্ষার্থে তাকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা উচিত। সাধারণ প্রশাসন, বন দপ্তর ও নাগরিক সমাজকে সংঘবদ্ধভাবে সহনাগরিকদের কাছে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য স্পষ্ট করে বোঝাতে হবে এবং সম্মানের সঙ্গে স্থানান্তরে রাজি করাতে হবে। অবশ্যই তা করতে হবে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও নতুন স্থানে জীবিকানির্বাহের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করে। নচেৎ অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।
(লেখক প্রাক্তন বনাধিকারিক)
