বিপুল জনাদেশ নিয়ে কোনও রাজ্যে যখন সরকার গঠিত হয়, তখন ধরে নেওয়া হয় পরবর্তী অন্তত ছ’মাস সেই রাজ্যে সরকারবিরোধী ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা যাবে না। এই সময়কে সাধারণত মধুচন্দ্রিমা কাল বা ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বলা হয়ে থাকে। নাগরিকরা নতুন সরকারকে এই সময়টুকু দিতে চান যাতে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রশাসনিক আধিকারিকরা তাঁদের দায়দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার সময় পান।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই কিছু সংশয় এবং ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ক্ষোভের প্রসার এমন কিছু দ্রুতগতিতে বাড়ছে না যে, সরকারকে তার জন্য এই মুহূর্তে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠতে হবে। কিন্তু এই ক্ষোভের আঁচ বেড়ে ওঠার শঙ্কা গ্রাস করছে সকলকে। নির্বাচনের প্রাক্কালে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজেপি প্রচার চালিয়েছিল, তার মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল অন্নপূর্ণা যোজনা প্রকল্প।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পালটা প্রকল্প হিসাবে বিজেপি অন্নপূর্ণা যোজনা সকলের সামনে হাজির করেছিল। মহিলাদের সশক্তিকরণের উদ্দেশ্য নিয়ে এই প্রকল্পের মাধ্যমে মহিলাদের হাতে মাসে তিন হাজার টাকা করে তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিল বিজেপি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে যেখানে মাসে দেড় হাজার করে ভাতা দেওয়া হত, সেখানে এই প্রকল্পে সেই ভাতার পরিমাণ দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
স্বভাবতই মহিলাদের কাছে এই প্রকল্প অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। নির্বাচনোত্তরকালে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকবে বলে মহিলারা হাপিত্যেশ করে বসেছিলেন। অ্যাকাউন্টে অর্থের পরিবর্তে তাঁদের হাতে ধরানো হল ১৩ পাতার একটি ফর্ম। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। এই ফর্ম হাতে পাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের এখন সেই অবস্থা। অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম হাতে পেয়ে মহিলাদের অধিকাংশ এখন প্রকৃতই চোখের জল ঝরাচ্ছেন।
ফর্মের বিস্তারিত তথ্য পূরণ করতে মহিলাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হচ্ছে। ফর্মের বিষয়গুলি এতই জটিল যে, ফর্ম দেওয়া এবং তা মহিলাদের দিয়ে পূরণ করানোর কাজ করতে ফের বিএলওদের তলব করেছে সরকার। এমনকি নির্বাচিত বিধায়কদেরও নিজেদের এলাকায় ফর্ম হাতে ছুটতে হচ্ছে। ফর্ম নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্নও বিস্তর। এই ফর্মে শুধু উপভোক্তার সম্পর্কে তথ্য পূরণের কথা নেই, বরং দিতে হচ্ছে পরিবারের কর্তার অ্যাকাউন্ট নম্বর, জমির দলিল, বিমা সংক্রান্ত তথ্য ইত্যাদি।
এমনকি পরিবারের শিশুদের টিকাকরণের তথ্যও সন্নিবিষ্ট করতে হচ্ছে। উপভোক্তারা বুঝে উঠতে পারছেন না, অন্নপূর্ণা প্রকল্পের সুবিধা পেতে কেন এতসব তথ্য জানানো প্রয়োজন। বহু মহিলা এত তথ্য দিতে রাজি হচ্ছেন না, প্রয়োজনে তাঁরা এই প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণে রাজি নন। সরকারের বক্তব্য, আগের সরকারের আমলে বহু ভুয়ো উপভোক্তা সরকারের টাকা আত্মসাৎ করেছে, নতুন সরকার প্রকৃত প্রাপকদের অ্যাকাউন্টে এই প্রকল্পের টাকা দিতে চাইছে।
সরকারের বক্তব্য যুক্তিসম্মত ঠিকই কিন্তু। এই যুক্তিতে কান দিতে নারাজ দরিদ্র ও প্রান্তিক শ্রেণির মহিলারা। ফর্মের গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে তাঁদের মধ্যে সংশয় দানা বাঁধছে যে, অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা হয়তো শেষপর্যন্ত মিলবে না। সরকারও বুঝতে পারছে যে, মহিলাদের মধ্যে এই প্রকল্প নিয়ে সংশয় বাসা বাঁধছে। মহিলাদের সংশয় দূর করার জন্য সরকার ফর্মটির সরলীকরণের কথাও ভাবছে।
কিন্তু নতুন সরকার এই সত্যকথাটি বলে উঠতে পারছে না যে, ঋণগ্রস্ত রাজ্য সরকার ভাতার মতো অনুৎপাদক অর্থের বোঝা টানতে পারছে না। অন্যদিকে, কেন্দ্রের আর্থিক পরিস্থিতিও এমন নয় যে, তারা রাজ্যকে প্রভূত সহায়তা দিতে সম্মত হবে। সুতরাং ফর্মের জটিলতায় প্রকল্প থাকলেও প্রাপক সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা। রাজ্য সরকারের পক্ষে এই পরিস্থিতি যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক বৈকি।
