প্রতীক-সংকটে সিপিএম

প্রতীক-সংকটে সিপিএম

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চার বিষয় সবসময় আমজনতার মাথাব্যথার কারণ হয় না। দল থেকে সিপিএম নেতা প্রতীক উর রহমানের পদত্যাগের চিঠি তেমনই একটি বিষয়। যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার পাশাপাশি হইচই আছে সংবাদমাধ্যমে। অন্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে তৃণমূল এনিয়ে হইচই করছে। এতে ‘শূন্য পাওয়া’ দলটিও যে আলোচনার খোরাক- সিপিএমের সেই দাবিতে সিলমোহর পড়ছে। বাস্তবে এই ইস্তফায় সিপিএমের ক্ষতি আছে বৈকি।

তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে দেওয়ার কথা বলে সিপিএম গত কয়েক বছরে যে কর্মসূচির কথা বলে চলেছে, প্রতীকের ইস্তফা তাতে ধাক্কা দিয়েছে। সৈফুদ্দিন চৌধুরী না হয় দলবিরোধী লাইন নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ছিল। আব্দুর রেজ্জাক মোল্লা, মইনুল হাসানরা না হয় সরাসরি ঘাসফুল শিবিরে ভিড়েছিলেন। আব্দুস সাত্তার আবার কংগ্রেস হয়ে তৃণমূলে নাও ভিড়িয়েছেন। কিন্তু প্রতীক উর রহমানের বিরুদ্ধে এমন কোনও অভিযোগ নেই, যাকে হাতিয়ার করে তাঁকে তাচ্ছিল্য বা ঝেড়ে ফেলতে পারে সিপিএম।

অথচ তিনি সাদামাঠা ভাষায় সিপিএমের সদর দপ্তরে কার্যত কামান দেগেছেন। রাজ্য ও জেলা নেতৃত্বের বিভিন্ন অবস্থানের সঙ্গে যে তিনি একমত নন, তা তাঁর রাজ্য সম্পাদককে লেখা চিঠিতে স্পষ্ট। চিঠির ভাষায় এটাও স্পষ্ট, এই দ্বিমত নতুন নয়। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা চালিয়েছেন। সেই আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় শেষপর্যন্ত সিপিএম থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রতীক।

সিপিএম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সাংবাদিককুল জানান, দলের দৈনন্দিন কার্যকলাপ থেকে আরও আগেই তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু সিপিএম নেতৃত্ব তাঁর বক্তব্যকে মর্যাদা দেয়নি। সুস্থ আলোচনার পরিবেশও রাখেনি। আর্থিক, সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে সমাজের প্রান্তিক স্তরের প্রতিনিধি প্রতীকের মনোভাব স্পষ্ট হয়েছিল কয়েকদিন আগে, যখন তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেন, নীতিনৈতিকতা ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টি হয় না।

তাঁর এই অবস্থান সিপিএমের এখনকার তরুণ মুখ শতরূপ ঘোষের মনোভাবের ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত। শতরূপের বিশ্বাস, নৈতিকতার দায় একা সিপিএমের নয়। যা একধরনের দেউলিয়াপনার পরিচয়। বাম দলের নৈতিকতার দায় যদি না থাকে, তাহলে আর রইল কী! সিপিএমের কোনও নেতা শতরূপের সেই মন্তব্যের বিরোধিতা না করায় ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, দলের বর্তমান নেতৃত্ব একই মনোভাব পোষণ করে। এরপর সেই দল থেকে যে প্রতীক সরে যেতে চাইবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী!

সিপিএমের তৈরি তরুণ ব্রিগেডের সবাই কিন্তু শতরূপের সঙ্গে একমত নন। বরং মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, সৃজন ভট্টাচার্য, দীপ্সিতা ধররা যে প্রতীককে হারাতে চান না- তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট। ফলে শেষপর্যন্ত প্রতীককে দূরে সরে যেতে দিলে তা এই তরুণ ব্রিগেডকে হতোদ্যম করবে। যার ফল সুদূরপ্রসারী। নৈতিক অবক্ষয়ের যুগে প্রতীকের অবস্থানকে সিপিএম নেতৃত্ব মর্যাদা না দিলে দল বিরাট প্রশ্নের মুখে পড়বে।

মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদক পদে থাকলেও প্রতীককে দূরে ঠেলে দিলে বাঙালি মুসলমানদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। অতীত থেকে শুরু করে সিপিএমে অনেক মুসলমান নেতা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। সেখানে শ্রমিক পরিবার থেকে উঠে আসা মহম্মদ ইসমাইলের মতো অনেক নেতাও ছিলেন। প্রান্তিক এই ধর্মীয় পরিচিতির মানুষদের প্রতি দলের উপেক্ষার অভিযোগ আগেও তুলেছিলেন মইনুল হাসানরা।

প্রতীক শেষপর্যন্ত দূরে সরে গেলে সেই উপেক্ষার অভিযোগ আরও জোরালো হবে। প্রতীক অন্য কোনও দলে যাওয়ার জন্য ইস্তফা দিলেন কি না- তা নিয়ে অন্তত এই মুহূর্তে আলোচনা নিরর্থক। তিনি কিন্তু ইস্তফাপত্রটি নিজে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেননি। ব্যাপারটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়া বলে প্রকাশ্যে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মন্তব্যও করেননি। প্রতীক সিপিএমের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের বৃহৎ অংশের কাছে আশা-আকাঙ্ক্ষার ‘প্রতীক’। প্রতীক এখন তাই সিপিএমের বড় সংকট বৈকি।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *