প্রকৃতি–চিন্তার অদৃশ্য এক নায়ক  

প্রকৃতি–চিন্তার অদৃশ্য এক নায়ক  

ব্লগ/BLOG
Spread the love


 

  • সেবন্তী ঘোষ

আমরা কি কাঁচাবাদাম কাকুকে চিনি? অবশ্যই। ক’দিন আগেই আশা-লতা কণ্ঠী এক দরিদ্র গায়িকাকে নিয়ে মেতে উঠিনি আমরা? ঝাঁপিয়ে পড়েছি বলা যায়। তাঁর স্বাভাবিক মুখখানাকে চড়া মেকআপে রংচঙে করে মহা তামাশায় মেতে উঠেছি। আমরা মোহিনীআট্যম থেকে মহাকাশ বিজ্ঞানীর স্তুতি করেছি। হালেই দেখুন, ট্রাম্পের নাচনকোদন, মুখভঙ্গি থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের নাম খোকাখুকুও জানে। মানবাধিকার থেকে পরিবেশ রক্ষায় সেমিনার চলছে নিত্য। যিনি নিজের  বাড়ির চত্বর কংক্রিটে মুড়ে দিয়েছেন, তিনিই বৃক্ষরোপণের উপযোগিতা বিষয়ে জ্ঞান বিতরণ করছেন। পাশের গলিতেও যেতে গেলে যাঁর গাড়ি লাগে, তিনিই কার্বন নিঃসরণ নিয়ে প্রবল চিন্তিত। নদী দখলের বখরা পকেটে ঢুকেছে যার, তিনি নদী বাঁচাও কমিটির প্রধান।

এক নীরব যোদ্ধার কাহিনী

এহেন পরিস্থিতিতে প্রকৃতি পরিবেশ সচেতনতার প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব মাধব গ্যাডগিলের কথা আর কেই বা জানতে, শুনতে চাইবে? মাজুলি এলাকার যাদব পায়েঙের নির্মিত অরণ্যে আগুন ছড়িয়ে দিলে কার কী যায় আসে? ফেলে আসা বছর শেষে বাঘ রক্ষায় অগ্রণীপুরুষ বল্মীক থাপারের অকাল প্রয়াণের পর লেখা হয়, উনি শশীকাপুরের জামাই! এই যে গৌরচন্দ্রিকা, এ আমাদের পরিবেশ ভাবনা বিষয়ে এক সাধারণ চিত্র। মুশকিল এই, পরিবেশ-প্রকৃতি, অরণ্য, নদী নিয়ে কথা বলার অধিকার বর্তেছে শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞদের ওপর। অর্থাৎ যাঁরা এ বিষয়ে সচেতন এবং খুব ভালোমতো খোঁজখবর রাখেন, সেই একটি বিশেষ দলের মধ্যেই মতবিনিময় হয়ে চলেছে। যেন শৈশব থেকে বাড়িতে এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষা দেওয়া নয়, পরিবেশ রক্ষাটি শিশুপাঠ্য পুস্তকের বিষয় এবং কিছু পরিবেশকর্মীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বাদবাকি সাধারণ মানুষ প্রকৃতপক্ষে এ নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন। বিনোদন মানেই এখন চড়া মাপের কড়া দাগের ওষুধ। যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আত্মঘাতের সমান। যাঁরা গাছপালা ভালোবাসেন, শিশুকে শেখান গাছের ফুল, পাতা না ছিঁড়তে, নদীর ভেতর আবর্জনা ফেলার কথা স্বপ্নেও ভাবেন না, অরণ্যের ভেতরের জমি জবরদখল করেন না, এমন সাধারণ মানুষের কাছে মাধব গ্যাডগিলেরা পৌঁছান না। কারণ জনসচেতনতার জন্যে তো জলসার ফুর্তি অগ্রাহ্য করা যায় না! আমাদের শৈশবে পাড়ার মাঠে কাপড় টাঙিয়ে পথের পাঁচালি দেখানো হত। এখন সে পথও নেই, পাঁচালি সংকীর্ণ ধর্ম উন্মাদনায় মিশে গেছে।

উল্লেখযোগ্য অবদান

সদ্য প্রয়াত মাধব গ্যাডগিল ভারতের অন্যতম প্রখ্যাত পরিবেশবিদ, বাস্তুতত্ত্ববিদ ও চিন্তাবিদ ছিলেন। তাঁর গ্যাডগিল রিপোর্ট- পশ্চিমঘাট পর্বতমালার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিয়ে জাতীয় স্তরে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বিজ্ঞান, পরিবেশ ও সমাজ— এই তিনটির সেতুবন্ধন ঘটানোর ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাধব গ্যাডগিলের জন্ম ১৯৪২ সালে মহারাষ্ট্রে। তিনি মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন এবং পরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাস্তুতত্ত্বে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। দীর্ঘদিন তিনি ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে যুক্ত ছিলেন এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স, বেঙ্গালুরু-তে অধ্যাপনা করেছেন। পাশাপাশি তিনি সেন্টার ফর ইকোলজিকাল সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গ্যাডগিল মনে করতেন, পরিবেশ সংরক্ষণ কেবল বৈজ্ঞানিক বা প্রশাসনিক বিষয় নয়— এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও জীবিকা গভীরভাবে যুক্ত। তাই ‘টপ-ডাউন’ নীতির বদলে তিনি ‘বটম-আপ’ বা জনগণকেন্দ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনার পক্ষে সওয়াল করেছেন। ২০১১ সালে প্রকাশিত পশ্চিমঘাট পরিবেশ বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন, যা সাধারণভাবে ‘গ্যাডগিল রিপোর্ট’ নামে পরিচিত, তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই রিপোর্টে পশ্চিমঘাট অঞ্চলকে বিভিন্ন পরিবেশগত সংবেদনশীল জোনে ভাগ করে খনন, বড় বাঁধ, ভারী শিল্প ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। রিপোর্টটি পরিবেশবিদদের প্রশংসা পেলেও শিল্পমহল ও কিছু রাজ্য সরকারের প্রবল আপত্তির মুখে পড়ে। মাধব গ্যাডগিল শুধু একজন বিজ্ঞানী নন, তিনি একজন চিন্তাশীল সমাজমনস্ক বুদ্ধিজীবী। তাঁর লেখালেখি ও বক্তৃতায় বারবার উঠে এসেছে পরিবেশগত ন্যায়, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ববোধের কথা। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের পথেই মানুষের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব।

কেন গুরত্বপূর্ণ শৈশবের শিক্ষা?

কেন শৈশব থেকে শিক্ষা দেওয়ার কথা প্রথমেই তোলা হয়েছে তা মাধব গ্যাডগিলের আত্মজীবনী থেকে ধরা যেতে পারে, তাঁর বাবা ছিলেন পক্ষীবিশারদ সালিম আলির বন্ধু। বাবা দূরবিন নিয়ে বাড়ির সামনে পাহাড়ে হাঁটতে নিয়ে যেতেন। সেখানে মাঠ, চড়াই, বুলবুল, ছাতারে প্রভৃতি নানা পাখির সঙ্গে পরিচয় করাতেন। বাড়িতে ছিল ইংরেজি ভাষার দু’হাজার, মারাঠি ভাষায় এক হাজারের কাছাকাছি বই। পাশের বাড়ির প্রতিবেশী ছিলেন খ্যাতনামা ইরাবতী কার্ভে। যিনি ধর্মীয় শ্রেণিগত সর্বপ্রকার কুসংস্কারমুক্ত এক বিশিষ্ট নৃতত্ত্ববিদ ও সমাজবিজ্ঞানী। উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য যে সমস্ত সম্প্রদায় বাস্তুচ্যুত হয় তাদের উপর বিভিন্ন সমীক্ষার কাজ করতেন এবং ভারতে তিনি ছিলেন এই বিষয়ে একজন পথপ্রদর্শক। তাঁর ভাইয়েরা বাবার সঙ্গে সঙ্গে থেকে এই সম্পদ লাভ করেছিল কিন্তু তিনিই বাবার প্রদর্শিত পথে চলতে পেরেছিলেন। ফলে যে সৌভাগ্য তিনি জন্মসূত্রে অর্জন করেছেন, তা পেলেই যে একজন মাধব গ্যাডগিল হওয়া যায় তা কিন্তু নয়। ভালোবাসা থাকলে এবং সেই ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে যে কোনও মানুষ এতদূর না হলেও প্রকৃতি বিষয়ে খানিক অন্তত সচেতন হতে পারে।

ক্ষমতার সঙ্গে লাগাতার যুদ্ধ

তাঁর আত্মজীবনটির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে ক্ষমতার সঙ্গে লাগাতার যুদ্ধ। বইটিতে অরণ্য, অরণ্যপ্রাণের প্রতি নিবেদিত এক আশ্চর্য তেজোদীপ্ত জীবন উদ্ভাসিত হয়ে আছে। কত সব অজানা, অচেনা গবেষকদের কথা উঠে এসেছে। একটি বিশেষ সেমিনারে যাঁরা জমায়েত হচ্ছেন তাঁদের গবেষণার কাজ বহু বিচিত্র জীবজন্তু নিয়ে। অনিল মহাবল শালিকদের কার্যকলাপ এবং রাতের বিশ্রামের জন্য জমায়েতের আচরণ, যোধপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের  সুরেশ শ্রী মাকওয়ানা হনুমান নিয়ে, তামিলনাডুর কে ওসমান পতঙ্গভুক বাদুড়ের ওপর, টি স্যামুয়েল শিয়ালের আচরণ ও ইকোলজি নিয়ে, এম জয়রাজন পেরিয়ার হর্নবিল সমীক্ষা, প্রসাদ বাঁশের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা, নায়ার হাতির বাস্তুবিদ্যা এবং আচরণ, শরৎচন্দ্র চিতল হরিণ, এসএইচএস হুসেইনি কৃষ্ণসার হরিণ, বনবিড়াল এবং আমাদের ঘরের কাছের শিলিগুড়ির সত্যজিৎ মজুমদার কাজিরাঙ্গা, জলদাপাড়ার অভয়ারণ্যে গন্ডার নিয়ে গবেষণার কাজ করছেন।

নতুন এক আশার কথা

এই যে এত রকম কাজ আমাদের দেশেই হচ্ছে, নেচার পত্রিকা থেকে পড়তে হচ্ছে না, এ  আমার মতো সাধারণ মানুষের জানাই হত না, যদি না মাধব গ্যাডগিলের বইটি পড়া হত। তাঁর লেখাতেই plantix অ্যাপের কথা জানলাম যার ১৩ মিলিয়ন ব্যবহারকারীর মধ্যে বেশিরভাগই ভারতীয় এবং দশটি ভারতীয় ভাষায় পাওয়া যায়। এটি কৃষিজীবী বা বাগানের মালিদের জন্য তৈরি একটি অ্যাপ যা কৃষি সংক্রান্ত যে কোনও বিষয়ে পরামর্শ দিতে সক্ষম এবং এর জন্য কোনও টাকা দিতে হয় না। বার্লিনের এক স্টার্টআপ সংস্থা এটি তৈরি করে। কোনও ফসল বা তার ওপর আক্রমণকারী ক্ষতিকারক পোকামাকড় বা ফসলের রোগের ছবি পাঠালে সঙ্গে সঙ্গে সেই সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ব্যবহারকারীদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। কীটপতঙ্গের দ্বারা ফসলের ক্ষতি, গাছের রোগ ফসলের প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি এবং তার প্রতিবিধান সবকিছুই এখানে আলোচনা করা হয়।

এমন টুকরো টুকরো অংশ তুলে দিলেও মাধব গ্যাডগিলের বিষয়ে বা তাঁর কাজ বিষয়ে সামগ্রিকভাবে জানা সম্ভব নয়। আমরা অবশ্য সদ্য প্রয়াত বর্ষীয়ান অভিনেতার দুটি বিয়ে, চারটি সন্তান এবং তিনি বাল্যকালে কোন মক্কি কা রোটি খেয়েছেন তা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি এবং মুখস্থ রাখি। ভাবতে গেলে এর পুরোটাই আমাদের পক্ষে অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে পড়ে থাকলেও অবহেলায় সরিয়ে রাখি আমরা। মানুষ যে এক আত্মঘাতী প্রাণী, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই।

(তথ্যসূত্র : চড়াই পথের চারণিক, আমার ইকোলজি জীবন। মাধব গ্যাডগিল। অনুবাদ : শীলাঞ্জন ভট্টাচার্য)

(লেখক সাহিত্যিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *