নন্দীগ্রামের লড়াই থেকে ব্রিগেডের মঞ্চ, এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত পেল চূড়ান্ত রূপ।
জয়ন্ত চৌধুরী
কাট ওয়ান : মমতা-শুভেন্দু, শুভেন্দু-মমতা। আমাদের মতো রাজনৈতিক সাংবাদিকদের ডায়েরিতে ২০০৭ সাল থেকেই এই দুটো নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল। নন্দীগ্রামে সে বছর ১৪ মার্চ পুলিশের সেই মর্মান্তিক গুলিচালনার ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। শুভেন্দু অধিকারীর চষে রাখা উর্বর রাজনৈতিক জমিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পা রাখা ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু মজার বিষয় হল, মমতা তখন তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর তৈরি করা নিশ্ছিদ্র দুর্গে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরাতে পারেননি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রশাসনিক ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরেও নন্দীগ্রাম মমতার কাছে এক অমীমাংসিত দুঃস্বপ্ন হয়েই রয়ে গিয়েছিল, যার একক রূপকার ছিলেন স্বয়ং শুভেন্দু অধিকারী।
কাট টু : ২০০৮ সালের ১৪ মার্চ। রাজ্যে তখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। ‘শহিদ দিবস’ উপলক্ষ্যে কলকাতা থেকে আমরা নন্দীগ্রামের পথে রওনা হয়েছি। সামনে মমতার কনভয়, আর আমাদের গাড়িতে তখন সঙ্গী হিসেবে রয়েছেন সম্বিৎ পাল, রবিশংকর দত্ত, প্রসেনজিৎ বক্সী আর বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য। কোলাঘাট ছাড়িয়ে এগোতেই রাস্তার ধারের দৃশ্যপট আমাদের গাড়ির গতির চেয়েও দ্রুতলয়ে পালটে যাচ্ছিল। লাল ঝান্ডা কার্যত অদৃশ্য, চারদিকে শুধুই তৃণমূলের তেরঙা পতাকার দাপট। নন্দকুমারের কাছে চায়ের বিরতি নিতে গিয়ে যা দেখলাম, তা আমাদের স্তম্ভিত করে দিল। এলাকাজুড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগমন উপলক্ষ্যে অজস্র তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সব ছাপিয়ে চোখে পড়ছিল বিশাল সব ফ্লেক্স আর কাট-আউট। সেখানে মমতার ছবি ছোট, আর শুভেন্দুর ছবি বিশাল।
দেখে মনে হচ্ছিল, ওই পুরো আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মমতা যেন এক গৌণ চরিত্র। তৃণমূল কংগ্রেসের তৎকালীন ‘পোস্টার কালচার’-এর নিরিখে এটি ছিল অত্যন্ত বিসদৃশ এবং এক বড়সড়ো বিতর্কের স্পষ্ট উসকানি। যত নন্দীগ্রামের দিকে আমরা এগোচ্ছিলাম, চারপাশ ততই ‘শুভেন্দুময়’ হয়ে উঠছিল। কৃষিজমি রক্ষার লড়াইয়ের মুখ হিসেবে শুভেন্দু তখন দলের অন্দরে এক অপ্রতিরোধ্য সমীহ আদায় করে নিয়েছেন। নিজের জমি নেত্রীকে সাময়িকভাবে ব্যবহার করতে দিলেও, তার প্রকৃত হকদার যে তিনিই— ওই কাট-আউটগুলোর প্রতিস্পর্ধাই যেন তা নিঃশব্দে ঘোষণা করছিল। যা তৃণমূলের সেই আমলেও ছিল সাধারণের কল্পনার অতীত। গাড়িতে যেতে যেতেই আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, এই ছেলেটি আর পাঁচটা তৃণমূল নেতার মতো নয়; একে বেশিদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা দলের জন্য কঠিন হবে।
শুভেন্দুর রাজনীতির ধরন ছিল আগাগোড়াই আলাদা। তিনি নিজেকে একটা রহস্যময় খোলসে আবৃত রেখে চলতেন। মমতার সামনে অন্য নেতাদের মতো হাত কচলাতে তাঁকে দেখা যেত না। তিনি মমতাকে ‘জনগণমন নায়িকা’ বলে সম্বোধন করতেন ঠিকই, কিন্তু তার প্রতিটি অক্ষর ছিল অত্যন্ত হিসেব কষা। মমতাও তাঁর প্রিয় ‘শিশির দা’-র (শিশির অধিকারী) ছেলেকে যথেষ্ট জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন। বলা ভালো, শুভেন্দু সেই জায়গাটা নিজেই আদায় করে নিয়েছিলেন। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের নায়ক হিসেবে তখন তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। সেই স্বীকৃতির পুরস্কার হিসেবে মমতা তাঁকে দলের যুব শাখার সভাপতি পদে বসালেন। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মমতা খুব দ্রুতই অনুভব করেছিলেন যে, তৃণমূলের সংগঠনে তাঁর বিকল্প একটি শক্তিশালী ‘পাওয়ার সেন্টার’ হওয়ার সমস্ত মশলা এই মেদিনীপুরী তরুণের মধ্যে মজুত আছে। সেই সময় মমতার তিন প্রধান সেনাপতি মুকুল রায়, পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং সুব্রত বক্সী শুভেন্দুর এই ‘স্কাই রকেট’ গতির উত্থানে বিন্দুমাত্র স্বস্তিতে ছিলেন না।
শুভেন্দুর সেই মেদিনীপুরি লবজ আজও কানে বাজে, যা তিনি দু’দশক আগে বিধানসভার লবিতে বসে বলেছিলেন— ‘আরে দাদা, আপনাদের কলকাতার নেতারা সব ক্যাকরার (কাঁকড়া) জাত। যতই এগোতে যাবেন, ততই পিছন থেকে টেনে ধরবে। তাই আমি কলকাতায় গেলেও তৃণমূল ভবন এড়িয়ে চলি। আর কালীঘাটে নেত্রী না ডাকলে তো যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’ মুকুল-পার্থ-বক্সীদের মধ্যে পারস্পরিক রেষারেষি থাকলেও, শুভেন্দুকে আটকে রাখার প্রশ্নে তাঁরা ছিলেন এককাট্টা। কারণ তাঁরা জানতেন, এ ব্যাপারে স্বয়ং নেত্রীর মনেও এক গভীর অনিশ্চয়তা দানা বাঁধছে এবং তিনি তাঁর ‘বিকল্প’ হিসেবে কাউকেই বাড়তে দিতে নারাজ।
২০১১ সালের সেই পরিবর্তনের ভোটে শুভেন্দু ছিলেন তৃণমূল যুবর প্রধান মুখ। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি তখন মধ্যাহ্নের বিগ্রহ। কিন্তু এই উত্তরণের নেপথ্যে ছিল অনেক জটিল কৌশল। জঙ্গলমহলে সিপিএমকে উৎখাত করতে মাওবাদীদের সঙ্গে লজিস্টিক ও অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে শুভেন্দুই ছিলেন মমতার প্রধান যোগসূত্র। কিষেনজির সেই বিখ্যাত ঘোষণা যে, তিনি মমতাকে মুখ্যমন্ত্রী দেখতে চান— তার নেপথ্য কারিগরও ছিলেন শুভেন্দু। কিন্তু এই আপাত সখ্যর মধ্যেই উপ্ত ছিল পারস্পরিক বিরোধের বিষবীজ। তৃণমূলে শুভেন্দুর অভাবনীয় ক্যারিশমা যত বাড়ছিল, ততই মমতার অন্দরে আশঙ্কার পারদ চড়ছিল।
প্রথম বড় ধাক্কাটি এল ২০১১ সালের ২১ জুলাই বিগ্রেডের শহিদ সমাবেশে। প্রথা অনুযায়ী তৃণমূল যুব সভাপতির মঞ্চ নিয়ন্ত্রণের কথা থাকলেও, মমতা দায়িত্ব দিলেন ‘বহিরাগত’ কুণাল ঘোষকে। সেই মঞ্চ থেকেই জন্ম নিল ‘তৃণমূল যুবা’, যার শীর্ষপদে বসানো হল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মমতা বলতেন দলই তাঁর পরিবার, কিন্তু সেদিন দেখা গেল পরিবারকেই তিনি দলে রূপান্তরিত করলেন। শুভেন্দুর কাছে বার্তা ছিল পরিষ্কার— দলের সংবিধান স্বীকৃত যুব সংগঠন থাকা সত্ত্বেও ভাইপোর জন্য আলাদা সংগঠন তৈরির গূঢ় অর্থ তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন। শুভেন্দু দেওয়াল লিখন পড়তে ভুল করেননি, তবে তিনি সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করলেন।
মমতা তাঁকে পরিবহণমন্ত্রী থেকে শুরু করে একাধিক জেলার কোঅর্ডিনেটর করে মূলস্রোতে বাঁধতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শুভেন্দুর নজর ছিল আরও দূরে। শুভেন্দুকে সরাতে মমতা প্রথমে সৌমিত্র খাঁকে যুব সভাপতি করেন একটি ‘স্টপ গ্যাপ’ ব্যবস্থা হিসেবে। পরে ‘যুবা’ আর ‘যুব’ মিশিয়ে দিয়ে অভিষেকের হাতে সরাসরি ব্যাটন তুলে দেওয়া হয়। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ধাক্কা খাওয়ার পর প্রশান্ত কিশোরের আইপ্যাকের প্রবেশ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। অভিষেকের পরামর্শে মমতা জেলাভিত্তিক পর্যবেক্ষক ব্যবস্থা তুলে দিলেন। শুভেন্দু ছিলেন জঙ্গলমহল, উত্তর দিনাজপুর, মালদা এবং মুর্শিদাবাদের পর্যবেক্ষক। সেই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া ছিল অভিষেকের মোক্ষম চাল। উদ্দেশ্য ছিল একটাই— শুভেন্দুর ডানা ছেঁটে তাঁকে কেবল নিজের জেলায় কোণঠাসা করা। অভিষেকের অভিযোগ ছিল, শুভেন্দু নিজের অনুগামীদের বিধায়ক করে সরকারকে বিপাকে ফেলার ছক কষছিলেন।
সারদা-নারদ কেলেঙ্কারির কালি তাঁর গায়েও লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু লক্ষ্য থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। কংগ্রেস, তৃণমূল হয়ে বিজেপিতে গিয়েও তাঁকে লড়তে হয়েছে প্রতিনিয়ত। কট্টর হিন্দুত্ববাদী ইমেজ তৈরি করতে গিয়ে তিনি অনেক সময় বিতর্কিত পথে হেঁটেছেন, কিন্তু আজ ভবানীপুরের সেই বিধায়কই বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী। এই দীর্ঘ কণ্টকিত পথ পার করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি কেবল একজন দক্ষ সংগঠক নন, বরং একজন পোড়খাওয়া রাজনৈতিক যোদ্ধা।
প্রায় দুই দশক আগে আমাদের চোখের সামনে যে মমতা-শুভেন্দু উপাখ্যান শুরু হয়েছিল, আজ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে তা এক ঐতিহাসিক পরিণতি পেল। ২০১১ সালের যে ব্রিগেড তাঁকে তৃণমূলের মূলস্রোত থেকে ছিটকে দিয়েছিল, ২০২৬-এর সেই একই ব্রিগেড সাক্ষী থাকল এক নতুন প্রশাসনিক সত্যের— যেখানে শুভেন্দু মমতাকে ভোটের ময়দানে পরাজিত করে মসনদ দখল করেছেন। এক সময় যে নেত্রীর ছায়াসঙ্গী ছিলেন, আজ তাঁরই ছায়া মাড়িয়ে শুভেন্দু পা রাখলেন নবান্নে। মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সির সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসও এখন শুভেন্দুর দখলে। একজন নেতার উত্থান আর একজন নেত্রীর প্রাসঙ্গিকতা রক্ষার এই লড়াইয়ে আপাতত শেষ হাসি হাসলেন মেদিনীপুরের ভূমিপুত্রই।
(লেখক সাংবাদিক)
