পরিবর্তনের বঙ্গে সাজা শুধু গরিবের

পরিবর্তনের বঙ্গে সাজা শুধু গরিবের

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


 

  • তাপস রঞ্জন গিরি

প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী, শাসকদলের একসময়ের ‘হেভিওয়েট’ নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায় সগৌরবে জামিনে মুক্ত হয়ে শোভাযাত্রা করে ঘরে ফিরলেন। তাঁর বিরুদ্ধে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ— লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে শিক্ষকতার চাকরি বিক্রির অভিযোগ, যা হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থীর স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। অথচ, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর সেই অভিযুক্ত আজ বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ দৃশ্য দেখছে আমবাঙালি, আর প্রশ্ন উঠছে— তবে সাজা কারা পাবে?

২০১১ সালে যখন দীর্ঘ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের পতন ঘটেছিল, তখন বাংলার মানুষ হাঁফ ছেড়েছিল। নতুনের প্রতি এক তীব্র প্রত্যাশা, পরিবর্তনের এক অপার আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছিল আপামর জনতার মধ্যে। সেই পরিবর্তন এনেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। মানুষ ভেবেছিল, এবার সুশাসন আসবে, রাজ্যের অন্ধকার ঘুচবে। কিন্তু কী দেখল বাঙালি? গত ১৪ বছরে দুর্নীতি যেন আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিল! সারদা, নারদ থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, গোরু পাচার, কয়লা পাচার— তালিকা যেন অন্তহীন।

পার্থর আস্ফালনে বিপাকে তৃণমূল 

জামিনে মুক্ত পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের আস্ফালন যেন সেই চরম রাজনৈতিক ঔদ্ধত্যের প্রতিচ্ছবি। তিনি বলছেন, অন্য কেউ দুটো বিয়ে করে দলে থাকতে পারলে, স্ত্রীর অবর্তমানে বান্ধবী থাকলে তাঁর দোষ কোথায়? তিনি সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন শোভন চট্টোপাধ্যায় ও বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্কের দিকে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্যের মূল সুরটি হল— শাসকদলে নৈতিকতার মাপকাঠি সকলের জন্য এক নয়, এবং ব্যক্তিগত জীবন এখানে বড় বিষয় নয়, যদি দলীয় আনুগত্য বজায় থাকে। শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি ঘুরিয়ে টলিউডের দিকেও আঙুল তুলেছেন। তৃণমূলের ছত্রছায়ায় টলিউডের অনেক তারকা যুক্ত হয়েছেন, যাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমীকরণ বা একাধিক সম্পর্ক নিয়ে জনসমক্ষে নানা জল্পনা রয়েছে। পার্থর বক্তব্য সেই দিকেও ইঙ্গিত করছে যে, দলের ভেতরে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বজায় থাকলে এই ধরনের ‘অনৈতিকতা’ বা ‘ব্যক্তিগত বিচ্যুতি’ সহজেই ‘ছাড়’ পেয়ে যায়।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং ভয়ংকর কথাটি হল— তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইলেন, দলে এমন দৃষ্টান্ত আরও আছে এবং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসব কিছু খুব ভালো করেই জানেন, এমনকি প্রশ্রয়ও দেন। একজন প্রাক্তন মন্ত্রী এবং দলের প্রভাবশালী সদস্যের মুখ থেকে যখন এমন কথা বেরোয়, তখন তা শুধু ব্যক্তি আক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সরাসরি দলনেত্রীর নৈতিকতা এবং দলের ভেতরের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এর ফলে কার্যত দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকেই দুর্নীতির এই নীরব প্রশ্রয় দেওয়ার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হল। পার্থ কি তবে আগামী নির্বাচনের আগে হাটে হাঁড়ি ভাঙার পথে হাঁটছেন এবং দলের আরও ভেতরের গোপন কথা ফাঁস করবেন নাকি তাঁর পূর্বসূরিদের মতো তাঁকেও মুখ বন্ধ রাখার শর্তে দলে সসম্মানে ফেরত নেওয়া হবে?

কেন ব্যর্থ হল কেন্দ্রীয় এজেন্সি?

পার্থর জামিনের পর সবথেকে বড় ব্যর্থতার তির গিয়ে লাগছে সিবিআই এবং ইডি-র মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির দিকে। এত বড় একটি দুর্নীতি, যার সঙ্গে জড়িত বিপুল পরিমাণ অর্থ ও রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, সেখানে কেন তারা একটি ‘ওপেন অ্যান্ড শাট কেস’ দাঁড় করাতে পারল না? বছরের পর বছর ধরে তদন্ত চলছে, এত সুযোগ থাকার পরও অভিযুক্ত জামিন পেয়ে বুক ফুলিয়ে বাড়ি ফিরছেন। এর অর্থ কি এই নয় যে, তদন্তের প্রক্রিয়া দুর্বল ছিল, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে মামলা দুর্বল করা হয়েছে?

এতেই সামনে আসে রাজ্যের রাজনীতিতে বহুলচর্চিত ‘সেটিং তত্ত্ব’। তৃণমূল এবং কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি-র মধ্যে কি কোনও অলিখিত বোঝাপড়া রয়েছে? মানুষ জানে, এ ধরনের হাই প্রোফাইল কেসে একবার জামিন পাওয়া মানে কার্যত বেকসুর খালাস পাওয়ার মতো। জেলে থাকার সময়ও পার্থ চট্টোপাধ্যায় বা তাঁর পূর্বসূরিরা— সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, মদন মিত্র, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক— কেউই সাধারণ কয়েদির মতো জীবন কাটাননি। অধিকাংশ সময় তাঁরা বেসরকারি হাসপাতালের বিলাসবহুল কেবিনে ‘হলিডে হোম’-এর মতো থেকেছেন। এর থেকে কী বার্তা যায় সাধারণ মানুষের কাছে? যে ক্ষমতা এবং টাকা থাকলে, দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থাকেও সহজেই ‘ম্যানেজ’ করা যায়।

পরিবর্তনের প্রত্যাশা : কেন ব্যর্থ তৃণমূল বিজেপি?

বামফ্রন্টের দীর্ঘদিনের শাসনের অবসানের পর জনগণ যে পরিবর্তন চেয়েছিল, তা আজও অধরা। তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার আস্ফালন মানুষকে হতাশ করেছে। ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর সরকার স্লোগান তুলে ক্ষমতায় এলেও, তাদের আমলে তৃণমূলের কর্মীরা যেভাবে নিজেদের ‘সিন্ডিকেট’ এবং ‘তোলাবাজি’র মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছেন, তাতে বাম জমানার শেষের দিকের অব্যবস্থা আরও প্রকট হয়েছে। তৃণমূলের শাসনের মূল ব্যর্থতা হল— রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনও কাজ হয় না, এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করা।

অন্যদিকে, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দলের স্থান দখল করেও সেই প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ। তৃণমূলের দুর্নীতিকে অস্ত্র করে তারা রাজ্যে নিজেদের জমি তৈরি করতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যেও বিভিন্ন স্তরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় কথা, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি যখন শাসকদলের দুর্নীতিকে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন ‘সেটিং তত্ত্ব’ আরও মজবুত হয়। মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, তৃণমূলকে দুর্বল করার আন্তরিক ইচ্ছা কি বিজেপির আছে? নাকি তাদের কাছে দুর্নীতি কেবলই একটি রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার?

বিচার ব্যবস্থার উপর চাপ আস্থার সংকট

পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের জামিনের ঘটনা ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। সবাই জানেন, সমাজে যাঁদের প্রতিপত্তি আছে, অর্থের জোর আছে, তাঁরা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে ঠিকই পার পেয়ে যাবেন। সাজা হবে শুধু সেই গরিব এবং ক্ষমতাহীন মানুষের, যাঁদের পক্ষে ভালো আইনজীবী দেওয়া সম্ভব নয়। এই ধরনের ঘটনা বারবার প্রমাণ করে দেয় যে, ভারতের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা ‘প্রভাবশালী’দের জন্য একরকম, আর ‘সাধারণ’দের জন্য অন্যরকম। যখন তদন্তকারী সংস্থাগুলো দুর্বলভাবে কেস সাজায় বা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়, তখন আদালতের পক্ষে জামিন না দিয়ে উপায় থাকে না। কিন্তু এই দুর্বলতার চরম মূল্য দিতে হয় সেই ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার তরুণ-তরুণীদের, যাঁদের চাকরি চুরি হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া এনেছিল যে দল, আজ তারা নিজেরাই দুর্নীতির অন্ধকারে ডুবে। আর যে দল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি হল, তারা দুর্নীতিকে রুখতে দৃশ্যত ব্যর্থ। এই ব্যর্থতার সাজা কি শুধু দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের জামিনে মুক্তি দিয়ে শেষ হয়ে যাবে? না। এই সাজা পাবে সেই আমবাঙালি, যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই যুবসমাজ, যাদের ভবিষ্যৎ চুরি হয়ে গেল। আর সেই বিচার ব্যবস্থা, যার প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমাগত ক্ষয় হচ্ছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে আজ গণতন্ত্রের আসল সাজাপ্রাপ্ত হল সাধারণ মানুষ।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *