নোবেলে সম্মানিত সভ্যতার ক্ষতের আখ্যান

নোবেলে সম্মানিত সভ্যতার ক্ষতের আখ্যান

শিক্ষা
Spread the love


গৌতম গুহ রায়

২০০২ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন ইমরে কার্তেজ। ঠিক ২৩ বছর পর আরেক হাঙ্গেরিয়ান বিশ্ব সাহিত্যে সবচেয়ে চর্চিত পুরস্কারটি পেলেন। লাজলো ক্রাশনাহরকাই- বাঙালির সহজ উচ্চারণের মধ্যে আসে না। সে যাই হোক, বিশ্ব সাহিত্যে তিনি এক ‘রহস্যময় ও গভীরতম কণ্ঠ।’ ক্রাশনাহরকাইয়ের আখ্যানে পরাবাস্তবতার আবহে মিশে থাকে নৈরাশ্য ও সভ্যতার ক্ষতচিহ্নিত সময়।

নোবেল কমিটি যথার্থই উল্লেখ করেছে যে, ‘তাঁর দৃষ্টিনন্দন, বিষণ্ণ অথচ মহিমান্বিত আখ্যান, যা বিশৃঙ্খলা ও ভয়ের মধ্যেও মানবতার শিল্পসত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করে।’ কার্তেজের ‘লিকুইডেশন’-এর চরিত্র ছিল আউশভিৎস থেকে প্রাণে বাঁচা একজন আর ক্রাশনাহরকাই পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েতের দখলদারিতে গ্রেপ্তার ও পরে দেশত্যাগী হয়েছিলেন। এখানেই যুদ্ধ ও দখলের অমানবিক বীভৎসতা দুই হাঙ্গেরিয়ানকে মিলিয়ে দেয়।

হাঙ্গেরির ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই তিনি নিভৃত ও সংযত যাপনে নিজেকে গড়ে তোলেন। এই সময় থেকে তিনি প্রায়ই হাঙ্গেরির পাহাড়ি অঞ্চলে একাকী ঘুরে বেড়াতেন। এই একাকিত্ব তাঁর লেখালেখিতে প্রভাব ফেলে। পূর্ব-এশিয়া ভ্রমণে চিন, জাপানের বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও প্রাচীন জাপানি সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধ্যানগম্ভীরতা ক্রাশনাহরকাইকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে।

১৯৮৫ সালে প্রথম উপন্যাস স্যাটানট্যাঙ্গো (Satantango) অর্থনৈতিক ধ্বংস ও আধ্যাত্মিক নিঃশেষের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক গ্রামীণ সমাজের কাহিনী। ক্রাশনাহরকাইয়ের দ্বিতীয় বড় কাজ ‘দ্য মেলাঙ্কোলি অফ রেজিস্ট্যান্স।’ ১৯৮৯-এ লেখা এই উপন্যাস সভ্যতার অধঃপতন ও নৈতিক শূন্যতার এক দার্শনিক কাব্য যেন। এর এক দশক পর ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার।’ যেখানে এক সরকারি কেরানির চোখ দিয়ে দেখা যায় মানবসভ্যতার অন্তিম সংগ্রাম– যুদ্ধ, ইতিহাস ও ভাষার মধ্যে দিয়ে টিকে থাকার এক মরিয়া প্রচেষ্টা।

২০১৩-তে প্রকাশিত উপন্যাস ‘সিয়াব দ্যার বিলো’-তে ছিল, লেখকের ওপর প্রাচ্য দেশের আধ্যাত্মবাদী দর্শনের প্রভাব। আখতারুজ্জমান ইলিয়াস বা কমলকুমার মজুমদারের লেখায় পাঠকদের যেমন দীর্ঘ বাক্যপাঠের অভিজ্ঞতা আছে, তেমনই ক্রাশনাহরকাই। প্রথম উপন্যাসে ১২টি চ্যাপ্টার একটি করে বাক্যে লেখা। তাঁর অবিঘ্নিত বাক্যে লেখা পাঠকদের চমকিত করেছিল। তিনি কয়েক পাতাজোড়া দীর্ঘ বাক্যে মানুষের চিন্তাপ্রবাহ ও সময়কে একাকার করে দেন। প্রায়ই একটি বাক্যে বহু ধারণা, ছায়া, মনস্তাত্ত্বিক গহ্বরকে একত্রিত করেন।

তাঁর লেখায় ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি এবং লেখককে নিমজ্জিত করে রাখা প্রকৃতি, জীবন ও মৃত্যুর ধারণা মিশে যায়। নোবেল কমিটির বয়ান ধার করে বলতে হয়, ‘তিনি পাঠককে বাস্তবতার ভাঙন, সমাজের দুর্বল দিক ও ঘাতকতা শনাক্ত করার সাহস দেন এবং তাঁর পথে থাকে উদার ও সংকল্পমূলক দর্শন, যা শিল্পের মাধ্যমে মানুষের মানসিক ও আত্মিক উন্নতির বিশ্বাস প্রচার করে।’

পাঠকরা যথার্থই তাঁকে ফ্রাঞ্জ কাফকা, মার্কেজের উত্তরাধিকারী বলে আখ্যায়িত করেন। বর্তমান সময়ে আলোচিত ইউক্রেনের যুদ্ধের পটভূমি তাঁর লেখায় ব্যবহার করেছেন ক্রাশনাহরকাই। এই প্রসঙ্গে ‘দ্য ইয়েল রিভিউ’-কে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আবার ফিরে এসেছে- আমি প্রায়ই অনুভব করি। মানুষ কিছুই শেখেনি। ইউক্রেনের পাশের দেশ হাঙ্গেরি। অথচ আমাদের সরকার ‘নিরপেক্ষতা’-র কথা বলে। আমি ভেবে পাই না কী করে একটা দেশ নিরপেক্ষ থাকতে পারে, যখন পাশের মানুষগুলো প্রতিদিন মরছে, যখন রুশ সেনারা অন্যের ভূমি দখল করছে।’

এটা কোনও রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং নৈতিক প্রশ্ন। যে দেশ এমন সময়ে নীরব থাকে, সে নিজের আত্মাকে হারায়। আমাদের সবাইকে সেই দায় নিতে হয়। কারণ আমরা সবাই এই পৃথিবীর বাসিন্দা।

(লেখক সাহিত্য়িক, জলপাইগুড়ির বাসিন্দা) 



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *