নীল রূপকথার জগতে বেঁচে থাক সব কন্যাভ্রূণ-নির্ভয়ারা

নীল রূপকথার জগতে বেঁচে থাক সব কন্যাভ্রূণ-নির্ভয়ারা

স্বাস্থ্য/HEALTH
Spread the love


সুলয়া সিংহ: একটা চারাগাছ মহীরুহ হয়ে উঠতে সময় নেয় অনেকটা। প্রয়োজন হয় তাকে সযত্নে লালন-পালন করারও। ২০০৫ সালে সেই চারা গাছটাই রোপন করেছিলেন মিতালি রাজ-ঝুলন গোস্বামীরা। ধীরে ধীরে সে মাথাচাড়া দিয়েছে আপন গতিতে। ২০১৭-তে বড়সড় তুফানে নুইয়ে পড়েছিল সে। কিন্তু হার মানেনি। আবারও মাথা উঁচু করেছে। মাটি কামড়ে পড়ে থেকে বুঝিয়ে দিয়েছে, এত সহজে সে হার মানার ‘পাত্রী’ নয়। অবশেষে মিলল তার সুস্বাদু ফল। রবিবারসীয় ডিওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামে জিতলেন হরমনপ্রীতরা। এই জয় তো শুধুই প্রতীকী। আসলে তো জিতে গেল গোটা দেশের সেই সমস্ত নারী, যারা ‘লোকে কী বলবে’র বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাঁচার সাহস দেখায় প্রতিদিন। স্মৃতিদের জেদ তো আত্মবিশ্বাস দিল তাদেরও, যারা বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখতে ভুলে গিয়েছে। শেফালিদের সাফল্য তো সাহস জোগাবে তাদেরও, যারা মধ্যরাতে বাড়ির বাইরে পা রাখতে ভয় পায়। ওড়নায় একটান মারলে রুখে দাঁড়াতে দ্বিধা করে। দীপ্তি-শেফালি-রিচাদের পুল শট, বাউন্সারগুলো যেন মহিলাদের সেই সমস্ত অবহেলা, লাঞ্ছনা, অপমান, আতঙ্কের সপাট জবাব।

বিশ্বকাপ ফাইনালের সকালেই সংবাদপত্রের পাশাপাশি দু’টো শিরোনাম ছিল একেবারেই বিপরীত ধর্মী। বাঁ-দিকে মেয়েদের বিশ্বজয়ের অপেক্ষা। আর ডানদিকের শিরোনাম, ‘মেয়ে কেন? শিশুর মুখে বিষ, অভিযুক্ত ঠাকুমা’। এ আর নতুন কী। কয়েনের একপিঠে মা দুর্গার আরাধনা আর অন্যপিঠে অসুরদের আস্ফালন। দেবীপক্ষে ‘অভয়া’দের ধর্ষণের খবর তো এখন ‘স্বাভাবিক বিষয়ে’ পরিণত হয়েছে। তাতে আর অবাক হতে হয় না। তাই অতি সহজেই বলে দেওয়া যায়, হরমনপ্রীতদের হাতে ট্রফি ওঠার পরও কোনও ম্যাজিকেই সেই ছবিটা বদলে যাবে না। বদলে যাবে না শর্ট স্কার্ট পরা মেয়েদের দিকে ঘুরে কটূক্তি করার অভ্যাস। বদলাবে না গার্হস্থ্য হিংসার ছবিটাও। কিন্তু কেবল নারীদের মন জানে বদলটা ঠিক কোথায় আনা সম্ভব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে কথা বলার যে সাহস দেখায়নি অনেকে, সেই সাহসই যেন তাদের মধ্যে সঞ্চারিত করলেন হরমনপ্রীতরা। যদি একজনও সেই সাহস দেখায়, তবে এই ১৪০ কোটির ভারতবর্ষে সেটাই প্রাপ্তি।

ICC Women's World Cup

আজকের পর রোহতকের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা শেফালির বিশ্বজয় নিয়ে হইচই কম হবে না। গোটা হরিয়ানা তাঁকে নিয়ে মেতে উঠবে উৎসবে। আলোর রোশনাইয়ে সাজবে গোটা গ্রাম। প্রশাসনের তরফে হয়তো বড়সড় পুরস্কার মূল্যও ঘোষণা করা হবে। কিন্তু সেই গ্রামেই কি বন্ধ হবে কন্যা ভ্রূণহত্যা? ফিকে হবে পুরুষতন্ত্রের রক্তচক্ষু। হয়তো না। কিন্তু যদি টিভির পর্দায় ফাইনাল ম্যাচে চোখ রেখে কোনও একজনও নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হন, তবে এই ১৪০ কোটির ভারতবর্ষে সেটাই প্রাপ্তি। প্রমিলাবাহিনীর গড়া এই নীল রূপকথার দুনিয়ায় যদি কোনও ঠাকুমার ‘বিষোদ্গার’ থেকে রক্ষা পায় কোনও শিশুকন্যা, সেটাই প্রাপ্তি। 

লোকাল ট্রেনের ভিড় ঠেলে অনুশীলনে যেতেন ঝুলন। পাড়ায় কম কটাক্ষ শুনতে হয়নি ববিতা ফোগাটদের। সন্তানদের সামলে অলিম্পিকের মঞ্চ থেকে পদক নিয়ে আসা মেরি কম তো কম পরিশ্রম করেননি। আবার অলিম্পিক পদক পেয়েও পুলিশের লাঠির মারে রাস্তায় গড়াগড়ি খেতে হয়েছে সাক্ষী মালিকদের। ভূ-লুণ্ডিত হয়েছে দেশের গর্ব। ভারতীয় মহিলা হকি দলের বিশ্বজয়ের সাফল্যের পথও ছিল কাঁটায় ভরা। তবে সব মঞ্চেই প্রত্যেকের মন্ত্র ছিল একটাই। নাছোড় মনোভাব। দেশের মুকুটে যতবার একটা করে পালক যোগ হবে, ততবার সমাজে সেই মন্ত্র উচ্চারিত হলে এই ১৪০ কোটির ভারতবর্ষে সেটাই প্রাপ্তি। যদি ভিড় বাসে মহিলার বুকে কনুইয়ের ধাক্কা দেওয়ার পরিবর্তে একজন পুরুষও অকারণে স্মৃতিদের নাম লেখা জার্সি গায়ে চাপায়, সেটাই হবে এই জয়ের সাফল্য। ট্রফি আর অর্থের তুলনায় সেই সাফল্য যে অনেক বেশি তৃপ্তির। 

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ







Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *