নদীর মৃত্যুতে সভ্যতা ধ্বংসের ইঙ্গিত

নদীর মৃত্যুতে সভ্যতা ধ্বংসের ইঙ্গিত

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতবর্ষ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশে প্রথম নগরায়ণ তথা সভ্যতার জন্ম নদীকে কেন্দ্র করেই। নদী কৃষি, জলজ সম্পদ তথা সভ্যতার উৎস। কিন্তু সেই নদীই আজ সংকটে। দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর মতো আধুনিক শহরগুলি আজ জলসংকটে ভুগছে। এই শহরগুলির জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিকাঠামোগত বিশেষ করে জল সরবরাহ, নিকাশি ব্যবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি। দুটি শহরই ভূগর্ভস্থ জলের উপর অত্যন্ত বেশি নির্ভরশীল। এখানে বৃষ্টির জল সংরক্ষিত না হওয়ায় জলস্তর প্রতি বছরই নীচে নেমে যাচ্ছে। আধুনিক নগরায়ণ পদ্ধতিতে কংক্রিটের রাস্তা ও ভবন বৃদ্ধির ফলে বৃষ্টির জল মাটিতে ঢুকতে পারছে না। দিল্লির যমুনা ও বেঙ্গালুরুর হ্রদগুলি ভীষণ মাত্রায় বর্জ্য ও রাসায়নিক দূষণে দূষিত হবার কারণে পানের অযোগ্য।

পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একসময় সবুজে ঘেরা প্রাণের শহর শিলিগুড়িরও একই পরিস্থিতি। আধুনিক নগরায়ণের জাঁতাকলে জর্জরিত ও অধিক জনসংখ্যার চাপে এই শহর আজ স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে। এই শহরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত একাধিক নদী আজ বিলুপ্তপ্রায়। নদীবাঁধগুলি বহুতলের গ্রাসে লুপ্ত। শহরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত ফুলেশ্বরী, চামটা, পঞ্চনইয়ের মতো নদীগুলি এই শহরের পানীয় জলের ধারা অব্যাহত রাখতে পারত। তবে পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের চাপে আজ তারা আত্মপরিচয়হীন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবর্জনা ও দখলদারির চাপে ফুলেশ্বরী আজ লাবণ্যহীন, কঙ্কালসার, মৃতপ্রায়। মহানন্দা অ্যাকশন প্ল্যানের মতো এক রূপকথার গল্প মাঝেমধ্যে আকাশে বাতাসে ভেসে উঠলেও সরকারি সদিচ্ছা, উদাসীনতা ও ভোটব্যাংক রাজনীতির চাপে সেটাও ফানুসের মতো উড়ে যায়। ভোটব্যাংকমুখী উন্নয়ন ও নগরায়ণের চাপে অতিরিক্ত বৃক্ষচ্ছেদন, বনভূমির হ্রাস একদিকে যেমন প্রাকৃতিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী, পাশাপাশি জলস্তর হ্রাস ও পানীয় জলের বিকল্প ব্যবস্থা না হওয়ায় দিল্লি, বেঙ্গালুরুর মতো শিলিগুড়িও আজ নিত্য জলকষ্টের শিকার।

শিলিগুড়ি এলাকায় ভূগর্ভস্থ জল মূলত পানীয় জলের উৎস হলেও এর গুণমান ক্রমশই খারাপ হচ্ছে। মোট ভূগর্ভস্থ জলের একটি বড় অংশ অত্যন্ত খারাপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শিলিগুড়ির জল সরবরাহের অন্যতম উৎস তিস্তা ও মহানন্দাতে বৃষ্টিপাত বাড়লে নদীর জলে রুক্ষকণিকা বেড়ে যায়। ফলে শোধনাগারে সমস্যার সৃষ্টি হয়। জনসংখ্যার চাপে শিলিগুড়িতে প্রত্যহ ১০০ মিলিয়ন লিটার জল সরবরাহ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে এর অর্ধেক পরিমাণের বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। গর্ত বা রিজার্ভারের সংখ্যা কম থাকায় জল সংরক্ষণের বিকল্প ব্যবস্থা প্রায় নেই। পরিকাঠামোগত অভাব বিশেষ করে নতুন রিজার্ভার, ডিপ টিউবওয়েল, পাইপলাইনের সম্প্রসারণ জল-সমস্যার অনেক বড় কারণ।

প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও জনচেতনা বৃদ্ধি করে প্রয়োজনে কঠোর আইন বলবৎ করে যদি নিয়মিত নদীগুলির ড্রেজিং সম্ভবপর হয় তাহলে খুব ভালো। বসতি বিকাশের ক্ষেত্রে সরকারি আইন ও নাগরিক কর্তব্যের সঠিক প্রয়োগ, পাশাপাশি নগরায়ণের ক্ষেত্রে পরিকাঠামগত উন্নয়ন ও অধিক মাত্রায় সবুজায়ন মৃতপ্রায় নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে। নদীই প্রকৃতি তথা সভ্যতাকে রক্ষা করতে পারে।

প্রকৃতির বশে আমরা, প্রকৃতি আমাদের বশে নয়। প্রকৃতি নিয়ে খেলা নয়। প্রকৃতিকে ধারণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। না হলে একটি নদীর মৃত্যু সভ্যতার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

(লেখক পেশায় শিক্ষক। শিলিগুড়ির বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *