ধ্বংসের মুখে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়

ব্লগ/BLOG
Spread the love


শুভঙ্কর চক্রবর্তী

একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে ধ্বংস হয়? একদিনে নয়, কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নয়, কোনও ভয়াবহ দুর্ঘটনাতেও নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হয় দীর্ঘদিনের অবহেলায়, প্রশাসনিক শূন্যতায়, রাজনৈতিক অনীহায় এবং সমাজের বিবেকহীন নীরবতায়। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় আজ সেই সত্যেরই এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ স্থায়ী উপাচার্যের নাম সুবীরেশ ভট্টাচার্য। চাকরি চুরির দায়ে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সিবিআই-এর হাতে গ্রেপ্তার হন৷ তারপর থেকেই ক্যাম্পাসে স্থায়ী উপাচার্য নেই। বছরখানেক একাধিক অস্থায়ী উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন, চলে গিয়েছেন। ২০২৩-এর শেষ থেকে সেই যাতায়াতও বন্ধ হয়েছে। প্রায় তিন বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যহীন। যাঁর নেতৃত্বে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন ও ভবিষ্যতের পথ নির্ধারিত হওয়ার কথা সেই চেয়ার ফাঁকা। নিয়োগের মামলা পৌঁছেছে সুপ্রিম কোর্টে। তবুও সুরাহা হয়নি।

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, দেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসেও এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যহীন এমন ঘটনা বিরল। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই অস্বাভাবিক ঘটনাই যেন আজ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। রাজ্য সরকার নির্বিকার, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও নীরব। আরও হতাশাজনক, সমাজেরও যেন কোনও হেলদোল নেই।

কিন্তু সংকট শুধু উপাচার্য না থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী রেজিস্ট্রার নেই। অতিরিক্ত দায়িত্বের ভারে একের পর এক শিক্ষক সেই পদ সামলাচ্ছেন, আবার দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন। যেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’-এর খেলায় পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে ফিন্যান্স অফিসারের পদ শূন্য। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে নেই ইনস্পেকটর অফ কলেজেস। একই বছরের ডিসেম্বর থেকে ফাঁকা কন্ট্রোলার অফ এগজামিনেশনের চেয়ার। ২০২২ সাল থেকে শূন্য এস্টেট অফিসারের পদ। দীর্ঘদিন ধরে নেই নিরাপত্তা আধিকারিকও। অর্থাৎ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর প্রায় সমস্ত প্রধান স্তম্ভই ভেঙে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিকে কি সুস্থ প্রশাসন বলা যায়?

বিশ্ববিদ্যালয় আইন স্পষ্টভাবে বলছে, উপাচার্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক প্রধান। তাঁর সভাপতিত্বেই কোর্ট, এগজিকিউটিভ কাউন্সিল, অর্থ কমিটি, লাইব্রেরি কমিটি, ফ্যাকাল্টি কাউন্সিল, বোর্ড অফ স্টাডিজ সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃপক্ষ কাজ করে। কিন্তু যখন উপাচার্যই নেই, তখন এই বৈঠকগুলি কীভাবে হচ্ছে? কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে? সেই সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি কোথায়? যদি ভবিষ্যতের কোনও উপাচার্যের অনুমোদনের অপেক্ষায় আজকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে সেই প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা কতখানি? এই প্রশ্নগুলির উত্তর আজও অমীমাংসিত।

২০১৭ সালের আইন দেখিয়ে রাজ্য সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন চালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু সেই আইনের আওতায় যাঁরা প্রতিদিন দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে রেজিস্ট্রার বা অন্যান্য আধিকারিকের দায়িত্বের কথা রয়েছে, কিন্তু উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে তাঁদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার স্পষ্ট উল্লেখ নেই। ফলে গোটা প্রশাসন অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে। উচ্চশিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই অনিশ্চয়তা কোনওভাবেই কাম্য হতে পারে না।

আরও বড় প্রশ্ন হল, এই অবস্থা শুধু উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই কেন? রাজ্য তথা উত্তরবঙ্গের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপাচার্য রয়েছেন। প্রয়োজনে তাঁদের মধ্যেই কাউকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া যেত। দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নজির রয়েছে। তাহলে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সেই উদ্যোগ নেওয়া হল না কেন? এর উত্তর রাজ্য সরকারের কাছেই থাকা উচিত। কারণ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বছরের পর বছর কার্যত অভিভাবকহীন অবস্থায় ফেলে রেখে পঙ্গু করে দেওয়া, প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি রাজনৈতিক উদাসীনতারও পরিচয়।

তবে দায় কেবল সরকারের নয়। দায় সমাজেরও। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তরবঙ্গের লক্ষ লক্ষ মানুষের স্মৃতি। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, বিচারক, অধ্যাপক, প্রশাসক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক- অসংখ্য কৃতী মানুষ। এই বিশ্ববিদ্যালয় উত্তরবঙ্গের বহু পরিবারের প্রথম প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখিয়েছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ সংকটে, অথচ কোথায় প্রাক্তনীদের প্রতিবাদ? কোথায় শিক্ষকদের সম্মিলিত কণ্ঠ? কোথায় ছাত্রসমাজের গণ আন্দোলন? কোথায় বুদ্ধিজীবী সমাজের বিবেক? এই নীরবতা শুধু হতাশাজনক নয়, উদ্বেগজনকও।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার কারখানা নয়। এটি একটি সমাজের চিন্তার কেন্দ্র, গবেষণার ভিত্তি, সংস্কৃতির ধারক এবং ভবিষ্যতের নির্মাতা। বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে গোটা অঞ্চলের বৌদ্ধিক শক্তি দুর্বল হয়। গবেষণা থেমে যায়, মেধাবী শিক্ষক আসতে চান না, ছাত্রছাত্রীরা অন্যত্র চলে যায়। ধীরে ধীরে একটি প্রতিষ্ঠান তার ঐতিহ্য, বিশ্বাসযোগ্যতা ও মর্যাদা হারাতে শুরু করে। এই ক্ষয় বাইরে থেকে চোখে পড়ে না, কিন্তু একসময় তার মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকেই।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় একদিন উত্তরবঙ্গের উচ্চশিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়েছিল। সেই আলোয় আলোকিত হয়েছিল পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্স, সীমান্তের অসংখ্য গ্রাম। আজ সেই প্রদীপের শিখা টিমটিম করছে। সবচেয়ে কষ্টের কথা, এই আলো নিভে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়েও সমাজের বড় অংশ নির্বিকার।

এখনও সময় ফুরিয়ে যায়নি। অবিলম্বে স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ করে, শূন্য প্রশাসনিক পদগুলি পূরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে সচল করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও মর্যাদাকে সম্মান জানিয়ে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করাটা এখনই জরুরি। এটি কোনও রাজনৈতিক দাবি নয়, এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের অধিকার এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্যই জরুরি।

ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে- উত্তরবঙ্গের সবথেকে পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় যখন দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকহীন হয়ে ধুঁকছিল, তখন সরকার কী করেছিল? বিরোধীরা কী করেছিল? শিক্ষক সমাজ কী করেছিল? প্রাক্তনীরা কোথায় ছিলেন? আর আমরা, উত্তরবঙ্গের মানুষ, কী করেছিলাম?

সেই প্রশ্নের উত্তর যেন আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের লজ্জিত না করে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *