ইরান, ইউক্রেন, প্যালেস্তাইনের যুদ্ধ বহুচর্চিত। এর বাইরে সুদান, ইয়েমেন, কঙ্গো সহ অজস্র দেশেও ধ্বংসলীলা চলছে।
রূপায়ণ ভট্টাচার্য
ভূগোলের কোনও রং হয় না। মানচিত্রেরও না। যদি হত, তা হলে আজ তা অবধারিতভাবে হয়ে উঠত লাল। রক্ত লাল।
পৃথিবীর বৃহত্তম কবরখানা ইরাকের নজাফ শহরে ওয়াদি-আস-সালামে। ১৪৮৫.৫ একরজুড়ে ৬০ লক্ষ সমাধি সেখানে। ১৪০০ বছর ধরে কবর দেওয়া চলছে নজাফের এই ‘শান্তির উপত্যকা’য়।
ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবীটাই না ওয়াদি-আস-সালাম হয়ে যায় দ্রুত!
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন প্রায় ১,৬০,০০০ থেকে ১,৭০,০০০ মানুষ এই গ্রহ থেকে হারিয়ে যায় চিরতরে। সিংহভাগই মারা যান বার্ধক্যজনিত কারণে বা রোগে। হৃদরোগ, ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক— এরা তো চিরকালীন খুনি। কিন্তু মানুষের জীবনরঙ্গ এখানেই।
আমরা রোগের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে গবেষণা করি, অথচ যুদ্ধের জন্য তার চেয়েও অনেক বেশি টাকা খরচ করে মারণাস্ত্র কিনি। ওষুধ তৈরির বাজেটের তুলনায় সেনা, সমরাস্ত্র তৈরির বাজেট বেশি।
রোগের তুলনায় যুদ্ধে মৃত মানুষের সংখ্যা হয়তো শতাংশের হিসাবে কম, তবে তা ভয়ংকর। আজ সারাদিনে যুদ্ধে কতজন মারা যাচ্ছেন তার সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন, কারণ কোনও পক্ষই সঠিক তথ্য দেয় না। তবে ইউক্রেন এবং গাজার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিচার করলে, দিনে কয়েকশো মানুষের মৃত্যু খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বরং কমই বলতে হবে।
আর এই মুহূর্তে যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি লোক মারা গিয়েছেন কোথায়? হয়তো গাজায়। সেখানে মাসের পর মাস ধরে যে নির্বিচার বোমাবর্ষণ চলছে, তাতে যে হারে অসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হচ্ছে, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল।
আমরাও তেমন! আমরা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলি, অথচ একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে বাণিজ্য করতে আমাদের দ্বিধা নেই। না হলে মুষড়ে পড়ি, দেশ তো পিছিয়ে পড়ছে! আমরা রাশিয়া, আমেরিকা, চিনের মুণ্ডপাত করব, আবার বাণিজ্যও করব। বলব, এটাই তো পৃথিবীর নিয়ম।
বিশ্ব কোন জাহান্নামে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমরা কফি শপে বসে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করি। ফেসবুক বা এক্সে (পুরোনো টুইটার) ক্ষুব্ধ ইমোজি দিই। তার পরের মুহূর্তেই সুইগিতে খাবারের অর্ডার দিতে দিতে ভুলে যাই, কে আক্রান্ত হল, আর কে আক্রমণ করল। কে মরল, আর কেন মরল।
আমাদের যত ভাবনা, যুদ্ধের জন্য তেল বা গ্যাসের দাম কত বাড়ল। ইউরোপ ভাবে, ইউক্রেনের যুদ্ধের জন্য আমাদের এখানে রুটির দাম কত বাড়বে। আমাদের এই ‘নির্বিকারত্ব’ আজ এক আর্ট। টিভিতে যুদ্ধ দেখতে অনেকের আবার অন্যরকম মজা। যেন বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলছে। বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচ। আমরা গ্লাডিয়েটরদের লড়াই দেখার মতো করে মৃত্যুর লাইভ টেলিকাস্ট দেখি।
ইউক্রেন বা পশ্চিম এশিয়ার নেতাদের দেখুন। তাঁদের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয়, তাঁরা যেন কোনও ভিডিও গেম খেলছেন। তাঁদের কাছে মানুষের প্রাণ স্রেফ পরিসংখ্যান। এবং আমরা সেই পরিসংখ্যানের দর্শক। গাজায় শিশুমৃত্যুর খবর আমাদের সকালের জলখাবারের তৃপ্তি নষ্ট করে না, বরং আমরা বিতর্ক করি কে আগে হামলা চালিয়েছিল। পৃথিবী যেন এক বিশাল কসাইখানা, যেখানে আমরা শুধু ঠিক করি, মাংসটা আমাদের প্লেটে কখন আসবে।
ইরান এবং ইউক্রেন, দুটো হাইপ্রোফাইল যুদ্ধ ছাড়াও পৃথিবীতে কিন্তু আরও অনেক যুদ্ধ চলছে, যা আমরা খবর হিসেবেও পাই না। আমাদের উপেক্ষা আরও তীক্ষ্ম হয় যখন যুদ্ধটা ‘তৃতীয় বিশ্বের’ কোনও প্রান্তে হয়। পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ হলে ভারতের অধিকাংশ মানুষ মজাই পান।
ইয়েমেন, সুদান, ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো— এসব নাম আমরা মানচিত্রে খুঁজি না। জানিই না, সেখানে দশকের পর দশক ধরে রক্তগঙ্গা বইছে। সিরিয়া বা লিবিয়ার নাম শুনলে আমাদের মনে হয়, ওগুলো তো অশান্তির আঁতুড়, ওখানে তো যুদ্ধ হবেই। মায়ানমারে যা ঘটছে, তা আমাদের পাশের বাড়ির খবর হয়েও দূরের মনে হয়।
এই যে ‘আমাদের যুদ্ধ’ আর ‘ওদের যুদ্ধ’— এই বিভাজনই আমাদের পচনের প্রমাণ। আমরা ইউক্রেনের জন্য মোমবাতি জ্বালাই, কিন্তু সুদানের শিশুদের জন্য আমাদের ফেসবুক পোস্টেরও খরচ হয় না। এটাই আমাদের সভ্যতার আসল চেহারা— সুবিধাবাদী এবং হৃদয়হীন।
শুধু গাজা নয়, বহু দেশেই নারী, শিশু, বৃদ্ধরা কেউ রেহাই পাচ্ছেন না। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার— এসব শব্দ সেখানে বোমার ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গিয়েছে। অবশ্যই বাকি নির্বিকার। আমরা এই মৃত্যুগুলোকে ‘কোলাটেরাল ড্যামেজ’ বলে চালিয়ে দিই। আমরা আক্রান্ত না হলেই হল রে বুঝলি ভাই!
ইউক্রেন বা পশ্চিম এশিয়ার মতো সংবাদমাধ্যমে বহুলচর্চিত যুদ্ধগুলোর বাইরের যুদ্ধের কথা বলছিলাম।
এই তালিকার প্রথমেই আসে আফ্রিকার দেশ সুদানের নাম। গত বছরের এপ্রিল থেকে দেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফ (র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস)-এর ক্ষমতা দখলের লড়াই এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। রাজধানী খার্তুম সহ গোটা দেশ আজ ধ্বংসস্তূপ। হাজার হাজার মানুষ নিহত, আর ঘরছাড়া কোটিরও বেশি।
রাষ্ট্রসংঘের মতে, সুদানে এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বাস্তুচ্যুত সংকট চলছে। যন্ত্রণা ও দুঃখের বিষয়, ইউক্রেন বা গাজার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সুদানের এই হাহাকার খুব একটা স্থান পায় না। বিশ্বনেতারাও এই সংকট সমাধানে খুব একটা তৎপর নন। এখানে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার সংকট জড়িয়ে নেই তো— ভাববে কেন!
আরও দক্ষিণে গেলে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো জ্বলছে। গত তিন দশক ধরে এই দেশটি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর হস্তক্ষেপের কারণে অশান্ত। মূল লড়াই সোনার খনি, তামা এবং অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। লড়াইয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছেন। যাঁদের অধিকাংশই যুদ্ধের সরাসরি শিকারে নয়, বরং অনাহার ও চিকিৎসার অভাবে মৃত।
আরও আছে! যৌন সহিংসতা এখানে যুদ্ধের এক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত। কঙ্গোর এই সংঘাত এক বিশাল মানবিক বিপর্যয়। অথচ এটি বিশ্বের কাছে প্রায় অজানা।
এশিয়ার দিকে তাকালে আমাদের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কথা মনে আসে। পশ্চিম এশিয়ায় ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আরেক এক উপেক্ষিত মানবিক বিপর্যয়। ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে এই লড়াই চলছে। এই যুদ্ধে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ মারা গিয়েছেন। আর দুর্ভিক্ষ ও কলেরা মহামারিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুর মুখে। রাষ্ট্রসংঘের অসহায় স্বীকারোক্তি, ইয়েমেন এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অথচ কী বিস্ময় দেখুন, এটি বিশ্ব গণমাধ্যমে খুব কমই জায়গা পায়।
এই যুদ্ধগুলোর বাইরে সিরিয়া, লিবিয়া, সোমালিয়া বা নাগর্নো-কারাবাখের মতো অঞ্চলেও অস্থিরতা ও সংঘাত লেগে আছে। সব সংঘাতের পেছনে ক্ষমতার লোভ, জাতিগত বিদ্বেষ বা সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কাজ করছে। আর সংঘাতের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, যাঁরা শুধু শান্তিতে বাঁচতে চান শুধু।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম স্থপতি ছিলেন। আবার ছিলেন সাহিত্যে নোবেলজয়ী লেখক। বিরল কম্বিনেশন। আজকাল কোনও যুদ্ধবাজ নেতার মধ্যে পাবেন এই গুণ?
অক্সফোর্ডশায়ারের সেন্ট মার্টিন্স চার্চে তাঁর সমাধিলিপিতে চার্চিল বেশ মজা করে যা লিখে গিয়েছিলেন, তা বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘আমি আমার সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে দেখা করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা করার মতো কঠিন পরীক্ষার জন্য তিনি প্রস্তুত আছেন কি না, সেটা অন্য বিষয়।’
আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে চার্চিলের মতো নির্মম বাস্তববাদী অথচ সাহিত্যমনস্ক লোকও তো নেই। কলম যাঁরা চালান, কোথাও না কোথাও তাঁরা রক্তপাতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন! প্রকাশ্যে না হলে অন্তরালে! জুলিয়াস সিজার, নেপোলিয়নরাও সাহিত্য নিয়ে ভাবতেন! ট্রাম্প, পুতিন, নেতানিয়াহুরা সাহিত্য নিয়ে ভাবেন বলে তো মনে হয় না। গোটা পৃথিবীর রক্তপাত নিয়ে তাঁদের আবেগও নেই!
তাই বারবারই একটা কথা মনে হয়, ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবীটাই না একদিন ওয়াদি-আস-সালাম হয়ে যায় দ্রুত!
এখন ভূগোলের রং একটাই। লাল।
এখন ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক মানচিত্র, দুটোর রংই এক। লাল।
