সাধন দাস
১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর। যেদিন পৃথিবী বড়দিনের আনন্দে মুখর, সেদিনই নীরবে থেমে গিয়েছিল এক মহান শিল্পীর হৃৎস্পন্দন। চার্লি চ্যাপলিন সেদিন চলে গেলেও রেখে গিয়েছিলেন হাসির আড়ালে মানবতার এক অমর দর্শন। তাঁর মৃত্যুদিন কেবল এক কমেডিয়ানের প্রয়াণের দিন নয়- এ এক যুগের অবসান, আবার একই সঙ্গে এক চেতনার চিরস্থায়ী সূচনা। চার্লি চ্যাপলিন ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি হাসিকে বানিয়েছিলেন ভাষা, আর নীরবতাকে রূপ দিয়েছিলেন প্রতিবাদের শক্তিতে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, কমেডি শুধু বিনোদন নয়, তা হতে পারে সমাজের দর্পণ, মানুষের যন্ত্রণা প্রকাশের সবচেয়ে সংবেদনশীল মাধ্যম।
চ্যাপলিনের গল্প শুরু হয় দারিদ্র্যের আঁধার থেকে। ১৮৮৯ সালে লন্ডনের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই শিশুটি খুব অল্প বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বাবা ছিলেন মদ্যপ, মা মানসিক অসুস্থতায় ভুগতেন। অনাথ আশ্রম, অনাহার, অবহেলা- এসবই ছিল তাঁর শৈশবের সঙ্গী। কিন্তু এই দুঃখই তাঁকে ভেঙে দেয়নি; বরং গড়ে তুলেছিল এমন এক চেতনা, যা আজও মানবজাতিকে পথ দেখায়।
চ্যাপলিনের সৃষ্ট ‘দ্য ট্র্যাম্প’ চরিত্রটি আসলে তাঁর জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। ছেঁড়া জামা, ছোট টুপি, বাঁকা লাঠি আর অদ্ভুত হাঁটা- এই বাহ্যিক হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর আত্মসম্মানবোধ। সমাজ তাঁকে বারবার অপমান করেছে, তাড়িয়ে দিয়েছে, ক্ষুধার্ত রেখেছে- তবু তিনি মাথা নত করেননি। এই ট্র্যাম্প চরিত্রের মধ্য দিয়েই চ্যাপলিন বলেছিলেন, মানুষ যত দরিদ্রই হোক, তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকা উচিত। চ্যাপলিনের কমেডির মূল শক্তি ছিল নীরবতা। যখন সিনেমা কথা বলতে শেখেনি, তখন তিনি নীরব ছবিতেই মানুষের অন্তরের সব কথা বলে দিয়েছিলেন। ‘দ্য কিড’ ছবিতে এক অনাথ শিশুর প্রতি নিঃস্ব এক মানুষের ভালোবাসা আমাদের শেখায়- রক্তের সম্পর্ক নয়, মানবিক টানই আসল পরিবার। ‘সিটি লাইটস’-এ অন্ধ ফুলওয়ালার মেয়ের চোখে আলো ফেরাতে ট্র্যাম্পের নিঃস্বার্থ ত্যাগ মানবপ্রেমের এক অনন্য উদাহরণ। চ্যাপলিন ছিলেন যান্ত্রিক সভ্যতার এক তীক্ষ্ণ সমালোচক। ‘মডার্ন টাইমস’ ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন, শিল্পায়নের অন্ধ গতিতে মানুষ কীভাবে যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। এখানে হাসির দৃশ্যগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর আর্তনাদ- মানুষ কি কেবল উৎপাদনের উপকরণ? এই প্রশ্ন আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
তাঁর চেতনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ ছবিতে চ্যাপলিন সরাসরি ফ্যাসিবাদের মুখোশ খুলে দেন। একজন কমেডিয়ান হয়েও তিনি সাহস করে বলেছিলেন, ‘ঘৃণার রাজনীতি মানুষকে ধ্বংস করে।’ ছবির শেষ ভাষণে তিনি মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘মানুষকে ঘৃণা নয়, ভালোবাসতে শিখতে হবে।’ এই ভাষণ আজও বিশ্বের সবচেয়ে মানবিক ভাষণগুলোর একটি। চ্যাপলিনের জীবন সহজ ছিল না। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে, বিতর্কে জড়ানো হয়েছে, এমনকি আমেরিকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তবুও তিনি কখনও প্রতিহিংসাপরায়ণ হননি। তাঁর শিল্পে ঘৃণা নেই, আছে করুণা; প্রতিশোধ নেই, আছে ক্ষমা। এখানেই চ্যাপলিনের চেতনা অন্যদের থেকে আলাদা।
চার্লি চ্যাপলিন বিশ্বাস করতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানবিকতা। তিনি দেখিয়েছেন, হাসি কেবল আনন্দের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি হতে পারে বেঁচে থাকার অস্ত্র। দুঃখের মধ্যেও হাসার সাহস মানুষকে অমানবিক পরিস্থিতিতেও মানুষ করে রাখে।
(লেখক মাথাভাঙ্গার বাসিন্দা।)
