তেলের খিদে আর ডলারের দাপট : লুটের স্বার্থেই যুদ্ধ

তেলের খিদে আর ডলারের দাপট : লুটের স্বার্থেই যুদ্ধ

শিক্ষা
Spread the love


সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায়

টিভির পর্দায় ব্রেকিং নিউজটা নিশ্চয়ই দেখেছেন। অপারেশন ‘অ্যাবসোলিউট রিজলভ’। আমেরিকার মেরিন সেনার বুটের তলায় এখন ভেনেজুয়েলার মাটি। প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে কলার ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেন তিনি কোনও ছিঁচকে চোর। ওয়াশিংটন থেকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি বলছেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এই অভিযান।’ কেউ বলছেন, ‘মাদক মাফিয়াদের শেষ করতে এই যুদ্ধ।’

বিশ্বাস করলেন? করবেন না। কারণ, রাজনীতির দাবার বোর্ডে যা দেখানো হয়, চালটা তার উলটো দিকে দেওয়া হয়।

আজ আপনাদের একটা গল্প বলব। গল্পটা তেলের, গল্পটা টাকার, আর গল্পটা এক আন্তর্জাতিক ‘দাদাগিরি’র। চায়ের কাপে তুফান তোলার আগে এই সমীকরণটা বুঝে নেওয়া খুব জরুরি। কেন আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় হানা দিল? মাদুরো স্বৈরাচারী বলে? আজ্ঞে না। আসল কারণটা লুকিয়ে আছে ১৯৭৪ সালের একটা পুরোনো ফাইলে এবং হেনরি কিসিঞ্জারের করা একটা ডিলে।

পেট্রোডলারের মায়াজাল

১৯৭৪ সাল। আমেরিকা তখন সৌদি আরবের সঙ্গে একটা চুক্তি করে। চুক্তিটা খুব সহজ- সৌদি আরব তাদের তেল বিক্রি করবে শুধুমাত্র ‘আমেরিকান ডলারে’। আর তার বদলে আমেরিকা সৌদিকে দেবে আজীবন সামরিক সুরক্ষা।

ব্যাস! কেল্লা ফতে। জন্ম হল ‘পেট্রোডলার’-এর।

এর মানে কী দাঁড়াল? এর মানে হল, ভারত হোক বা চিন, জাপান হোক বা ফ্রান্স- তেল কিনতে হলে সবার পকেটে ডলার থাকতেই হবে। আর এই ডলার ছাপানোর মেশিনটা কার কাছে? আমেরিকার কাছে। ফলে আমেরিকা যা খুশি তাই করতে পারে। তাদের অর্থনীতি যতই নড়বড়ে হোক, ডলারের চাহিদা কমবে না। কারণ তেল ছাড়া পৃথিবী অচল, আর ডলার ছাড়া তেল মিলবে না। গত ৫০ বছর ধরে আমেরিকার এই ‘সুপারপাওয়ার’ হওয়ার চাবিকাঠি কিন্তু তাদের পরমাণু বোমা নয়, আসল চাবিকাঠি এই পেট্রোডলার।

ভেনেজুয়েলার অপরাধ কী?

ভেনেজুয়েলার মাটির নীচে তেলের যে ভাণ্ডার আছে, তা সৌদি আরবের চেয়েও বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের খনি ওখানেই। ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল! কিন্তু মাদুরো একটা ‘ভুল’ করে ফেলেছিলেন। তিনি আমেরিকার এই পেট্রোডলারের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছিলেন।

২০১৮ সাল থেকে ভেনেজুয়েলা ঘোষণা করে, তারা আর ডলারে তেল বেচবে না। তারা চিনা ইউয়ান, ইউরো, এমনকি ক্রিপ্টোকারেন্সিতে তেল বেচতে শুরু করে। এখানেই শেষ নয়, তারা ব্রিকস (BRICS)-এ যোগ দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। চিন আর রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা এমন একটা পেমেন্ট সিস্টেম তৈরি করছিল, যেখানে আমেরিকার দাদাগিরি খাটবে না।

আমেরিকার কাছে এটা স্রেফ বেয়াদবি নয়, এটা তাদের অস্তিত্বের সংকট। ভেনেজুয়েলার দেখাদেখি কাল যদি সৌদি আরবও ইউয়ানে তেল বেচতে শুরু করে (যা নিয়ে কথা চলছে), তাহলে ডলারের সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। আমেরিকা আর দেদার নোট ছাপিয়ে নিজের বিলাসবহুল জীবন এবং বিশাল সেনাবাহিনী চালাতে পারবে না।

তাই মাদুরোকে সরানোটাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। ড্রাগস, সন্ত্রাসবাদ, গণতন্ত্র- ওসব ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র চেষ্টা মাত্র।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি : সাদ্দাম থেকে গাদ্দাফি

একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যান। মনে আছে সাদ্দাম হোসেনের কথা? ২০০০ সালে সাদ্দাম ঘোষণা করেছিলেন, ইরাকের তেল আর ডলারে বেচা হবে না, বেচা হবে ইউরোতে। ফলাফল? ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ। সাদ্দামের ফাঁসি। আর ইরাকের তেল বিক্রি আবার ফিরে এল ডলারে। সেই ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ কিন্তু কোনওদিন পাওয়া যায়নি।

এরপর লিবিয়া। মুয়াম্মার গাদ্দাফি চেয়েছিলেন আফ্রিকার জন্য একটা নিজস্ব মুদ্রা তৈরি করতে- ‘গোল্ড দিনার’। সোনার বদলে তেল। হিলারি ক্লিন্টনের ফাঁস হওয়া ই-মেল থেকে আমরা পরে জেনেছি, এই ‘গোল্ড দিনার’ আটকাতেই গাদ্দাফিকে খতম করা হয়।

আর এখন ২০২৬-এ এসে সেই একই চিত্রনাট্য। চরিত্র শুধু বদলেছে। সাদ্দাম-গাদ্দাফিরা যা চেয়েছিলেন, মাদুরো সেটাই করছিলেন। তাই তাঁকে সরতে হল।

ট্রাম্প : মুখোশহীন এক ‘বুলি’

আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা অন্তত একটা ভদ্রস্থ মুখোশ পরে থাকতেন। ওবামা বা বুশ যখন অন্য দেশে বোমা ফেলতেন, তখন ‘মানবাধিকার’, ‘নারী স্বাধীনতা’র কথা বলতেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প? তিনি রাখঢাক পছন্দ করেন না। তিনি হলেন পাড়ার সেই বিগড়ে যাওয়া মোড়ল, যে সরাসরি বলে, ‘জমিটা আমার, আমি নেব।’

দু’সপ্তাহ আগেই ট্রাম্পের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার স্টিফেন মিলার যা বলেছেন, তা শুনলে চমকে যাবেন। তিনি বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেলের খনিগুলো নাকি আমেরিকার ‘ঘাম আর পরিশ্রমে’ তৈরি, তাই ওগুলো জাতীয়করণ করাটা আমেরিকার সম্পত্তি ‘চুরি’ করার শামিল! ভাবুন একবার! ১০০ বছর আগে কোনও মার্কিন কোম্পানি সেখানে কাজ করেছিল বলে আজ পুরো দেশের সম্পদ আমেরিকার হয়ে গেল?

এই যুক্তি যদি মানতে হয়, তবে তো ভারতও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে চুরির মামলা করতে পারে কোহিনুর আর সম্পদের জন্য! কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকায় যুক্তির স্থান নেই, আছে শুধু গায়ের জোর। ট্রাম্প বুঝিয়ে দিলেন, ভেনেজুয়েলার তেল এখন থেকে আমেরিকার ইঞ্জিনে জ্বলবে, আর তার দাম ঠিক হবে ওয়াশিংটনে বসে।

পরবর্তী টার্গেট : গ্রিনল্যান্ড?

ভেনেজুয়েলা তো হাতের মুঠোয় এল। কিন্তু এরপর কী? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নজর এখন উত্তরের বরফ ঢাকা গ্রিনল্যান্ডে।

হাসছেন? ভাবছেন বরফের দেশে আমেরিকা কী করবে?

ভুল ভাবছেন। গ্রিনল্যান্ড শুধু বরফ নয়, গ্রিনল্যান্ড হল আধুনিক প্রযুক্তির খনি। মোবাইল, কম্পিউটার, মিসাইল চিপ তৈরির জন্য যে ‘রেয়ার আর্থ মিনারেল’ বা বিরল খনিজ লাগে, তার বিশাল ভাণ্ডার লুকিয়ে আছে গ্রিনল্যান্ডের বরফের নীচে। আর এই মুহূর্তে এই খনিজের বাজারে চিনের একচেটিয়া দখল। চিনকে আটকাতে হলে আমেরিকার গ্রিনল্যান্ড চাই-ই চাই।

মনে করে দেখুন, ট্রাম্প তাঁর আগের মেয়াদে গ্রিনল্যান্ড ‘কিনে নেওয়ার’ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ডেনমার্ক তখন মুখের ওপর ‘না’ বলে দিয়েছিল। ট্রাম্প সেটা ভোলেননি। ভেনেজুয়েলায় এই সাফল্যের পর, ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। তিনি দেখছেন, রাষ্ট্রসংঘ বা আন্তর্জাতিক আইন- কেউ তাঁকে আটকাতে পারছে না।

‘আর্কটিক’ বা সুমেরু অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করা এখন আমেরিকার প্রধান অ্যাজেন্ডা। একদিকে রাশিয়া, অন্যদিকে চিন- বরফ গলছে আর নতুন নতুন বাণিজ্যিক পথ খুলছে। এই অবস্থায় গ্রিনল্যান্ড হল দাবার বোর্ডের মন্ত্রী।

ভেনেজুয়েলায় আমেরিকা যা করল, তা একটা বার্তা। বার্তাটা হল- ‘আমরা যা চাইব, তাই নেব।’ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ হতে পারে, কিন্তু ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বন্ধুর সম্পত্তিও নিরাপদ নয়। আজ হয়তো টাকার প্রস্তাব দেবেন, কাল হয়তো নিরাপত্তার অজুহাতে সেখানে ঘাঁটি গাড়বেন।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতি আবার ফিরে এসেছে। ভেনেজুয়েলার পতন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ডলারের বিরুদ্ধে গেলে কী হতে পারে। কিন্তু এর একটা উলটো দিকও আছে। আমেরিকা যত বেশি গায়ের জোর ফলাবে, বাকি পৃথিবী তত বেশি বিকল্প খুঁজবে। চিন, রাশিয়া, ইরান- এরা চুপ করে বসে থাকবে না।

ট্রাম্প হয়তো ভাবছেন তিনি জিতে গেলেন। কিন্তু ভেনেজুয়েলার তেলের দখল নেওয়া আর বিশ্বজুড়ে আমেরিকার প্রতি ঘৃণা বাড়িয়ে তোলা- দুটোর মধ্যে ফারাক আছে। মোড়ল যখন ভয় দেখাতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে তার পায়ের তলার মাটি সরছে। ভেনেজুয়েলা হয়তো সেই শেষের শুরু।

আর গ্রিনল্যান্ড? তৈরি থেকো। মোড়লের নজর এবার তোমার দিকে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *