তৃণমূলিকরণ ঠেকানো কি আদৌ সম্ভব শমীকের?

তৃণমূলিকরণ ঠেকানো কি আদৌ সম্ভব শমীকের?

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


গৌতম সরকার

গৈরিকীকরণ স্বাভাবিক। কিন্তু দুয়ারে বিপদ তৃণমূলিকরণের! বিজেপির জন্য আপদও বটে। সেই আশঙ্কা করছেন দলের খোদ রাজ্য সভাপতি। জোর গলায় বলছেন, বিজেপির তৃণমূলিকরণ- কভি নেহি! বিপদ দোরগোড়ায় বলেই তো বলতে হচ্ছে। বিপদ বলে বিপদ… বিজেপির অফিসে, মিছিল ভর্তি নতুন নতুন লোক। দলের নেতারা অবাক! আরে এঁরা কারা? বিজেপিতে দেখিনি তো কখনও! হ্যাঁ, নেতা-কর্মীদের অচেনা অনেক লোক বিজেপির শুধু দুয়াের নয়, ঘরে ঢুকে পড়ছেন।

চারদিন আগে নিউ জলপাইগুড়ির পথে জনা ১৫ তরুণকে দেখলাম। হাতে গেরুয়া ঝান্ডা। বিজেপির পতাকা নয়। যে ধরনের ঝান্ডা ভক্তিভরে বাড়ি বাড়ি ওড়ানো হয়। রামনবমী বা হনুমান জয়ন্তীর মিছিলে দেখা যায়। তরুণদের সেই জটলায় আবার স্থানীয় পোর্টাল বুম বাগিয়ে উপস্থিত। রাস্তা আটকে ইন্টারভিউ দেওয়া-নেওয়া চলছে। আমাদের গাড়ির চালক কার্যত চিৎকার করে উঠলেন। দাদা, এঁরা যে পরশুদিনও তৃণমূলের হয়ে দাদাগিরি করতেন এখানে।

পথেঘাটে টোটো-অটোয় পদ্ম আঁকা পতাকা। চালকদের ইউনিয়নগুলি রাতারাতি স্বঘোষিত বিজেপিপন্থী। দলীয় েনতৃত্ব গ্রহণ করুক না করুক, তাঁরা বিজেপি। আলিপুরদুয়ার জেলার এক হাসপাতালে চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা বিজেপির ইউনিয়নের স্বীকৃতি পেতে মরিয়া। এঁকে-তাঁকে ধরছেন বিজেপি নেতৃত্বের কাছে পৌঁছাতে। ইতিউতি বিজেপির মিছিলে গেরুয়া আবির মেখে নতুন লোকেরা নাচছেন, স্লোগান দিচ্ছেন। তাঁদের গলার জোর অন্যদের থেকে বেশি। গলাবাজির দেখনদারির প্রতিযোগিতা যেন। দলের নেতা আদি কর্মীরা যাঁদের চেনেনই না।

তিনদিন আগে জলপাইগুড়িতে বিজেপির জেলা কার্যালয়ে এরকম ভিড় থেকে কয়েকজনকে বের করে দিয়েছেন নেতারা। তাও ছিনেজোঁকের মতো লেগে সব। ভেতর ঢুকতে না দিলেও অফিসের বাইরে চা দোকানে দীর্ঘ অপেক্ষা। কোনওভাবে নেতাদের নজরে পড়ার মরিয়া চেষ্টা। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলছেন বটে- নো জয়েনিং। তৃণমূল থেকে একজনকেও নেব না। এমনকি সাংসদ, বিধায়করা কাউকে যোগদান করিয়ে থাকলে সেটা অবৈধ গণ্য হবে।

প্রশ্নটা হল- কোন ফ্লাডগেট বন্ধ করে বিজেপি সাজার এই জনস্রোত ঠেকাতে পারবেন শমীক? যে নৈতিকতার কথা তিনি বলছেন, তা কি নীচের তলায় আছে? ব্লক স্তরে, অঞ্চল স্তরে হামলা, কার্যালয় ভাঙচুর-লুটপাটের ধাক্কায় তৃণমূলের কেউ কেউ গেরুয়া শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার জন্য আঁকুপাঁকু করছেন। সেই সুযোগে শুরু হয়েছে বিজেপির নীচুতলায় একাংশের তোলাবাজি। টাকা দাও, তাহলে আর ঝােমলা হবে না। পরে সুযোগ বুঝে তোমাকে দলে নেওয়া হবে।

নৈতিকতায় লাগাম পরাতে না পারলে শমীক কেন শিবেরও কি সাধ্য আছে এই সুনামি আটকানো! বিজেপিতে যাঁরা এসব করছেন, তাঁদের একাংশ অতীতে তৃণমূলে ছিলেন। বিজেপিতে যোগ দিলেও তাঁদের ডিএনএ-তে যে তৃণমূলের তোলাবাজি, কাটমানির সংস্কৃতি। তৃণমূলিকরণ খানিকটা হয়েই আছে। কোন দেওয়াল খাড়া করে সেই সংস্কৃতি আটকাবেন শমীক! লোম বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে যাবে যে!

তর্কের খাতিরে নাহয় ধরে নিলাম যে, নতুন করে যাঁরা লাইন দিয়েছেন, তাঁদের আটকানো গেল। কিন্তু ইতিমধ্যে যে তৃণমূলিরা ঢুকে বসে আছেন, তাঁদের কোন গেটে প্রবেশ নিষিদ্ধ করবেন শমীক! দলের ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত হতে এই তৃণমূলি বিজেপিরা নানারকম ছকবাজি শুরু করেছেন। শুরু হয়েছে নানারকম সুবিধা ও পদের জন্য নেতাদের কাছে উমেদারি। আদি ও নব্যদের সংঘাত এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, তিনদিন আগে নাটাবাড়ি বিধানসভা এলাকায় দু’পক্ষের কার্যত হাতাহাতি হয়ে গিয়েছে।

আদি বিজেপি নেতা-কর্মীদের অসন্তোষ আর গোপন নেই। দিনহাটায় বিজেপির একনিষ্ঠ কর্মী ও বিধানসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী অজয় রায়ের কার্যত ছায়াসঙ্গী সাবানা খাতুন সোশ্যাল মিডিয়ায় সতর্ক করেছেন এই বলে যে, যাঁরা সাবানার জায়গা েনওয়ার জন্য ‘অজয় রায় (দাদার) কান ভাঙাচ্ছেন’ তাঁরা আসলে দিবাস্বপ্ন দেখছেন। এরকম সাবানাদের সংখ্যা বিজেপিতে অনেক। আদিদের ছাপিয়ে তৃণমূলি বিজেপিরা এখন সবকিছুর দখল নিতে মরিয়া।

এরকমই একদলের সন্ত্রাসে বাধা দিতে গেলে দিনহাটার কাছে নিগমনগরে বিদ্যাভারতীর জেলা প্রমুখের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের রক্তে দীনদয়াল উপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়দের হিন্দুত্বের বীজ নেই। লুকিয়ে আছে ধান্দাবাজি, সুবিধাবাদের ডিএনএ। যে রক্ত শোধনের কোনও যন্ত্র অন্তত এখনও শমীক ভট্টাচার্যদের মুরলীধর সেন রোড বা সল্ট লেকের দপ্তরে মজুত নেই। দলের রাজ্য সভাপতি যতই বলুন, এই অপরিশোধিত রক্ত বিজেপির তৃণমূলিকরণ ঠেকানোর বড় অন্তরায়।

আরেকদল ভোটপর্বে তৃণমূল সেজে বসে থাকলেও তাঁরা গোপনে দলকে অন্তর্ঘাত করেছেন। বিজেপিকে জেতানোর জন্য তাঁরা জান-প্রাণ দিয়ে লড়ে গিয়েছেন। বিজেপি জেতার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের উল্লাস যেন লাগামছাড়া। আলিপুরদুয়ারের বীরপাড়া এলাকায় তৃণমূলের সংখ্যালঘু মুখ রশিদুল আলম এরকম একজন। আলিপুরদুয়ারের সাংসদ মনোজ টিগ্গা দলের রাজ্য সভাপতির সুরে সুর মিলিয়ে বলছেন বটে, কিছুতেই ঢুকতে দেব না। কিন্তু রশিদুল গেরুয়া আবির মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

শিলিগুড়িতে কয়েকজন তৃণমূল কাউন্সিলার বরাবরই গেরুয়া শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন। দল আগামী পুরভোটে হেরে গেলও তাঁরা কাউন্সিলার পদে থেকে যাওয়ার জন্য পদ্মের কোলে আশ্রয় নেওয়ার মরিয়া চেষ্টা করবেন সন্দেহ নেই। কোচবিহারে জেলা পরিষদের সভাধিপতি সুমিত্রা বর্মন পর্যন্ত ইস্তফা দেবেন বলে মনস্থির করে রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। যত দিন যাবে, ক্ষমতার মধুলোভী তৃণমূল ত্যাগী জনস্রোত বাড়বে। বিজেপির অভ্যন্তরের তৃণমূলিরা আরও সক্রিয় হবেন।

শমীক দেওয়ালের মতো বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাইলেও তাঁর দলের একাংশ আগে থেকেই কিছুটা তৃণমূলিকরণ হয়ে আছে। সেই তৃণমূলিকরণ ঠেকানো বিজেপির রাজ্য সভাপতির সামনে আরেকটি বিরাট চ্যালেঞ্জ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *