গৌতম সরকার
ছিলেন কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী। হলেন রাজ্য সংখ্যালঘু কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান। ‘তাই রে নাই রে না/ এমন কোন ধাঁধা বলো যা কেউ জানে না।’ পূর্ণ ক্ষমতা থেকে দূরেই থাকলেন জন বারলা। প্রতিমন্ত্রী মানে তৃণমূলের ভাষায় হাফ মন্ত্রী। ভাইস চেয়ারম্যানও তাহলে হাফ চেয়ারম্যান। জন আদিবাসী শ্রমিক নেতা। পদ পেলেন সংখ্যালঘু কমিশনে। তাই সই। সরকারি পদ বলে কথা!
এদিকে, ৩১ ডিসেম্বর আসতে দেরি নেই। হৃৎকম্প শুরু হয়েছে তাই এসএসসি’র যোগ্য তকমাধারী চাকরিহারাদের। ওই সময়ের মধ্যে পুনর্নিয়োগ না হলে যে ইহকাল-পরকাল ফর্সা। ১ জানুয়ারি থেকে বেতন বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তা নিয়ে সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলির উদ্বেগ আছে কি আদৌ! সবাই বরং দু’হাত তুলে এসআইআর বা নাগরিকত্বের আর্জি গ্রহণের শিবির নিয়ে ব্যস্ত। কী আজব কাণ্ড রে ভাই, কী আজব কাণ্ড…!
জন অবশ্য মহাখুশি। নাকের বদলে নরুন পেয়ে বলছেন, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ। তৃণমূলে একবার নাম লেখালে কে আর মমতার প্রতি অকৃতজ্ঞ হন! দল ও মন্ত্রিত্ব থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে মমতাই নেত্রী থাকেন। এখন চটিচাটা বলে দু’বেলা গাল পাড়লেও শুভেন্দু অধিকারীও একসময় দিদির দেওয়া হাওয়াই চটি মাথায় তুলে নে রে ভাই বলে তৃণমূলে পাঠ দিতেন।
এসএসসিতে যোগ্য চাকরিহারাদের ফের নিয়োগ অনিশ্চিত। নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে নতুন কর্মপ্রার্থীরা পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁরাও জানেন না চাকরিটা পাবেন কি না! বিচারপতি নিজেই যে সংশয় প্রকাশ করছেন, এই পরীক্ষার ভবিষ্যৎ কী কে জানে! অথচ শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বুক বাজিয়ে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, যেরকম স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে এসএসসি কাজ করেছে, তা দেশের আর কোথাও হয়নি।
কী আজব ধাঁধা রে ভাই, কী আজব ধাঁধা! এসএসসি’র নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় হাজার হাজার শিক্ষকের চাকরি গিয়েছে। সেই এসএসসি নাকি গঙ্গার মতো স্বচ্ছ! এর চেয়ে মহাতামাশা আর কী হতে পারে বলুন তো! এত এত লোকের চাকরির নিশ্চয়তা যে সংস্থা দিতে পারে না, তাকে কোটি কোটি টাকা খরচে পুষে কার কী লাভ কে জানে! টাকাটা সরকারের ঘরে থাকতে পারে, দিয়েছেন তো আপনি।
জনগণের সেই টাকায় পরীক্ষার নামে মোচ্ছব হয়েছে। আশার আলো জ্বালিয়ে উৎসব করা হয়েছে। সেই আলো ক্রমে নিভু নিভু। কয়েক হাজার চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ আলো-আঁধারিতে ঘেরা। অথচ পরীক্ষা হল আদালতের নির্দেশ মেনে। শীর্ষ আদালতের বেঁধে দেওয়া নিয়মে। এখন যেসব অভিযোগে মামলা হচ্ছে, তা পরীক্ষা পর্বের আগেও উঠেছিল। যেমন অভিজ্ঞদের বাড়তি ১০ নম্বর দেওয়া কিংবা শূন্যপদ বাড়িয়ে দীর্ঘদিন যাঁরা শিক্ষকতা করলেন, তাঁদের সঙ্গে নতুন চাকরিপ্রার্থীদের এক বেঞ্চে বসিয়ে পরীক্ষা গ্রহণ।
পরীক্ষা প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে বলে আদালত তখন হস্তক্ষেপ করল না। এখন আদালত প্রশ্ন করছে, শূন্যপদ কেন বাড়ানো হল? নতুন ও পুরোনো চাকরিপ্রার্থী মিলিয়ে কেন মুড়ি-মুড়কি এক দর করা হল? এসব প্রশ্নে আগে হস্তক্ষেপ করলে গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত নাও হতে পারত। মহামান্য আদালতের কথা শেষকথা। কিন্তু সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করা যায়, এই বিড়ম্বনা কি ঠেকানো যেত না?
তামাশা যেন চারদিকেই। যতদিনই ভারতে থাকুন না কেন, ২০০২-এর ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে এসআইআর-এ আপনাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। নিদেনপক্ষে বাপ-ঠাকুরদা অথবা মাতৃকুলের দাদু-দিদার ২০০২-এর ‘লিংক’ চাই। নাহলে কী হবে? ১১ নথির তালিকা দেওয়া আছে বটে। কিন্তু শুনানিতে কোন কোন ঠিকুজি-কোষ্ঠী নিয়ে হাজির হতে হবে, কোন নথিতে লিংক মিলবে ভেবে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন অনেকে।
আধার নিয়েও কত আঁধার! প্রথম বলা হল, ভোটার তালিকায় নাম তুলতে আধার কার্ড কোনও গ্রাহ্য নথিই নয়। এই কার্ড দিয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ হবে না। সুপ্রিম কোর্ট শেষে বলল, আধার কার্ড অন্তত বিবেচনায় রাখুক নির্বাচন কমিশন। কিছুটা যেন অনিচ্ছায় রাজি হল কমিশন, কিন্তু শুধু ওটা প্রামাণ্য নথি নয় বলেও দিল। অথচ এখন বলা হচ্ছে, নতুন ভোটারদের তালিকায় নাম তুলতে আধার কার্ড অবশ্য চাই।
আধার কার্ড ছাড়া নাকি নতুন ভোটার কেউ হতে চাইলে তাঁর ভবিষ্যৎ আঁধারে! কখনও আধার কার্ড আঁধারে, কখনও আধার কার্ডে উজ্জ্বল আলো! রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘এ কেমন রঙ্গ জাদু/ এ কেমন রঙ্গ…।’ এসএসসি শুধু নয়, টেট উত্তীর্ণ ৩২ হাজারের ভবিষ্যৎ ঝুলছে আদালতে। আইনের গেরোয় শেষপর্যন্ত এসএসসি’র ২৬ হাজারের মতো তাঁদের পরিণতি হবে কি না, সময় বলবে। কিন্তু ঘোর অনিশ্চয়তা যে আছে, তাতে সন্দেহ নেই।
মাঝে মাঝে ইডি, সিবিআইয়ের জেগে ওঠাও এক ধাঁধা। কেননা, সেই সক্রিয়তার কোনও ধারাবাহিকতা থাকে না। হঠাৎ ঝাড়খণ্ড, বাংলার ৪৪ জায়গায় তল্লাশি হল সম্প্রতি। দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুর পর তাঁর স্ত্রী, ছেলেমেয়েকে ডেকে পাঠানো হল। মাঝে মনে হল মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহার গ্রেপ্তার বোধহয় সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু মোক্ষম মোক্ষম সময়ে ইডি, সিবিআইয়ের নীরব হয়ে যাওয়া বড় রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি মামলার জেরে হাজার হাজার শিক্ষকের জীবন এখন দুর্বিষহ। অথচ সেই মামলায় অভিযুক্ত কেষ্টবিষ্টু পার্থ চট্টোপাধ্যায়, মানিক ভট্টাচার্যরা আর জেলে নেই। দুর্নীতির তদন্ত, দুর্নীতির মামলা রহস্যজালে ঢাকা।
The submit তামাশা ও ধাঁধার জালে সত্যের থই মেলা ভার appeared first on Uttarbanga Sambad.
