ঘাম ঝরানোর আর দরকার নেই। মাঠে-ঘাটে ঘুরে সংগঠন ক্রমে অতীত। মিছিল-মিটিং-জনসভা আছে বটে। তবে ডিজিটাল কাজ হয়ে উঠছে রাজনৈতিক দলগুলির প্রধান ফ্রন্ট। যদিও দলগুলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শব্দটি ব্যবহারের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কেননা, রাজনীতি মূলত মতাদর্শভিত্তিক। দলগুলির ক্ষেত্রে সেই মতাদর্শের অস্তিত্ব কার্যত উধাও। মতাদর্শভিত্তিক কর্মকাণ্ড এখন ক্ষীণ। বদলে দলগুলির মূল উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে শাসনক্ষমতা দখল। যেনতেনপ্রকারে। মতাদর্শ শিকেয় তুলে হলেও।
ডিজিটাল ফ্রন্ট এখন প্রায় সব দলের অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কনটেন্ট হিসেবে এই ফ্রন্ট যা যা গ্রহণ করে, তা সবসময় তথ্যভিত্তিক থাকছে না। বরং সত্য, অসত্য ও অর্ধসত্যের মিশেল যে যতটা ভালো বানাতে পারে, সে ডিজিটাল ফ্রন্টে ততটা এগোতে পারে। ভারতে ডিজিটাল ফ্রন্টকে একেবারে কর্পোরেট কায়দায় প্রথম সাজিয়েছিল বিজেপি। শুধু দলগতভাবে বিজেপি নয়, পুরো সংঘ পরিবার এই আধুনিক কৌশলকে আঁকড়ে ধরেছে সফলভাবে।
শুধু নির্বাচনি প্রচার বা ভোটে জেতার রণকৌশল কিংবা পদ্ধতি নির্ধারণে আর আটকে নেই ডিজিটাল ফ্রন্ট। দৈনন্দিন দল পরিচালনা, এমনকি দল পরিচালিত সরকারের কর্মপদ্ধতি ঠিক করতেও ডিজিটাল যুগের আমদানি হয়েছে। অ্যাপ, সফটওয়্যার, অ্যালগরিদম ইত্যাদি ক্রমশ ক্ষেত্রসমীক্ষা ও গবেষণার স্থান দখল করেছে। ব্যক্তির মতামত অগ্রাহ্য করে যন্ত্রনির্ভরতা হয়ে উঠছে নিউ নর্মাল।
গেরুয়া শিবির প্রথম শুরু করলেও ডিজিটাল ফ্রন্টকে অন্য দলগুলি আর উপেক্ষা করতে পারছে না। অতীতে কম্পিউটারাইজেশনের বিরোধী বলে পরিচিত বামেরা পর্যন্ত অবস্থান বদলে ফেলেছে। সোশ্যাল মিডিয়া সেল, ফেসবুক পেজ, অনলাইন প্রচার ও পাবলিকেশন ইত্যাদিতে নিজেদের যুক্ত করে ফেলেছে বামেরা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যত দলের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন, তত ডিজিটাল ফ্রন্টে অগ্রাধিকার পড়েছে তৃণমূলে। সদ্য দলের ডিজিটাল যোদ্ধা কনক্লেভ সেই অগ্রাধিকারের যথার্থ প্রতিফলন।
আড়েবহরে এবং পদ্ধতিতে এই কনক্লেভ নজরে পড়ার মতো। তরুণ প্রজন্মের ডিজিটাল আসক্তি এই উদ্দেশ্যসাধনে সহায়ক হয়েছে। যে কারণে এই কনক্লেভে তৃণমূল ১০ হাজার কর্মীর জমায়েত করতে পেরেছে। যা খুব সহজ কথা নয়। গেরুয়া শিবিরের অবশ্য ডিজিটাল ফ্রন্টের প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শন তেমন নেই। কিন্তু অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এবং ক্ষুরধার কৌশলে কাজ করতে ইতিমধ্যে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে বিজেপির ডিজিটাল ফ্রন্ট। যাকে চলতি কথায় আইটি সেল বলা হয়ে থাকে।
তথ্য বা সত্যতার বদলে এই ধরনের ফ্রন্টের মূল কাজ স্পর্শকাতরতাকে সংক্রামক রোগের মতো ছড়িয়ে দেওয়া। প্রয়োজনে অসত্য, অর্ধসত্য বা বিকৃত তথ্যের ব্যবহারের নমুনা প্রায়ই দেখা যায়। অনেক বছর আগের বা ভিন্ন কোনও জায়গার ভিন্ন কোনও ঘটনার ছবি বা ভিডিও সাম্প্রতিক কোনও ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে আগ্রাসী প্রচার চলে। যাতে সাধারণ মানুষেরও বোধবুদ্ধি গুলিয়ে যায়। বিকৃত প্রচার প্রভাবিত করে সাংঘাতিকভাবে।
দেরিতে হলেও হইহই করে ডিজিটাল কর্মকাণ্ড শুরু করে দিয়েছে তৃণমূল। সদ্য সংগঠিত ডিজিটাল যোদ্ধা কনক্লেভে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া গাইডলাইন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ইঙ্গিতবাহী। তিনি মূলত জোর দিয়েছেন, বিজেপির প্রচারের প্রতিটি কনটেন্টের তাৎক্ষণিক ও পাই পাই জবাব। ফলে প্রথমত, একপক্ষ যদি তথ্যের ধার না ধেরে প্রচার করে, বিপরীত পক্ষও সত্য থেকে দূরে চলে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এই ফ্রন্ট শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে নয়, পাড়ায় পাড়ায়, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কাজ করবে বলে তেমন নিয়ন্ত্রণ থাকার সম্ভাবনা কম। ফলে কলতলার ঝগড়ায় কিংবা পাড়ায় নানা কারণে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে যেমন যুক্তিবুদ্ধিহীন ঝগড়া চলে, ডিজিটাল ফ্রন্টের কনটেন্ট অনুরূপ হয়ে উঠতে পারে। তৃতীয়ত, শুধু আনুষ্ঠানিক ডিজিটাল ফ্রন্ট নয়, দলের কর্মী-সমর্থক যে কেউ ডিজিটাল সৈনিক হয়ে উঠবে। ফলে ডিজিটাল ফ্রন্ট হয়ে উঠতে পারে হট্টমালার দেশ।
