দেবদূত ঘোষঠাকুর
কবিরা নাকি খুব ভালো প্রকৃতিকে বোঝেন!
এখনকার কবিদের কথা বলতে পারব না। আমরা যেসব কবির কবিতা পড়তে পড়তে বড় হয়েছি তাঁদের সঙ্গে প্রকৃতির ছিল নাড়ির টান।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।’
ভূগোল বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। এটাই বর্ষার মেঘ। ধীরে ধীরে নীল আকাশকে পুরোপুরি গ্রাস করছে ঘন কালো মেঘ। আকাশে যখন এতটুকু ও জায়গা ফাঁকা থাকবে না তখন অঝোর ধারায় নামবে বৃষ্টি। গাছের পাতা নড়বে, তবে ঝড় উঠবে না। বাজ পড়বে। কিন্তু তা ক্ষণিকের। বৃষ্টির সংগত।
ভুগোল বইয়ে আষাঢ় মাসের আকাশের বর্ণনাটা কিন্তু ওই একই আছে।
শুধু বদলে গেছে আকাশটা।
সকাল থেকে আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ। সেই মেঘ একে একে জুড়ে যাচ্ছে লম্বালম্বিভাবে। বিকেলের দিকে পশ্চিম আকাশের দিকে তাকালে দেখা যাবে কখন যে একটা এলাকায় একটার পর একটা ছোট মেঘ একে অপরের উপরে চেপে বসে একটা উল্লম্ব মেঘ তৈরি করেছে। কবি মোহিতলাল মজুমদার যা দেখে লিখেছিলেন, ‘ধরণীর পরে বিরাট ছায়ার ছত্র ধরিল কে’।
এটা কালবৈশাখীর মেঘ। বসন্ত শেষ ও গ্রীষ্মে তৈরি হওয়া মেঘের এমনই ছবি এঁকেছিলেন কবি। আষাঢ়ে মেঘের বদলে এটা নতুন ধরনের বাদল মেঘ। ওই উল্লম্ব মেঘপুঞ্জ যখন ভেঙে যাচ্ছে তখন প্রবল ঝড় হচ্ছে। গাছ শিকড় সমেত উপড়ে পড়ছে। বিকট শব্দে একটানা বাজ পড়ছে। তারপর অল্প সময়ে অত্যন্ত বেশি বৃষ্টি। এ যেন প্রলয়। সব বুঝি ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল। সর্বত্র কিন্তু একসঙ্গে এই কাণ্ডটি হচ্ছে না। সাতদিনের মধ্যে একবার উত্তর কলকাতায়, একবার পূর্ব কলকাতায়, একবার দক্ষিণ কলকাতায়।
ঠিক ধরেছেন, এটা মেঘভাঙা বৃষ্টি।
যবে থেকে আবহাওয়া নিয়ে একটু আধটু লেখালেখি শুরু করেছি, আকাশ ভাঙা বৃষ্টির পাশাপাশি মেঘভাঙা বৃষ্টি কথাটির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। কখনও উত্তরাখণ্ড, কখনও হিমাচলপ্রদেশ, অরুণাচলপ্রদেশ কখনও আবার আমাদের সিকিমে বছরে দুই একটা মেঘভাঙা বৃষ্টি হয়েই থাকে। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে উঠতে লম্বা মেঘ যখন আর তার মধ্যে জলরাশিকে ধরে রাখতে পারে না, তখন কোনও এক জায়গাতে সেই মেঘপুঞ্জ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে।
প্রবল জলরাশি হঠাৎ করে নেমে আসে পাহাড়ের গা বেয়ে। সামনে যা থাকে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পাহাড়ি নদী ফুলেফেঁপে ওঠে। আক্রান্ত হয় সমতলও। কোথায় কখন ভাঙবে সেই মেঘপুঞ্জ ‘কেউ তা জানে না’। আবহাওয়া দপ্তরও নয়।
ওই মেঘভাঙা বৃষ্টির সঙ্গে আমার অবশ্য সাক্ষাৎ পরিচয় সেই নয়ের দশকে। ভুটানের পাদদেশের সুন্দর এক জনপদ আলিপুরদুয়ারকে তছনছ হয়ে যেতে দেখেছিলাম গভীর রাতে ভুটান পাহাড়ে হঠাৎ করে নামা মেঘভাঙা বৃষ্টিতে। শহরের বুকে চিরে যাওয়া ছোট্ট শান্ত নদীটা যেন সমুদ্র হয়ে উঠেছিল। বিশাল বিশাল পাথর হেলায় বয়ে নিয়ে এসেছিল ওই নদী। গ্যাংটকে, দেরাদুনে, তাওয়াং-এ এখন ওই মেঘভাঙা বৃষ্টি গা-সওয়া ব্যাপার। প্রকৃতির ওই খেয়ালকে সঙ্গে নিয়েই যাপন পাহাড়ি মানুষের।
কে বলতে পারে একদিন ওই মেঘভাঙা বৃষ্টি দেখতেই হয়তো মানুষ দৌড়ে যাবেন সিকিমের পাহাড়ে। ক্যাম্প খাটিয়ে বসে থাকবেন। শুরু হবে এক ধরনের নতুন ‘অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম’।
আবহাওয়া গত কয়েক দশকে (ঠিক হিসেব করে বলা যাবে না কতদিন ধরে) এতটাই বদলেছে যে রবি ঠাকুর এখন বেঁচে থাকলে কয়েকটি কবিতা অবশ্যই প্রত্যাহার করে নিতেন। যেমন- ‘এসেছে শরৎ হিমের পরশ লেগেছে হাওয়ার পরে’, ‘হেমন্তে কোন বসন্তের ওই বাণী’, ‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন’, ‘ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল’। এখন বয়স যাঁদের তিরিশের কোঠায় তাঁরা হেমন্ত বলে কোনও ঋতু দেখেননি। শরৎকালটা গ্রাস করে নিয়েছে বর্ষা। ফলে শহরের মানুষ এসি চালিয়ে ঘুমোন। সমতলের শীত আর হাড়ে কাঁপন ধরায় না। আর বর্ষার সকালে ছাদে উঠে দেখলাম কাঞ্চন ফুল ফুটে আছে গাছটায়। এই গাছটি কোনও দিন পরিবর্তিত গাছ নয় কিন্তু।
ঋতু পরিবর্তন হল প্রকৃতির ঘড়ি। তার একটা ছন্দ আছে। ওই ছন্দে ‘খেলে যায় রৌদ্র ছায়া, বর্ষা আসে বসন্ত’। কখনও বাতাস বয় উত্তর থেকে, কখনও দক্ষিণ থেকে। কখনও আবার পুবালি বাতাস। বাতাসের অভিমুখ আর গতির সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত হয় তাপমাত্রা বাড়া-কমা, মাটির নীচের জল স্তরের ওঠানামা, বৃষ্টির আসা-যাওয়া, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা মেঘভাঙা বৃষ্টি। একবার ঘড়ি বেচাল করল কী, ধেয়ে এল দুর্যোগ।
ঘড়ি বেদম হলে সমস্যা আরও আছে। ধান, গম, যব, ভুট্টা, সর্ষে, আলু, পটল, ঝিঙে, গাজর, বিট, আম, জাম, কাঁঠাল- এ সবের ফলনের নির্দিষ্ট সময় আছে। কোনওটা হয় শীতে, কোনওটা ভরা বর্ষায়। কোনওটা আবার বেশি জল পছন্দ করে না। কোনওটা করে। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে ফলন হলে খাদ্যগুণ কিন্তু কমে যায়। অর্থাৎ আমাদের উদরপূর্তির জন্য আমরা কিন্তু পুরোপুরি ঋতুচক্রের উপরে নির্ভর করি। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা- আমাদের খাদ্যচক্রকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। আমাদের এই তল্লাটে কালবৈশাখী প্রায় উধাও হয়েছে, রামধনু চোখে পড়ে না, কই-শিঙি-মাগুরের মতো জিওল মাছ বাড়ন্ত।
তবু আমরা টিকে আছি এবং থাকব। এক একটা দুর্যোগ এসে জনসংখ্যা কিছু কমাবে বটে, কোভিডের মতো অতিমারিতে বাড়িতে বাড়িতে কান্নার রোল উঠবে, না খেয়ে মরতে থাকবে কিছু মানুষ, অপুষ্ট শিশুরাও থাকবে। মনে পড়ছে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের একটি কবিতার লাইন, ‘মন্বন্তরে মরিনি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি’। তারও আগে ডারউইন সাহেব বলেছিলেন, ‘যে পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, সে টিকে থাকে’।
আমরা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে প্রকৃতিকেও কিন্তু ছাড় দিচ্ছি না। এখন বর্ষায় আর ব্যাঙের ডাক শুনি না, সোঁদা মাটির ঘ্রাণ পাই না, রোদে পিঠ রাখার মতো শীত পাই না, তরিতরকারিতে তেমন স্বাদ পাই না। শুধু কোকিল সারাবছর ডাকে, শিউলি ফুল সারাবছর ফোটে, ঝিঙে-পটল শীতকালেও ফলে।
ওরাও আগামী বিপর্যয়ের জন্য তৈরি হচ্ছে। যদি আর শীত, শরৎ, বসন্ত একেবারেই না আসে!
(লেখক সাংবাদিক)
The put up ঋতুর স্মৃতিভ্রংশ appeared first on Uttarbanga Sambad.
