‘ছুটির বাঁশি বাজল যে ওই নীল গগনে’

বৈশিষ্ট্যযুক্ত/FEATURED
Spread the love


ব্যস্ততা ছাড়া, হিসাব ছাড়া, একান্ত নিজের মতো করে সময় কাটানোর অবকাশ আমরা পাই কতটুকু? আমাদের ছুটি আছে, কিন্তু সেই ছুটির মধ্যে বিশ্রাম নেই। আর অবকাশ? তার কথা ভাবার সময়ই বা কোথায়? লিখছেন পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার।

ধরা যাক, আজ রবিবার।

আরও পড়ুন:

তা, রবিবার সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথমেই চোখ চলে যায় ঘড়ির দিকে। সাড়ে সাতটা। অন্য দিন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এতক্ষণে হাঁফিয়ে পড়তে হয়। স্নানটান সেরে, নাকে-মুখে কিছু গুঁজে, চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার আগেই অফিসের গাড়ি হর্ন দিতে শুরু করে। এখন সেই তাড়া নেই। পাশ ফিরে বালিশটাকে একটু কাছে টেনে নিলাম। সারা সপ্তাহ অফিসের কাজের পর শরীর বলছে– এখন আর একটু শুয়ে থাকো। আজ তো তোমার ছুটি! আঃ!

কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই মাথার মধ্যে সোমবারের কাজগুলি এসে হাজির। একটি রিপোর্ট শেষ হয়নি। অনেকগুলো ইমেলের উত্তর দেওয়া বাকি। গতকাল সিএ-কে পাঠানো এক্সেল শিটে ভুল রয়ে গেল কি? সেটাও একবার দেখে নেওয়া দরকার। বিছানায় শুয়ে আছি, অথচ আমার মন পড়ে অফিসের চেম্বারে। চায়ের কাপ নামিয়ে মোবাইলটা হাতে নিলাম। অফিসের গ্রুপে একটা মেসেজ চোখে পড়ল। সেটা পড়তে গিয়ে আরও কয়েকটি। তারপরে খবরের হেডলাইন, পরিচিতদের ছবি, ‘গুড মর্নিং’ মেসেজ, দুটো ভিডিও। চা কখন জুড়িয়ে জল হয়ে গেল খেয়াল নেই!

রবিবার সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথমেই চোখ চলে যায় ঘড়ির দিকে। সাড়ে সাতটা। অন্য দিন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এতক্ষণে হাঁফিয়ে পড়তে হয়।

জানালার বাইরে সকালটা হামাগুড়ি দিয়ে ততক্ষণে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে, রোদের তাপ বাড়েছে। কখন যে থেমে গিয়েছে পাখিদের কলকাকলি, আমার কিছুই দেখা হয়ে ওঠেনি। মনে পড়ল, এখন বাজার যেতে হবে, বাবার ওষুধপত্তর কিনতে হবে, ইলেকট্রিসিটির বিলটাও দেওয়া হয়নি। ছুটির দিনে অফিসের কাজগুলির দখল নিয়েছে সংসারের হাজার প্রয়োজনীয় কাজ, আর দায়িত্ব। ক্যালেন্ডারে ছুটির ‘লাল রং’ আসলে আমার কানে ‘ছুটির বাঁশি’ বাজায় না।
বাজারের পথে পুরনো বন্ধু অরুণের সঙ্গে দেখা। হাতে সবজির ব্যাগ, মুখে বিরক্তি। বলল ‘সপ্তাহের জমে থাকা কাজ করছি। কাল অফিসে গিয়ে বরং একটু হাত-পা ছড়িয়ে বসতে পারব, সেখানেই আমাদের ছুটি।’ দু’জনেই হেসে উঠলাম। কিন্তু হাসির মধ্যে বিষাদই যেন প্রকট। আমাদের ছুটি আছে, কিন্তু সেই ছুটির মধ্যে বিশ্রাম নেই। আর, অবকাশ? ভাবার সময়ই বা কোথায়?

বাড়ি ফিরে, দুপুরের খাওয়া সেরে, ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে শরীরটা বেশ হালকা লাগল। কিন্তু মনের মধ্যে সেই অস্থিরতা। কী যেন করা বাকি। কী যেন দেখে নেওয়া হয়নি। মোবাইলটা কোথায়? তখনই মনে হল– ছুটি, বিশ্রাম আর অবকাশকে এত দিন একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছি। কাজ থেকে সাময়িক অব্যাহতি যদি ছুটি হয়, তাহলে ক্লান্ত শরীরকে আরাম দেওয়ার নাম বিশ্রাম। কিন্তু অবকাশ?

ছুটির দিনে অফিসের কাজগুলির দখল নিয়েছে সংসারের হাজার প্রয়োজনীয় কাজ, আর দায়িত্ব। ক্যালেন্ডারে ছুটির ‘লাল রং’ আসলে আমার কানে ‘ছুটির বাঁশি’ বাজায় না।

তার মধ্যে আছে আরও গভীর কিছু, আছে নিজের সময়টুকু নিজের মতো করে কাটানোর স্বাধীনতা। সেখানে কিছু করার সুযোগ যেমন আছে, তেমনই রয়েছে কিছু না-করার স্বাধীনতাও। ছোটবেলার রবিবারগুলি মনে পড়ল। দুপুরে বাড়ির বড়রা ঘুমোতেন। আমরা তখন আমগাছের নিচে, কিংবা পুকুরপাড়ে। শুকনো পাতা দিয়ে নৌকো বানাতাম। কোথায় যাবে সেই নৌকো, তার কোনও ঠিকানা ছিল না। কখনও খোলা মাঠে চিৎ হয়ে শুয়ে মেঘ দেখতাম। একটা মেঘ হাতি হয়ে যেত, খানিক পরে সেই হাতির শুঁড় উধাও। নতুন একটা দেশ তৈরি হত আকাশে। কেউ জিজ্ঞেস করত না, এর মধ্যে কী শিখলে। কতটা উন্নতি হল জীবনে, তার হিসাবও দিতে হত না। সময় ছিল আমাদের নিজেদের হাতেই। এখন মনে হয়, সেই অনায়াস দুপুরগুলির মধ্যে অবকাশ ছিল। তখন শব্দটা জানতাম না, কিন্তু তার স্বাদ পেয়েছিলাম সেই দিনগুলিতেই।

এখনকার ছোটদের রবিবার একেবারে কাজে ঠাসা, সকালে আঁকার ক্লাস, নাচের ক্লাস, বিকেলে পড়া আর সোমবারের হোমওয়ার্ক। এত ছোট একটা মানুষ, তারও হাতে সময় নেই! কখন সে জানালার বাইরে তাকিয়ে কল্পনার পাখা মেলে উড়ে যাবে অজানা দেশের দিকে? গত বছর কিছু দিনের জন্য পাহাড়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এবার বেশ জমিয়ে বিশ্রাম হবে। যাওয়ার আগেই ছেলে লিস্ট বানিয়ে দিয়েছিল, প্রথম দিন কোথায় যাব, দ্বিতীয় দিন কী দেখব, কোন দোকানে খেতে হবে। সকাল থেকে গাড়ি, গাড়ি থেকে নামা, ছবি তোলা, আবার গাড়ি।

এখনকার ছোটদের রবিবার একেবারে কাজে ঠাসা, সকালে আঁকার ক্লাস, নাচের ক্লাস, বিকেলে পড়া আর সোমবারের হোমওয়ার্ক। এত ছোট একটা মানুষ, তারও হাতে সময় নেই!

সেদিন বিকেলে পাহাড়ের গায়ে ধীরে ধীরে সাঁঝের ছায়া নেমেছিল। দূরে পাহাড়ের গায়ে একে একে জ্বলে উঠেছিল আলোর প্রদীপ, ঠিক দীপাবলির মতো। বেশ লাগছিল। এমন সময় বন্ধুর তাড়া, ‘চলো চলো, এখানে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পরের জায়গাটা আর দেখা হবে না!’ সেবার সত্যিই ক্লান্ত হয়ে ফিরেছিলাম। অনেক জায়গা দেখেছি, অথচ কোনও জায়গায় একটুও থিতু হয়ে বসতে পারিনি। ভ্রমণটা রয়ে গেল মোবাইলের ছবিতে আর হোটেলের লগবুকে। নিজের ভিতরে কতটুকু রইল, জানতেই পারলাম না।

বিকেলে বইয়ের তাক থেকে রবীন্দ্রনাথের চিঠির বইটা নামালাম। তাঁর জীবনও ছিল কাজে ঠাসা। জমিদারির দেখাশোনা, লেখালিখি, পরিবার, বিশ্বভারতী, মানুষের দাবি– কত দিকে যে তঁাকে মন দিতে হয়েছে। তবু সেই ব্যস্ত জীবনের মধ্যেই প্রকৃতিকে দেখার এমন দৃষ্টি তিনি কোথায় পেলেন? সাজাদপুর থেকে ইন্দিরা দেবীকে লেখা ২৩ জুন ১৮৯১-র চিঠিটিতে এসে থামলাম।

তিনি লিখছেন, ‘আজকাল দুপুর বেলাটা বেশ লাগে বব। রৌদ্রে চারি দিক বেশ নিঃঝুম হয়ে থাকে– মনটা ভারী উড়ু-উড়ু করে, বই হাতে নিয়ে আর পড়তে ইচ্ছে করে না।’ বই হাতে নিয়েও পড়তে ইচ্ছা করছে না– এ কথাটিই আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আমরা হলে হয়তো বলতাম, মন বসছে না, সময় নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মন তখন ঘাসের গন্ধ, মাটির ভাপ আর নিঝুম দুপুরের অলসতায় ভরে উঠেছে। পৃথিবীর শ্বাস যেমন তিনি অনুভব করছেন, পৃথিবীও তঁার উত্তাপে উষ্ণ করে নিয়েছে নিজেকে। তিনি শুধু দুপুরটাই দেখছেন না, দুপুরের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে তঁার আত্মিক সম্পর্ক। দৃশ্য দেখার সঙ্গে নিজেকে সেই দৃশ্যের মধ্যে অনুভব করার মধ্যে কত তফাত! আমি পাহাড় দেখে এসেছি, কিন্তু তার ছায়া নামার সময়টুকুও নিজের করে রাখতে পারিনি।

রবীন্দ্রনাথের সেই অনুভবকে বর্তমান সময়ের রবিবারে পাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর নদী, তাঁর আকাশ, তাঁর মনন– সবই ছিল আলাদা। কিন্তু তাঁর চিঠি আমাকে শিখিয়েছে জানালার বাইরের রোজকার দেখা গাছগুলোর দিকে তাকাতে। সেখানে দুটো পাখি এক ডাল থেকে অন্য ডালে লাফিয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। কেন যাচ্ছে, কেনই বা ফিরে আসছে! নিচে এক ভদ্রলোক কুকুর নিয়ে হঁাটছেন। বিকেলের আলোয় বাড়ির দেয়ালের রং বদলে গিয়েছে। এসব রোজই ঘটে। আমার চোখে পড়ে না। এখন এগুলিই অসীম আনন্দে আমার মন প্রাণ ভরিয়ে তুলেছে।

স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, ‘কী করছ?’

‘বসে আছি।’

‘শুধু বসে আছ?’

প্রশ্ন শুনে মনে হল, তাই তো! শুধু বসে থাকাটা আমাদের কাছে কত অস্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে! সঙ্গে কাগজ নেই, ফোন নেই, কোনও কাজও নেই। বসে থাকার একটি যুক্তি দেখাতে হবে তো! আমি নিজেও প্রথমে স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল, এই সময়টায় অন্তত দুটো কাজ সেরে ফেলতে পারতাম। তারপর খেয়াল হল, কাজের শেষ নেই।

একটা মিটলে আর-একটা যোগ হবে। সেই তালিকা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকলে আমার নিজের সময় আর কোনও দিনই আসবে না। ফোনটা ঘরে রেখে এলাম। তারপর দু’জনে জুড়ে দিলাম পুরনো দিনের গল্প। ছেলেবেলার দুষ্টুমি, বহু দিন আগে দেখা একটা নাটক। কথার পিঠে কথা জমে উঠছিল। ছিল না কোথাও পৌঁছনোর তাড়া। তখন বুঝিনি, এখন বুঝি, যে, কাজ সারাক্ষণ নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে বলে না, তার মধ্যেও বিশ্রাম থাকতে পারে। আমার আবার হাঁটতে ভাল লাগে। কিন্তু কিছু দিন হল হঁাটার মধ্যেও হিসাব ঢুকে পড়েছে। কত পা হল, কত মিনিট লাগল–বারবার দেখি ঘড়ি মিলিয়ে। সেদিন সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরিয়ে ভাবলাম, এখন পথটাও একটু দেখব।

মোড়ের পুরোনো বাড়িটার বাগানে শিউলির গাছটা ফুলে সাদা হয়ে আছে, আগে খেয়াল করিনি। একটা বাচ্চা বাবার আঙুল ধরে হঁাটছে। তার ছোট ছোট পায়ের সঙ্গে মিলিয়ে বাবাও নিজের গতি কমিয়েছেন। সেদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, দিনের সব ফাঁকা জায়গাগুলো সঙ্গে সঙ্গে ভরিয়ে ফেলব না। চা খেতে খেতে চায়ের স্বাদটুকু নেব প্রাণভরে। বন্ধুর কথা শুনতে শুনতে ফোন দেখব না। কোনও সন্ধ্যায় বইয়ের দু’-পাতা পড়ে যদি জানালার দিকে তাকাতে ইচ্ছা হয়, তাকাব। বই শেষ করার তাড়ায় সেই ইচ্ছাটাকে চাপা দিয়ে রাখব না।

পরের রবিবার সকালে ঘুম ভেঙে আবার ঘড়ির দিকে তাকালাম– সাড়ে সাতটা। বাজারে যেতে হবে, সেরে রাখতে হবে প্রয়োজনীয় দু’-একটা কাজও। তবু তার আগে এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় এসে বসলাম। রাস্তায় কিছু লোক অলসভাবে চলে যাচ্ছে। সামনের গাছটার কচি পাতায় সকালের রোদ এসে পড়েছে। আমি কিছুক্ষণ নীরবে সেদিকে চেয়ে রইলাম। কোনও অসাধারণ ঘটনা ঘটল না, পৃথিবীও থেমে থাকল না। শুধু সকালের ওই কয়েকটি মুহূর্তে আমিও পৃথিবীর সঙ্গে সহজভাবে মিশে থাকলাম– ব্যস্ততা ছাড়া, হিসাব ছাড়া, একান্ত নিজের মতো করে। আর বারান্দায় কাটানো ওই সামান্য সময়টুকুতেই বুঝতে পারলাম– অবকাশ আমার জীবনে আগেও ছিল, কেবল এত দিন তাকে চিনতে পারিনি।

(মতামত নিজস্ব)

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *