ক্যানসার নিয়ে আতঙ্ক নতুন নয়। কিন্তু সোশাল মিডিয়ার দৌলতে সেই ভয় এখন আরও জটিল। কখনও দেখা যাচ্ছে চিনি খেলেই ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, কখনও মাইক্রোওভেন বা ডিওডোরেন্টকে দায়ী করা হয় এই মারণরোগের জন্য। এমনকী কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, শুধুমাত্র ঘরোয়া বা প্রাকৃতিক উপায়েই নাকি ক্যানসার সারানো সম্ভব।
এই ধরনের ভুল ধারণাই বহু মানুষকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ গুজবের ভিড়ে চাপা পড়ে যায় আসল বিষয়, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা।
আরও পড়ুন:
চিকিৎসকদের কথায়, হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির ভুয়ো তথ্য অনেক সময় রোগীদের বিভ্রান্ত করে। ফলে অনেকে উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন, আবার কেউ অপ্রমাণিত চিকিৎসার উপর ভরসা করছেন।
আরও পড়ুন:

পরিবারে ক্যানসার না থাকলেও ঝুঁকি থাকতেই পারে
অনেকেই ভাবেন, পরিবারে কারও ক্যানসার না থাকলে নিজেরও ভয় নেই। কিন্তু বাস্তবটা একেবারেই আলাদা। চিকিৎসকদের মতে, প্রত্যেক মানুষেরই কিছু না কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে মাত্র ৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে জিনগত কারণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, অধিকাংশ রোগীর পরিবারে এই রোগের ইতিহাসই থাকে না। তাই শরীরে কোনও অস্বাভাবিক উপসর্গ টানা দু-তিন সপ্তাহের বেশি থাকলে তা অবহেলা না করাই ভালো।
চিনি খেলে কি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে?
ক্যানসার নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি- চিনি নাকি ক্যানসারের কারণ। তাই অনেকেই সম্পূর্ণ চিনি খাওয়া বন্ধ করে দেন। বিজ্ঞান বলছে, শরীরের সব কোষই শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করে। শুধু ক্যানসার কোষ নয়, সুস্থ কোষও একইভাবে চিনি বা কার্বোহাইড্রেটের উপর নির্ভরশীল।
আসল সমস্যা অতিরিক্ত অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে। বেশি পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফ্যাট এবং রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট শরীরের ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু পরিমিত পরিমাণে চিনি খাওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়।

মাইক্রোওভেন, ডিওডোরেন্ট: ভয় কতটা সত্যি?
ভাইরাল পোস্টগুলিতে প্রায়ই দাবি করা হয়, মাইক্রোওভেনে রান্না করা খাবার বা ডিওডোরেন্ট ব্যবহারে ক্যানসার হতে পারে। এই দাবির পক্ষে কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
স্বাস্থ্যকর ও টাটকা খাবার খাওয়া অবশ্যই ভালো অভ্যাস। কিন্তু শুধুমাত্র মাইক্রোওভেন ব্যবহারের কারণে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে না। একইভাবে ডিওডোরেন্টের সঙ্গেও ক্যানসারের কোনও সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
শুধুই প্রাকৃতিক চিকিৎসায় কি ক্যানসার সারে?
অনেকে মনে করেন, ভেষজ বা ঘরোয়া উপায়েই ক্যানসার পুরোপুরি সেরে যায়। এই দাবির পক্ষেও যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা গবেষণা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং দীর্ঘ পরীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি। তাই শুধুমাত্র ন্যাচারাল চিকিৎসার উপর নির্ভর করা বিপজ্জনক হতে পারে।

ক্যানসারের উপসর্গ সবসময় ভয়ঙ্কর হয় না
ক্যানসার মানেই অসহ্য ব্যথা, এই ধারণাও ভুল। অনেক সময় রোগটি খুব নীরবে শরীরে বাড়তে থাকে। অকারণ ক্লান্তি, দীর্ঘদিনের পেটের অস্বস্তি, পেট ফাঁপা, খিদে কমে যাওয়া বা শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মতো সাধারণ উপসর্গও ক্যানসারের ইঙ্গিত হতে পারে। কোনও সমস্যা যদি তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নিয়মিত পিরিয়ড হলেও ডিম্বাশয়ের ক্যানসার হতে পারে
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার নিয়ে একটি বড় ভুল ধারণা হল, পিরিয়ড নিয়মিত থাকলে নাকি ভয় নেই। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ অনেক সময় খুব নীরবে বাড়তে থাকে। পেট ভার লাগা, অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া, অস্বস্তি বা ক্ষুধামন্দার মতো উপসর্গই এর প্রথম ইঙ্গিত হতে পারে।

ম্যামোগ্রাম কি ক্যানসার ছড়িয়ে দেয়?
অনেক নারী ভয় পান যে ম্যামোগ্রামের রেডিয়েশন থেকেই নাকি ক্যানসার ছড়িয়ে পড়তে পারে। আধুনিক ডিজিটাল ম্যামোগ্রামে রেডিয়েশনের মাত্রা অত্যন্ত কম এবং তা প্রায় সম্পূর্ণ নিরাপদ। বরং নিয়মিত স্ক্রিনিংই স্তন ক্যানসার দ্রুত ধরা পড়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সোশাল মিডিয়ার গুজব নয়, ভরসা রাখুন বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর। কারণ ক্যানসার যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে, চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনাও ততই বাড়বে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
