চিকেন নেকে সাইবার অপরাধের থাবা

চিকেন নেকে সাইবার অপরাধের থাবা

শিক্ষা
Spread the love


(ভৌগোলিক সুবিধার অপব্যবহার রুখতে সীমান্ত সুরক্ষায় প্রয়োজন আধুনিক ডিজিটাল নজরদারি এবং কর্মসংস্থান।)

শমিত বিশ্বাস

ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া জলকে কাঁটাতারে বাঁধা না গেলেও শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন নেকের চরিত্র আজ অনেকটাই বদলে গিয়েছে। নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান ও তিব্বত পরিবেষ্টিত এই ২২ কিলোমিটার চওড়া সংবেদনশীল ভূখণ্ড কেবল উত্তর–পূর্ব ভারতের সংযোগকারী ধমনী নয়, তা এখন আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধের নতুন ক্ষেত্র। চোরাচালান বা অনুপ্রবেশের পুরোনো খতিয়ান ছাড়িয়ে প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে ওটিপি বা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ডের ফাঁদে ফেলে সাধারণ মানুষের আজীবনের সঞ্চয় নিমেষে লুট করা হচ্ছে। শিলিগুড়ির সস্তা হোটেল কিংবা ভারত–নেপাল সীমান্তের প্রত্যন্ত গ্রামের বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে চলা এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক এখন জাতীয় নিরাপত্তা ও সমাজতাত্ত্বিক সংকটের এক বড় উদাহরণ।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন তদন্তের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী ঝাড়খণ্ডের জামতারা বা হরিয়ানার নুহের মতো করেই উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি, মাটিগাড়া, খড়িবাড়ি এবং কালচিনি অঞ্চল এখন সাইবার অপরাধীদের নতুন ডেরা হয়ে উঠছে। নেপালের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভুয়ো লোন অ্যাপের ফাঁদ পাতা কিংবা প্রতিবেশী দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলকে কাজে লাগিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে টাকা পাচার করার মতো ঘটনা এই শান্ত ডুয়ার্স অঞ্চলেও ঘটছে। এই বিস্তারের পিছনে মূলত আন্তর্জাতিক সীমান্তের নৈকট্যে সহজে বিদেশি সিম মেলা, দ্রুত অন্য রাজ্যে গা-ঢাকা দেওয়ার ভৌগোলিক সুবিধা, যুবসমাজের কর্মহীনতা এবং সীমান্ত এলাকায় সাইবার নজরদারির অভাব কাজ করছে। ফলে কেন্দ্রীয় স্তরে ডিজিটাল সাফল্যের খতিয়ান পেশ করা হলেও, সীমান্ত অঞ্চলের প্রত্যন্ত প্রান্তে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে।

এই সংকটের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দিকটি হল উত্তরবঙ্গের যুবসমাজের অবক্ষয়। যে তরুণদের চা বাগানের শ্রমিক, সমতলের কৃষক বা তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্রের কর্মী হওয়ার কথা ছিল, তারা আজ জড়িয়ে পড়ছে সাইবার জালিয়াতির জালে। হিলকার্ট রোড বা সেবক রোডের বাণিজ্যিক এলাকার পেছনের সস্তার পেয়িং গেস্ট আবাসে ল্যাপটপ ও প্রিপেইড সিম নিয়ে বসে দ্রুত বেশি অর্থ উপার্জনের প্রলোভন তৈরি হচ্ছে। ফলে দৈনিক ২৫০ টাকার চা বাগানের শ্রমের কষ্ট অনেকে এড়াতে চাইছে। উত্তরবঙ্গে উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও আইটি পার্কগুলির আধুনিকীকরণ হলে মেধাবী কলেজ পড়ুয়াদের এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা অনেকটাই কমত। পুলিশ যখন কোনও তরুণকে গ্রেপ্তার করে, তখন তার পরিবার আইপি অ্যাড্রেস বা ভিপিএন–এর জটিলতা না বুঝলেও সন্তানের ভবিষ্যৎ হারানোর তীব্র যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ে।

এই ভুয়ো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং আন্তর্জাতিক সিম কার্ডগুলির একটি অংশ দেশবিরোধী কার্যকলাপে অর্থ জোগাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় ভুয়ো নথির সাহায্যে বহু সিম কার্ড তুলে অপরাধ শেষে তা সীমান্ত পেরিয়ে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে অপরাধীকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাওয়ালা লেনদেনের আন্তর্জাতিক চক্র। সাধারণ মানুষের অ্যাকাউন্ট থেকে লুট হওয়া টাকা মুহূর্তের মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরিত হয়ে বিদেশের অ্যাকাউন্টে চলে যাচ্ছে। যাতে স্থানীয় অর্থনীতি অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রাজনৈতিক স্লোগানের আড়ালে মানুষের রুটিরুজির প্রশ্ন যাতে হারিয়ে না যায়, তার জন্য তিনটি স্তম্ভের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, বিশেষ সীমান্ত সাইবার সেল গঠন করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সীমান্তবর্তী মোবাইল নেটওয়ার্ক ও সন্দেহজনক সিম ব্যবহারের ওপর কড়া নজরদারি চালানো। দ্বিতীয়ত, নিউ জলপাইগুড়ির আইটি পার্কটিকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা ও এথিক্যাল হ্যাকিং শিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত করে তরুণদের বিকল্প কর্মসংস্থান দেওয়া। তৃতীয়ত, গ্রামীণ স্তর ও চা বাগানগুলিতে স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো। দেবেশ রায়ের বাঘারু লড়াই করেছিল মাটির জন্য, আজ লড়াই ডিজিটাল অধিকার ও যুবসমাজের ভবিষ্যৎ রক্ষার।

(লেখক প্রাবন্ধিক শিলিগুড়ির বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *