সততা ও স্বচ্ছতা যে কোনও মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই দুটি না থাকলে কিংবা বিন্দুমাত্র ঘাটতি হলে সংশ্লিষ্ট মানুষ বা প্রতিষ্ঠান বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। সেইসময় আস্থার অভাব ঘটে। বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো প্রতিষ্ঠান যদি হয় নির্বাচিত সরকার বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান- তাহলে জনগণের আর যাওয়ার জায়গা থাকে না। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীকে (এসআইআর) (SIR) কেন্দ্র করে তেমনই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।
পরিস্থিতিটা প্রাথমিকভাবে বাংলার। তবে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে জাতীয় ক্ষেত্রেও। এসআইআর নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বনাম নির্বাচন কমিশনের টানাপোড়েন নিয়ে এখন আইনি লড়াই চলছে। সেই লড়াই নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য শুধু ইঙ্গিতপূর্ণ নয়, বিস্ফোরকও বটে। ভোটার তালিকায় বিচারাধীনদের বিষয়টির নিষ্পত্তি নিয়ে শুনানি চলাকালীন সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court docket) একইসঙ্গে রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সততা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।
এই সংশয় প্রকাশের তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী এবং বহুমাত্রিক। দুর্ভাগ্যজনক তো বটেই। মানুষ অনেক আশা নিয়ে সরকার নির্বাচন করে। সেই সরকার জনসাধারণের জীবনধারণ, স্বাভাবিক নাগরিক পরিষেবা, কর্মসংস্থান, মাথার ওপর ছাদ তৈরির নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা। শুধু কথা বললে ভুল হবে, সেটা বাধ্যবাধকতাও বটে। সেই দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হলে পরের নির্বাচনে সেই সরকারের ক্ষমতাসীন দলকে জনসাধারণ সরিয়ে দেয়। কিন্তু দায়িত্ব পালনে গাফিলতি সেক্ষেত্রে অভিযোগের স্তরে থাকে। তা নিয়ে রাজনৈতিক তর্জাও চলে।
কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন সেই সরকারের সততা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছে, তার অভিঘাত অনেক বেশি। শুধু এসআইআর নয়, বিভিন্ন চাকরির নিয়োগে দুর্নীতি, র্যাশনে কেলেঙ্কারি, আরজি কর মেডিকেলে হবু ডাক্তারের ধর্ষণ-খুনের নেপথ্যে আর্থিক অনিয়ম ইত্যাদিতেও সেক্ষেত্রে সরকারের অসততার অভিযোগে সিলমোহর পড়ে যায়। যা নিয়ে সরকার ও রাজ্যের শাসকদল বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাজনীতি করার অভিযোগ তোলে- তাতে ধাক্কা দিল সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্য।
সততাই যদি না থাকে, তাহলে সেই সরকারের প্রতি যে বিচার ব্যবস্থার ভরসা থাকবে না, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সেক্ষেত্রে সরকার যতই অভিযোগ করুক কিংবা আর্জি জানাক, আদালত তাকে সন্দেহের চোখে দেখবে। যা একইসঙ্গে গণতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক। গণতন্ত্রে আইনসভা ও বিচার বিভাগের পারস্পরিক মর্যাদা বোধের জায়গাতেও এতে ধাক্কা লাগতে বাধ্য।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন (Election Fee) এমন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার কাছে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা প্রত্যাশিত। পক্ষপাতহীন পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশনের আইনি বাধ্যবাধকতাও বটে। অতীতে অনেক সময় কমিশনের বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় শাসকদলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে বটে। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সেই অভিযোগ আরও ব্যাপক ও লাগামছাড়া হয়ে উঠেছে। দেশের প্রায় সব বিরোধী দল একসুরে জ্ঞানেশকে বিজেপির এজেন্ট বলে প্রচার করতে শুরু করেছে।
সংসদে একজোট হয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশকে ইমপিচ করার তৎপরতা শুরু করেছে সব বিরোধী দল। এই অভিযোগ ও সক্রিয়তা যে কোনও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদটির গরিমাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে। সেই পদাধিকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। সেই সংস্থার সংশয় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সন্দেহ প্রকাশ নির্বাচন কমিশনের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলির সেই অনাস্থায় সিলমোহর দিল সন্দেহ নেই।
রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন- উভয়ের সততাকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করেনি শীর্ষ আদালত, বাস্তবে উভয়ের বিশ্বাসযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। মনে করা যেতেই পারে যে, নিরপেক্ষতা ও আইনের প্রতি দায়বদ্ধতা হারিয়েছে বলেই সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর-এর বকেয়া অংশ (বিচারাধীন জটের নিষ্পত্তি) নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। নিষ্পত্তির সমস্ত কাজটাই বিচারকদের হাতে তুলে দিয়েছে আদালত। এটা রাজ্য ও কমিশনের প্রতি কতটা অনাস্থা- তা সহজে বোঝা যায়।
