মলয় চক্রবর্তী
শিক্ষা তো আর আকাশ থেকে পড়া কোনও তত্ত্বকথা নয়, এ হল মাটির কাছাকাছি থাকার মন্ত্র। উত্তরবঙ্গের মতো বৈচিত্র্যময় জনপদে শিক্ষার সঙ্গে ভাষার নাড়ির টান অস্বীকার করা মানে একটা বিরাট জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার থেকে দুই দিনাজপুর ও মালদা— এই বিশাল এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকার অক্সিজেন হল রাজবংশী ভাষা (Rajbanshi Language)। অথচ কী দুর্ভাগ্য! স্কুলের গেট পেরোলেই এই ভাষা আজও ‘ব্রাত্য’। বাড়িতে যে শিশুটি রাজবংশী ভাষায় স্বপ্ন দেখে, স্কুলে ঢুকেই তাকে সম্পূর্ণ অচেনা এক ভাষার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে পড়াশোনাটা তার কাছে আনন্দের না হয়ে, হয়ে ওঠে আতঙ্কের। গবেষণাও বলছে, নিজের ভাষায় কথা বলতে না পারার হীনম্মন্যতায় ভুগে অনেক শিশুই ক্লাসে ‘বোবা’ হয়ে থাকে, আর শেষমেশ স্কুল থেকে হারিয়ে যায়।
জাতীয় শিক্ষানীতি বনাম বাস্তব
ইউনেসকো বারবার বলছে, প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় না হলে শিক্ষার ভিত মজবুত হয় না। খোদ দেশের জাতীয় শিক্ষানীতিতেও (NEP 2020) পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষা বা স্থানীয় ভাষায় শিক্ষাদানের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে এই নীতির প্রতিফলন কোথায়? যে শিশুটি বাড়িতে রাজবংশী ভাষা শুনে বড় হচ্ছে, পাঠ্যবইয়ের সাধু বা চলিত বাংলার কঠিন ব্যাকরণ তাকে শুরুতেই হোঁচট খাওয়াচ্ছে। অথচ আমরা কি আজও সেই ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি? নাকি তথাকথিত ‘স্ট্যান্ডার্ড’ ভাষার দাপটে স্থানীয় ভাষার শ্বাসরোধ করছি?
স্বীকৃতি আছে, বাস্তব নেই
রাজ্য সরকার রাজবংশী ভাষা আকাদেমি ও কামতাপুরি ভাষা আকাদেমি গঠন করে উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগে সিলমোহর দিয়েছে—এ কথা মানতেই হবে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। এই স্বীকৃতি কি শুধু মেলা, উৎসব আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ফিতে কাটার মধ্যেই আটকে থাকবে? আকাদেমি হয়েছে, গবেষণা হচ্ছে— সবই ভালো কথা। কিন্তু যে প্রান্তিক শিশুটি গ্রামের ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, তার কাছে এর সুফল পৌঁছাচ্ছে কি? সিলেবাসে অন্তর্ভুক্তি, উপযুক্ত শিক্ষক আর ক্লাসরুমে রাজবংশী ভাষার ব্যবহারিক প্রয়োগ না থাকলে এইসব প্রশাসনিক আয়োজন অর্থহীন। সমস্যা আরও গভীরে। পাঠ্যবই ছাপানোই শেষকথা নয়, সেই বই পড়ানোর মতো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক কোথায়? যে শিক্ষক স্থানীয় উপভাষা বোঝেন না, তিনি ছাত্রের মনের নাগাল পাবেন কী করে? বর্তমানে রাজবংশী ভাষায় প্রচুর সাহিত্য ও গবেষণা হচ্ছে, তাই উপকরণের অভাব নেই। অভাব শুধু একটা জিনিসের— সরকারের সদিচ্ছা, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আর কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্তের।
গাছের আগায় জল, গোড়া শুকনো
পরিস্থিতিটা বেশ অদ্ভুত। রায়গঞ্জ বা কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজবংশী ভাষার ডিপ্লোমা বা ভাওয়াইয়া গানের সার্টিফিকেট কোর্স চালু হয়েছে। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার মহলে এই ভাষা জাতে উঠেছে। এটা অবশ্যই গর্বের। কিন্তু প্রশ্ন হল, বিশ্ববিদ্যালয়ের উঁচু দালানে এই ভাষার চর্চা হলে কী হবে, যদি প্রাথমিক স্কুলের বুনিয়াদটাই নড়বড়ে থেকে যায়? গোড়ায় গলদ রেখে আগায় জল ঢাললে কি গাছ বাঁচে? উচ্চশিক্ষার সঙ্গে স্কুল শিক্ষার এই ফারাকটা বড্ড চোখে লাগছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে জ্ঞান তৈরি হচ্ছে, তা যদি সহজ করে স্কুলের বইতে না আনা যায়, তবে সেই শিক্ষা সাধারণ মানুষের কাজে আসবে না। ভবিষ্যতে এই ভাষার পাঠক তৈরি হবে কোথা থেকে? স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—একটা সোজাসাপটা ‘ব্রিজ’ বা সেতু তৈরি করা আজ বড় জরুরি।

বহুভাষিক ক্লাসই বাঁচার পথ
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বহুভাষিক ক্লাসরুম কোনও বিলাসিতা নয়, ওটাই একমাত্র রাস্তা। গণিত বা বিজ্ঞানের জটিল ধারণা যদি শুরুতে স্থানীয় ভাষায় বুঝিয়ে তারপর মূল ভাষায় নিয়ে যাওয়া যায়, তবেই তা শিশুর মনে গেঁথে থাকে। উত্তরবঙ্গের (North Bengal Information) অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করেছে, মাতৃভাষাকে (Mom Tongue) বাদ দিয়ে জোর করে অন্য ভাষা চাপালে হিতে বিপরীত হয়। আনন্দের খবর হল, প্রায় ২১০টি রাজবংশী বিদ্যালয়কে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা হয়েছে। এটা দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল। এতে প্রমাণ হয়, দাবিটা আর শুধু জনসভায় আটকে নেই, পৌঁছে গেছে নীতি নির্ধারকদের টেবিলে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই স্কুলগুলো যেন পরিকাঠামোর অভাবে ধুঁকতে শুরু না করে।
স্বপ্ন এবার সত্যি হোক
এখন দরকার ছন্নছাড়া উদ্যোগগুলোকে এক সুতোয় বাঁধা। সমীকরণটা খুব সহজ হতে পারে— প্রাথমিক স্তরে রাজবংশী হোক শিক্ষার মাধ্যম বা ‘সাপোর্টিং ল্যাঙ্গুয়েজ’, যাতে স্কুলটাকে শিশুরা নিজের ঘর মনে করে। আর মাধ্যমিক স্তরে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি রাজবংশী থাকুক ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে। এটা কোনও ভাষার বিরোধিতা নয়, বরং মেধার বিকাশ ও আত্মপরিচয়ের প্রতিষ্ঠা। প্রশ্ন এখন আর ‘সম্ভব কি না’ তা নিয়ে নয়, প্রশ্ন হল— ‘কবে হবে?’ দেরি হলে শিক্ষার এই মহৎ উদ্দেশ্য শুধু ফাইলে বন্দি হয়েই থেকে যাবে। মাটির গানে যে ভাষা যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছে, এবার ব্ল্যাকবোর্ডেও তার সম্মান প্রাপ্য। উত্তরবঙ্গ হয়ে উঠুক ভারতের বহুভাষিক শিক্ষার রোল মডেল— এটাই এখন সময়ের দাবি।
(লেখক শিক্ষাবিদ)
