গ্রামীণ জীবনের স্বাদ না ব্যবসায়িক রিসর্ট!

গ্রামীণ জীবনের স্বাদ না ব্যবসায়িক রিসর্ট!

শিক্ষা
Spread the love


রুদ্র সান্যাল

সুবাসী তামাং সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার হোমস্টের উঠোনে জোরে গান বাজছে, অতিথিরা পার্টি করছে। একসময় যেখানে নিস্তব্ধ প্রকৃতি আর লেপচা গানের সুর ছিল, এখন সেখানে ডিজের তীব্র আওয়াজ।

তার বাবা যখন প্রথম হোমস্টে খুলেছিলেন, তখন পর্যটকরা স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতি উপভোগ করতেন। সন্ধ্যায় উঠোনে পাহাড়ি গানের আসর বসত, অতিথিরা গ্রাম্য জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানার আগ্রহ দেখাতেন। এখন সেই ছবি বদলে গিয়েছে। কেউ মোমো খেতে চায় না, সবাই চায় মশলাদার ও জনপ্রিয় খাবার। রাতভর ডিজে, পার্টি আর মদের আসরে বাড়ি হয়ে ওঠে বিনোদনের কেন্দ্র।

‘এখন এসব না রাখলে কেউ আসতেই চায় না!’ দাদুল তামাং বলছিলেন। কয়েক বছর আগেও প্রকৃতিপ্রেমীরা আসতেন, যাঁরা পাখির ডাক শুনতে ভালোবাসতেন, পাহাড়ের শান্তিতে সময় কাটাতে চাইতেন। এখন পর্যটকরা ডিজে ও উচ্চস্বরে গান ছাড়া সন্তুষ্ট নন। বাধ্য হয়েই হোমস্টে মালিকদের সেই ব্যবস্থাই করতে হচ্ছে।

এর প্রভাব ভয়াবহ। অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে পানীয় জলের সংকট তৈরি হয়েছে, স্থানীয়দের কষ্ট বাড়ছে। নদীর ধারে ক্যাম্পিংয়ের নামে পড়ে থাকছে প্লাস্টিক ও আবর্জনা, পাহাড়ের গায়ে জমছে চিপসের প্যাকেট আর বিয়ারের ক্যান। সুন্দরবনে হোমস্টে গড়ে উঠছে বাঘের আবাসস্থলের পাশে, ফলে বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্ব সংকটে। পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় লৌকিক সংস্কৃতির পরিবর্তে এখন চলছে পপ মিউজিক। উত্তরবঙ্গের পাহাড়-ডুয়ার্সের মতো।

শুধু পরিবেশগত ক্ষতিই নয়, স্থানীয়দের জীবনযাত্রাও বদলে যাচ্ছে। গ্রামবাসীদের এখন পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের জীবনযাপন পরিবর্তন করতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে ট্রেকিং গাইড, গাড়িচালক বা রিসর্ট কর্মচারী হয়ে যাচ্ছেন, যেখানে একসময় তাঁরা কৃষি বা পশুপালনে যুক্ত ছিলেন। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রাম তার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলবে।

প্রশাসন বলে, ‘হোমস্টে পর্যটন বাড়াচ্ছে, কর্মসংস্থান দিচ্ছে,’ কিন্তু এই বিশৃঙ্খলা দীর্ঘদিন টিকবে না। পরিবেশ ও সংস্কৃতি ধ্বংস হলে পর্যটকরাও একসময় মুখ ফিরিয়ে নেবেন।

সমাধানের জন্য প্রয়োজন অনুমোদনহীন হোমস্টে বন্ধ করা, পরিবেশগত অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা, স্থানীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ। দরকার অনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিতকরণ এবং পর্যটন আয় থেকে স্থানীয় উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিনিয়োগ।

সুবাসী ভাবে, তার বাবার স্বপ্ন কি শেষ হয়ে যাবে? স্থানীয় কিছু প্রবীণ আজও চান, পুরাতন পরিবেশ ফিরে আসুক। পর্যটনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগ ঘটানো, কিন্তু যদি এটি শুধুই বেপরোয়া আনন্দের মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে একসময় তা আকর্ষণ হারাবে। সিকিমের কিছু এলাকায় পরিবেশবান্ধব পর্যটনের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, পশ্চিমবঙ্গেও তেমন ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পর্যটকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে— প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখে ভ্রমণ করতে হবে।

সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয়দের সচেতনতা ও পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ— এই চারটি দিক একসঙ্গে এগোলেই হোমস্টে ট্যুরিজম সফল হবে। না হলে, পাহাড়ি গ্রামগুলোর ভবিষ্যৎ হয়ে উঠবে শুধুই কোলাহল ও বিশৃঙ্খলার মঞ্চ।

(লেখক শিক্ষক। শিলিগুড়ির বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *