গর্বের গল্প আজ কুয়াশামাখা ভোরের বিষাদগাথা – Uttarbanga Sambad

গর্বের গল্প আজ কুয়াশামাখা ভোরের বিষাদগাথা – Uttarbanga Sambad

শিক্ষা
Spread the love


  • সুতপা সাহা

 

নবান্নের ঘ্রাণ শেষ হতে না হতেই দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত শীত। হেমন্তের সোনালি মাঠগুলো কৃষকের মুখে হাসি ফোটালে তারপর কিছুদিন খালি পড়ে থাকে সেই শস্যভূমি। বিবর্ণ স্তূপীকৃত ঝরাপাতারা মমতার বন্ধনে জড়াতে না জড়াতেই ধীরে ধীরে সেই বন্ধন শিথিল হতে থাকে আর খোলা বন-প্রান্তরে কেবল শীতার্ত বাতাস ঘুরপাক খায়। ধুলোবালির সঙ্গী হয়ে উড়ে যায় ঝরাপাতার দল। কবি শেলী তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, সারাটা শীত জুড়ে পৌষ-মাঘের শীতল বিছানায় হেমন্তের ঝরাপাতারা ঘুমিয়ে থাকে, নতুন প্রাণকে লালন করবে বলে।
এক ইতিহাসবিদ লিখেছিলেন, আড়াই হাজার বছর আগে বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডারকে বিপাশার তীর থেকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছিলেন যে পরাক্রান্ত ভারতীয় সেনাপতি, তিনি হলেন ‘গ্রীষ্মের দাবদাহ’। সেই যে গ্রীষ্মের ছোঁয়া লেগে গেল সকলের দেহে ও মনে, তাই মোটামুটি গ্রীষ্ম আর বর্ষাতেই আটকে গেল বঙ্গবাসীর সৃজনশীলতা। বাংলা কাব্য-কবিতায় কেন যেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে শীত চিত্রিত হয়েছে রিক্ততা, প্রাণহীনতা, নিষ্ঠুরতা, বিরহ কাতরতার প্রতীক হিসাবে। পাশ্চাত্যের সৃজনচেতনাতেও শীত হল মৃত্যু ও অন্ধকারের প্রতীক। শীতের যেন কোনও প্রাণোচ্ছল রূপমাধুরী নেই, সে রিক্ত ধ্যানমগ্ন মহাতাপস।

‘আরম্ভিছে শীতকাল, পড়িছে নীহার-জাল,

শীর্ণ বৃক্ষশাখা যত ফুলপত্রহীন’

শীতের প্রারম্ভে প্রকৃতি যতই রিক্ত, শূন্য হোক, রবীন্দ্রনাথ বাংলার শীতের মধ্যে রিক্ততাকে দেখলেও তিনিই আবার কোথাও কোথাও শীতকে তার অন্য রূপেও আবিষ্কার করেছেন। পাতা খসানোর সময়-শুরুর বার্তা তো অনেক আগেই পৌঁছে দিয়েছেন কবি আমলকী গাছেদের কাছে, তাদের ডালে ডালে। হলুদ চাদরে ঢেকে গেছে সর্ষের ক্ষেত, তার মাঝে সবুজ পাতার আঁকিবুঁকি, এমন দৃশ্য তো শীতের দিনেই আসে।
বাংলার পথে-প্রান্তরে, মাঠেঘাটে তখন তাকালেই চোখে পড়ে খেজুর গাছে ঝুলছে ছোট্ট রসের হাঁড়ি। কোথাও গাছ থেকে রস নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিউলিরা আর ফসলের মাঠজুড়ে সোনালি আভায় সকাল-সন্ধ্যা জমতে থাকে হিম হিম কুয়াশা। হাট-বাজারে সবজিপসারির ডালায় ডালায় থরে থরে সাজানো শীতের সবজি ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলা, শালগম, ওলকপি, গাজর, টমেটো। নদীর বুকে কোথাও হাঁটুজল, কোথাও বা খটখটে চর জাগে। আর দুরন্ত কিশোর-কিশোরীরা মেতে ওঠে অল্প জলে মাছ ধরার উৎসবে। সেইসঙ্গে খাবারের খোঁজে খাল-বিল আর মাঠে-ঘাটে নামে সাদা বকের ঝাঁক। খেজুরের রস-গুড়, নবান্নের আবহ, পিঠেপুলির আয়োজন- সব মিলিয়ে শীতকাল বাঙালির সংস্কৃতির এক পূর্ণ প্রকাশ। এই পৌষ-মাঘ মিলে বাংলার যে শীতকাল, তা বোধহয় শুধু রিক্ততা আর বিরহবোধের নয়, পূর্ণতারও বটে। শরৎ আর হেমন্তের যে আয়োজন, শীতে তার পরিণতি ও সমৃদ্ধি।

এই বঙ্গে শীত আসে শিশিরের শব্দের মতো। মটরশুঁটি আর সবুজ ঘাসের ডগায় টলমল করে শিশিরের ফোঁটা। শিশিরমাখা ভোর, মিঠে রোদের দুপুর কিংবা ঘন কুয়াশার রাত— তার সঙ্গে পরম যত্নে আগলে রাখা শীতকালীন সংস্কৃতি, শীতের আদি জীবনধারা। ধান কাটা হয়ে গেলে শীতকালে ধানগাছশূন্য ফাঁকা মাঠকে রিক্ত মনে হয়। ‘সোনার তরী’তে তার নিজহাতে কাটা সব ধান নৌকায় তুলে নেওয়ায় কৃষকের মনে রিক্ততা। রাশি রাশি ভারা ভারা ফসল ফলানো মাঠের পাশে দাঁড়ানো সর্বস্বান্ত মানুষ। শীতের ফসলশূন্য মাঠ যখন আকাশের দিকে মুখ তুলে চিৎ হয়ে থাকে, তখন তাকে সত্যিই বড় নিঃস্ব মনে হয়। মনে পড়ে জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত ‘মৃত্যুর আগে’র শুরুর পংক্তি —‘আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষসন্ধ্যায়’। মাঠের গোছা গোছা খড় আকাশের দিকে অস্তিত্ব জানান দিয়ে তখন মৃত মাথা খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে আর সেখানে শেষ পৌষের সন্ধ্যায় হালকা শিশিরে সিক্ততার ভেতরে এক নিঃসঙ্গতা এসে ভর করে। যে পথিক হাঁটছেন ওই মাঠের আল ধরে, তারও নিজেকে সম্বলহীন মনে হয়। প্রান্তরব্যাপী চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা ধানখেতকে এই শীতে মনে পড়তেই পারে। আজও সেখানে শিশির জমে, সেখানে ঘাসে ঘাসে পা ফেলার অনুভূতি হয়।

শীতের বিকেল বড় বেশি ক্ষণস্থায়ী। এই আসে, একটু দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায় আবার। শহরের বিকেলগুলো আরও স্থবির। কুয়াশা যখন চাদর মেলে, চারপাশে কেমন একটা মন খারাপের ছবি আঁকা হয়। দিন মিলিয়ে যাবার বেলায় প্রকৃতি বিষণ্ণ হয় একটু। প্রতি ঋতুর শিক্ষা তো প্রতি ঋতুতেই নিতে হয়। প্রকৃতির মতো মানুষের মনও বদলায়। শীতের শুষ্কতায় প্রকৃতির সবুজ ধূসর হলেও মানুষের কল্পনায়, কবির ভাবনায় তার আবেদন অন‍্য রকম। নজরুলের কবিতায় পাওয়া যায় পৌষের আবাহন গীত। তাতে থাকে বিগত ঋতুর বিদায়-ঝরাপাতাদের বেদনাসিক্ত বিলাপ। শীতের ভালো লাগাটা কবিগুরুর মনে দাগ কাটতে না পারলেও তিনি বিরহের সুর গেঁথেছেন তাঁর কবিতায়। তাতে গাছের শুষ্ক শাখা, জীর্ণ পাতা, কুয়াশার ঘন জাল, হিম হিম ভাব— কোনওটাই বাদ যায়নি। শীতের আগমনকে তিনি বসন্তের জয় হিসেবেই দেখেছেন। ঝরা পালকের কবি জীবনানন্দের কবিতায় কুয়াশার মাঠে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা পরাবাস্তব সংলাপে অনবদ্য হয়ে ধরা দেয়।

অথচ শীত যেন ক্রমেই তার নিজের সত্তা হারিয়ে ফেলছে। মায়াবী গ্রামগুলো ক্রমেই নিষ্প্রাণ জনপদে পরিণত। মানুষ বড় একা। জীবন-জীবিকার প্রাণান্ত দৌড়ে একান্ত সময়গুলো সব বিক্রি হয়ে গেছে। তাই কুয়াশা মোড়ানো ভোরে দূরগামী পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দে যেন বুকের ভেতর ভাঙনের শব্দ ওঠানামা করে। ওরা এই জঞ্জালের নগর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সেই কবেই। মানুষের জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর জীবনযাত্রার তথাকথিত উন্নতির কারণে পরিবেশে যে পরিবর্তন এবং দূষণ, তা মারাত্মক আকার নিয়েছে। শয়ে-শয়ে বহুতল বাড়ি, পথে পথে ব্যস্ততা, মোটরের বিরক্তিকর শব্দ, কর্কশ হর্ন, মোবাইল ফোনের টাওয়ার, শব্দের লাগামহীন ডেসিবেল, পাখিশিকারিদের দৌরাত্ম্য ইত্যাদি সহ্য করতে না পেরে শীতশেষের আগেই ঘরমুখো হয়ে গেছে ‘রিদয় আর খোঁড়াহাঁসের দল’। দূর আকাশে পরিযায়ী পাখিরা যেমন করে নিরবে-নিস্তব্ধে মিলিয়ে যায়, এখন শীতও চলে যায় ঠিক তেমন করেই। তবু বালুচরে নিভৃতে পড়ে থাকা পালকেরা উড়ে যাওয়া হাঁসেদের কথা বললেও শীত যেন কোনও সাক্ষী-ই রেখে যায় না। শীত চলে যায় রিক্ত হাতেই। মাঘের মধ্য সময় থেকেই বইতে শুরু করে ফাগুনের হাওয়া। সে হাওয়ায় গ্রীষ্মের উত্তাপ। প্রকৃতি যেন উলটোপথে বিশ্বাসী এখন।
শীতের স্বাভাবিক কুয়াশা কোথায়? বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, কুয়াশার সঙ্গে দূষণ মিশে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, যা সূর্যের আলোকে ঢেকে দিচ্ছে। এ হল দূষণের আস্তরণ। অতি সাম্প্রতিক খবর বলছে, শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদেশের রাজধানীতে দূষণের কারণে মানুষের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এক লাফে ষাট শতাংশ বেড়েছে।
শীতকালের চিরাচরিত রূপ বদলে গেছে। শীতের তীব্রতা কখনও বাড়ছে, কখনও কমছে। একদিকে যখন তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী শীতের অভাব। শীতকালীন সময় শুধু প্রান্তিক মানুষ বা গ্রামীণ জনজীবন নয়, শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্যও সমস্যা। বিশেষ করে পথশিশু, গৃহহীন মানুষ, অসহায় পশুপাখির জন্য শীত একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শীতের কারণে মৃত্যু তো কোনও নতুন ঘটনা নয়।
রাত পেরোলেই এখন শীতের সকাল। শীতহীন শীত যে ক্ষরণ আঁকে হৃদয়পটে, সে হৃদয় উদাস হয়ে ওঠে বসন্ত বাতাসে। একটা সময় ছিল যখন বিশ্বজোড়া উষ্ণায়ন ছিল না। প্রকৃতিকে নষ্ট করে ছিল না কোনও উন্নয়নের দানবীয় পরিকল্পনা। ঋতু পরিবর্তন হত প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই। শীতের সেইসব গল্প আজ কুয়াশামাখা ভোরের বিষাদগাথা।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *