কাজের ভাষাও পাহাড়ে উন্নতির বাধা 

কাজের ভাষাও পাহাড়ে উন্নতির বাধা 

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


অজন্তা সিনহা

ডিসেম্বরের চরম হিমেল দিনে কলকাতা থেকে পাকাপাকি পা রেখেছিলাম চুইখিমে। কিছুদিন নির্জন প্রকৃতির কোলে আশাপ্রদ নিরুপদ্রব কাটানোর পরেই শুরু হল পাহাড়ের মানুষের আন্দোলন। সেটা ২০১৭। পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চলের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের আন্দোলনের দাবিতে আগুনে চেহারা নিয়েছিল।

এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভাষা। স্থানীয় মানুষজনের ওপর বাংলা ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগটাও তীব্র হয়েছিল, আন্দোলনের অংশস্বরূপ। এই প্রতিবাদের রূপ একসময় জ্বলন্ত রূপ ধারণ করে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একদা ঘনিয়ে ওঠা বাংলা ভাষার প্রতি বিদ্বেষ কি তাহলে ঘরের কাছের এই অতি চেনা পাহাড়ি গ্রাম-শহরে ফিরে এল? এই আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল এলাকাবাসী বাংলাভাষী মানুষ। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। এত আশা করে কলকাতার পাট চুকিয়ে পাহাড়ে এসে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হব, এ তো স্বপ্নেও ভাবিনি!

আমার এই আশঙ্কা সম্পূর্ণ মিথ্যে প্রমাণিত হতে অবশ্য দেরি হয়নি। ভাষা বা কোনও কিছুই পাহাড়বাসীর সঙ্গে আমার দূরত্ব তৈরি করতে পারেনি। প্রতিবেশী পাহাড়ি অন্তর দিয়ে বনধজনিত কারণে উদ্ভূত আমার বাজারহাটের যাবতীয় সমস্যায় এগিয়ে এসেছে। এটা বুঝেছিলাম ভাষার দূরত্ব এখানে সম্পর্কের অন্তরায় নয়। অবশেষে আন্দোলন এবং রাজনৈতিক চাপানউতোরের খেলার ইতি ঘটে ১০৪ দিনের দীর্ঘতম বনধের শেষে। ইতিমধ্যে রাজ্য সরকারও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে জোর করে পাহাড়বাসীর ওপর বাংলা ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ভাবনা থেকে সরে এসেছে। আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে যা খুব ভালো দিক বলে মনে হচ্ছে।

মাতৃভাষা প্রসঙ্গে অধিকাংশ মানুষই অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অংশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলা উত্তরবঙ্গের পাহাড়বাসীর মাতৃভাষা নয়। তাঁরা মূলত নেপালি ভাষায় কথা বলেন। তা বলতেই পারেন। এতে কার কী ক্ষতি! তবে, ভাষা যখন যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, সেখানে মাতৃভাষা কী, তার থেকেও বড় হয়ে ওঠে, এই মানুষজন আদতে কোন ভাষায় যোগাযোগ স্থাপন করবেন ভিনরাজ্যের মানুষজনের সঙ্গে? অর্থাৎ কোনটা হবে তাঁদের কাজের ভাষা! বহু পাহাড়ি তরুণ-তরুণী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে কাজের জন্য। ইংরেজি বা হিন্দি জেনে কাজ করেন। সংখ্যাটার আরও বৃদ্ধি দরকার।

একটি গ্রামে টানা বসবাস করা ছাড়াও আমি দীর্ঘদিন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে বা আধাশহরে ঘুরে দেখেছি, শুধু পথঘাট নয়, ভাষাও ওঁদের উন্নয়নের অন্যতম অন্তরায়। অনেকেই নেপালি ছাড়া অন্য ভাষা জানেন না। কিছুটা ভাঙা ভাঙা হিন্দি বলতে পারলেও ইংরেজি অনেকেরই আয়ত্তে নেই। এদিকে, পর্যটন ব্যবসায় অহরহ ওঁদের বাইরে থেকে আগত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়, যাঁদের মধ্যে নেপালি জানা মানুষ তুলনায় কম।

একইভাবে স্কুলগুলিতে পড়ানোর ক্ষেত্রেও কিছু জটিলতা রয়েছে। এমনিতে ইংরেজিমাধ্যম স্কুলই বেশি। কিন্তু সেখানে শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, অভিভাবকদের মধ্যেকার যোগাযোগের মাধ্যম মূলত নেপালি ভাষা। এর ফলে পাহাড়ের বাইরে যখনই হাইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণের কেন্দ্রে যাচ্ছে এইসব ছেলেমেয়ে, চূড়ান্ত অসুবিধার মুখোমুখি হচ্ছে তারা। তাদের সাহায্য করছে কিছুটা হিন্দি।

পাহাড়কে যদি আমরা রাজ্যের অংশ বলে মনে করি, যদি সত্যি তাঁদের উন্নয়ন চাই, পাহাড়িদের ভাষার দিকটাও ভেবে দেখতে হবে রাজ্য সরকারকে! অন্তত সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে উপযোগী একটি ভাষার প্রচলন এখানে জরুরি। না হলে, পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যেকার দূরত্ব কোনওদিনই ঘুচবে না।

(লেখক শিলিগুড়ির বাসিন্দা। সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *