‘কর্মযোগ’ ও ‘স্বাধীনতা’-র ধারণা দিয়েছিলেন ঋষি অরবিন্দ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত/FEATURED
Spread the love


অরবিন্দ ঘোষ বাস্তববাদী চিন্তাবিদ। অতিপ্রাকৃত শক্তির অস্তিত্ব, কিংবা সভ্যতার ভবিষ্যৎ গঠনে এই শক্তির প্রাধান্যকে মেনে নেননি। বরং ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার চলনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘ঔপনিবেশিক’ ভারত ও ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার ধারণাকে তিনি ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন ‘কর্ম’-র সাপেক্ষে। আজ অরবিন্দ ঘোষের জন্মদিন। লিখছেন বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘মডারেট’ বা নরমপন্থীদের অনুসৃত ‘থ্রি পি’– Prayer বা প্রার্থনা, Petition বা আবেদন এবং Protest বা প্রতিবাদ/শান্তিপূর্ণ আন্দোলন পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অরবিন্দ ঘোষ ঘোষণা করেন যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য ভারতীয়দের ‘কর্ম’-এ লিপ্ত হতে হবে– ঠিক যেমনটি কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন করেছিলেন।

আরও পড়ুন:

ব্রিটিশ শাসন ছিল শোষণমূলক ও মানবতাবিরোধী; তাই এই নিষ্ঠুর শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদে জাতীয়তাবাদীদের প্রত্যক্ষ কর্মপন্থা বা সংগ্রামের পথ বেছে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। একজন ‘কর্মযোগী’ রূপে তিনি কেবল তাত্ত্বিক বা দার্শনিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি গণশক্তিকে সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্য-অভিমুখী ‘কর্ম’-য় রূপান্তরের একটি কার্যকর কাঠামো বা ‘মডেল’ খাড়া করেছিলেন– যা ইতিহাস ‘নব্য জাতীয়তাবাদ’ বা ‘New Nationalism’ নামে খ্যাত।

সহযোদ্ধা বাল গঙ্গাধর তিলকের মতোই অরবিন্দ ঘোষও সেই বার্তার উপর গভীর আস্থাশীল ছিলেন, যা কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকার করায় শিষ্য অর্জুনকে গীতার মাধ্যমে দিয়েছিলেন।

জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার সুবাদে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, মানুষের স্বভাব কেবল বিশেষ মানসিকতার কারণেই ভিন্ন হয় না, বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-মতাদর্শিক অগ্রাধিকারের প্রতি তাদের বিশ্বাসের কারণেও তা পরিবর্তিত হয়– বিশেষ করে যখন সেসব মতাদর্শ কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্যতা পায়। বিশ্বজনীন শক্তিকে সুনির্দিষ্ট কর্মে রূপ দিতে আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা প্রয়োজন।

এই প্রসঙ্গে ‘নব্য জাতীয়তাবাদী’দের উত্থানের পূর্ববর্তী– ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। যেহেতু ‘নরমপন্থী’-রা রাজনৈতিক-মতাদর্শিক সীমাবদ্ধতা ও আর্থ-সামাজিক কুসংস্কার থেকে ভারতের মুক্তির জন্য ব্রিটিশ আধিপত্যকে অপরিহার্য বলে মনে করতেন, তাই গোড়ায় জাতীয়তাবাদীদের বোঝানো কঠিন ছিল যে– প্রচলিত মডেলটি অন্তঃসারশূন্য। তবে ১৯০৭ সালের সুরাট কংগ্রেস তাদের রাজনৈতিক-মতাদর্শিক অবস্থানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, যেখানে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতকেই একমাত্র পথ রূপে মেনে নেওয়া হয়েছিল। ঠিক এমন এক প্রেক্ষাপটেই তাঁর ‘কর্মযোগ’-এর ধারণাটি গড়ে ওঠে।

অরবিন্দ ঘোষ গণশক্তিকে সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্য-অভিমুখী ‘কর্ম’-য় রূপান্তরের একটি কার্যকর কাঠামো বা ‘মডেল’ খাড়া করেছিলেন– যা ইতিহাস ‘নব্য জাতীয়তাবাদ’ বা ‘New Nationalism’ নামে খ্যাত।

সহযোদ্ধা বাল গঙ্গাধর তিলকের মতোই অরবিন্দ ঘোষও সেই বার্তার উপর গভীর আস্থাশীল ছিলেন, যা কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকার করায় শিষ্য অর্জুনকে গীতার মাধ্যমে দিয়েছিলেন। তাই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নতুন ছাঁচে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে, অরবিন্দ ‘গীতা’-র আদর্শিক দর্শনেই ‘কর্ম’-পরিকল্পনাটিকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছিলেন। অরবিন্দের কাছে ‘গীতা’ নিছক আচার-সর্বস্ব ধর্মগ্রন্থ ছিল না; বরং এতে এমন সব ব্যবহারিক নির্দেশনা ছিল, যা মানুষকে নিষ্ঠুরতা, শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। অরবিন্দ মানবসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ রূপে ‘কর্ম’-কে সংজ্ঞায়িত করার পাশাপাশি এর মাধ্যমে বিকাশের একটি পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উত্তরণের উপর জোর দিয়েছেন; যা প্রমাণ করে মানবতাবাদ স্থির বা অপরিবর্তনশীল নয়।

অরবিন্দ ছিলেন বাস্তববাদী চিন্তাবিদ। কখনওই মানবজাতির পথপ্রদর্শক রূপে অতিপ্রাকৃত শক্তির অস্তিত্ব কিংবা মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ গঠনে মানুষের এই শক্তির প্রাধান্যকে মেনে নেননি। অর্থাৎ তিনি বিশ্বাস করতেন: মানব সভ্যতা অনাদিকাল থেকেই একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে– যা দেখে মানুষ অতীতের নজিরবিহীন পরিস্থিতির কারণে অনেক কিছু ভুলে যেতে চেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অরবিন্দ ঔপনিবেশিকতার কথা উল্লেখ করেছেন– তা এমন একটি ঘটনাপ্রবাহ, যা মানবসত্তাকে এক ভিন্ন তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। তবে এর উদ্ভবকে সম্পূর্ণ নতুন কোনও ঘটনা রূপে গণ্য করা ভুল হবে, কারণ মানুষ স্বভাবগতই সংকীর্ণমনা, নির্মম ও পাশবিক হতে পারে এবং অন্যের ক্ষতির বিনিময়ে আনন্দ পেতে পারে। ইতিহাস সাক্ষী, অতীতে মানুষ কীভাবে অত্যাচারী শাসকদের শিকার হয়েছে। এটিও ছিল ‘কর্ম’-র একটি বহিঃপ্রকাশ, যার বিরুদ্ধে ইতিহাসের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। ইতিহাসের চক্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে অরবিন্দ এই তত্ত্ব খাড়া করেন যে, ‘কর্ম’ মানবজাতির একটি পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উত্তরণের রূপরেখা।

অরবিন্দ ছিলেন বাস্তববাদী চিন্তাবিদ। কখনওই মানবজাতির পথপ্রদর্শক রূপে অতিপ্রাকৃত শক্তির অস্তিত্ব কিংবা মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ গঠনে মানুষের এই শক্তির প্রাধান্যকে মেনে নেননি।

‘কর্ম’-র তুলনামূলক স্থিতিশীল চরিত্রকে তিনটি বৈশিষ্ট্য দ্বারা চিহ্নিত করা যায়– প্রথমত, যেহেতু মানবেতিহাস সর্বদা পরিবর্তনশীল, তাই সুনির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে এর পরিবর্তনশীল প্রকৃতিকে সহজেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। ঔপনিবেশিকতা ছিল মানব অস্তিত্বের একটি বিশেষ পর্যায়ের ফসল; সময়ের আবর্তে এর বিলুপ্তি প্রমাণ করে যে, কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর পাশবিকতার বিরুদ্ধে সর্বদা প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, যার ফলে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা জাতিগুলি ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করে। মানবজাতির একটি অংশের দ্বারা অন্য অংশের শোষণের পক্ষে থাকা শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দঁাড়ানোর ক্ষেত্রেও সেই পরম শক্তির প্রকাশ ঘটেছিল।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি এই বিষয়ের উপর জোর দেয় যে, পরস্পরবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও ‘কর্ম’ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। অরবিন্দ এই দাবির সপক্ষে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের উদাহরণ টেনেছেন। তাঁর মতে, ‘কর্ম’ পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসম্পন্ন ভারতীয়দের একই কাতারে নিয়ে এসেছিল; কারণ যারা ব্রিটিশ অনুগত ছিল, এবং যারা ছিল না– উভয়পক্ষই তাদের নিজ-নিজ ‘লক্ষ্য’ অর্জনের জন্য লড়াই করেছে। যদি এমনটি না হত, তবে তারা একে-অপরের সংস্পর্শে আসত না। একইভাবে, ‘কর্ম’-ই জাতীয়তাবাদীদের ব্রিটিশ শাসকদের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছিল– যা ঔপনিবেশিক শাসকদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভারতে আগমন না-ঘটলে অসম্ভব ছিল।

তাঁর চিহ্নিত তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি ছিল এই যে, ‘কর্ম’ এমন পরিস্থিতির উন্মেষ ঘটায় যার মধ্য দিয়ে মানুষের পূর্ণ ‘বিকাশ’ সম্ভব। অরবিন্দ এই যুক্তির ভিত্তি গড়েছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনাধীন প্রজা রূপে এবং পরে পুদুচেরিতে একজন সাধক রূপে অর্জিত অভিজ্ঞতার উপর।

ঔপনিবেশিক প্রজা রূপে তিনি ‘কর্ম’-র দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ক্ষেত্রে ‘স্বাধীন’ ছিলেন না, পরাধীনতার কারণে তাঁর ভূমিকাও ছিল সীমাবদ্ধ; কিন্তু পুদুচেরিতে অভিজ্ঞতা হল ভিন্ন, কারণ (ক) সেখানে তিনি আর সরাসরি ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন না, এবং (খ) ফলে তঁার ‘ভূমিকা’ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। দু’টি ভিন্ন পরিবেশে অবস্থান করা সত্ত্বেও, তিনি সেসব কাজই করেছিলেন, যা তিনি নিজের ও আশপাশের মানুষের জন্য উপযুক্ত মনে করেছিলেন। নিজের করণীয় নির্ধারণে তাঁর যেন কোনও ভূমিকা ছিল না; কারণ তাঁর ‘কর্ম’ মূলত আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল– জীবনের কোনও নির্দিষ্ট মুহূর্তে যা আত্ম-পরিপূর্ণতার জন্য প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হত, তার উপর ভিত্তি করে নিরূপিত।

সুতরাং, ‘কর্ম’– মানুষকে বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ বা মহাজাগতিক সত্তার প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। মানুষ যে প্রেক্ষাপটে জন্মগ্রহণ করে ও বেড়ে ওঠে, তা তাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপাদান বা রসদ জোগায়। অরবিন্দের মতে, প্রেক্ষাপট-নির্ভর উপাদান এবং অন্তরাত্মা থেকে প্রাপ্ত সংকেতের মধ্যে যে-ব্যবধান বা সংঘাত দেখা দেয়, তার কারণ প্রথমোক্তটির (অর্থাৎ, বাহ্যিক প্রেক্ষাপটের) আধিপত্য; স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, ‘কর্ম’ নির্ধারিত হত ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সাড়ার উপর ভিত্তি করে। যদি পরিস্থিতি ভিন্ন হত– অর্থাৎ ‘কর্ম’ যদি অভ্যন্তরীণ সাড়া অনুযায়ী না হত– তবে বুঝতে হবে, ব্যক্তিটি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরের কারণে ‘সীমাবদ্ধ’ বা ‘বাধাপ্রাপ্ত’ হয়েছে।

এটি ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, কারণ মানুষের মন কখনওই পুরোপুরি ‘স্বাধীন’ থাকে না; বরং তা নানা বিষয় দ্বারা প্রভাবিত বা শর্তযুক্ত হয়– যার কিছু আসে বাহ্যিক পরিস্থিতি থেকে এবং কিছু আসে নিজের ভিতর থেকে। তাই মানুষের ‘কর্ম’ নির্ধারিত হয় এমন সব প্রক্রিয়ার সংমিশ্রণে, যা একদিকে মানুষ যে-পরিবেশে কাজ করে সেখান থেকে উদ্ভূত হয়, এবং অন্যদিকে তাদের অন্তরাত্মা থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। অরবিন্দ এখানে একটি সতর্কবার্তাও যোগ করেছিলেন: কর্মকে এই সংমিশ্রণের নিখুঁত প্রতিফলন রূপে গণ্য করা ভুল। কোনও নির্দিষ্ট কর্মপন্থা বেছে নেওয়ার মুহূর্তে মানুষ সবসময়ই যে তার ফলাফল সঠিকভাবে বিচার করতে প্রস্তুত থাকে, তা নয়; মানুষ বরং কোনও পথকে সর্বোত্তম মনে করে তা বেছে নেয় ঠিকই, কিন্তু পরে সমস্ত সম্ভাব্য বিষয় বিবেচনা করলে দেখা যেতে পারে যে, সিদ্ধান্তটি আসলে সঠিক ছিল না। তাই অজ্ঞতার প্রতিও যথাযথ মনোযোগ দেওয়া উচিত।

(মতামত নিজস্ব)

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *