পংক্তিসমূহ
মনোনীতা চক্রবর্তী
তৃতীয় পংক্তি থেকেই ভয়ংকর ওলটপালট;
পঞ্চম পংক্তিতে নির্বিকার নিরস্ত্র সময়।
অনিশ্চিত শোভন আঁকে দশম পংক্তি।
এরপর অলৌকিক শ্রীক্ষেত্র,
ঘাটের কথা। পারের কথা।
প্রতিটি পংক্তিরই নিজস্ব কিছু গল্প থাকে
প্রতিটি অসংযত সংলাপের ভিতর
আহত ফণা ও বাসি- বিষয় থাকে।
প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ, অষ্টম,
নবম পংক্তিসমূহ চরিত্র সাজায়।
আমরা সম্পর্ক লিখি
আকাশবাণী
হিমাদ্রি শেখর দে
রোদ্দুর বাইরে চড়তে থাকলে
মেয়েটি জানলা বন্ধ করে ঘরের ভিতর বসে,
কোনও ফাঁক ঠেলে তবুও রোদ্দুর
চুইয়ে লেগেছে ওর পায়ে, এরপর
আনমনে পায়ের উপর পা তুলে বসে
আরও কিছু বিবশ রোদ্দুর মাখে,
এখন ওর মুখের মধ্যে ইতস্তত আলো
একটা কলম গুঁজে রাখা
কালো ফুল স্লিভের সাথে বুকের কাছে,
একপ্রান্তের খানিক কালো কেশপাশ ঠেলে
বেরিয়ে আসছে কানের লতার ঈষৎ সাদা দ্যুতি
চিবুকের অন্ধকার রেখার ঠিক উপরে
নীচের ঠোঁট পিরিচের মতো,
মেয়েটি তাকিয়ে আছে সমুখে
চোখের পাতায় উন্মন সতেজ দৃষ্টি,
আজ সারাদিন মেঘলা আকাশ
ভারী ও বজ্রপাত সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রাতের দিকে।
দিগন্তের ভাষা
দেবশ্রী দে
মেয়েটা কবিতা লিখছে
আপেল-ঘরানায় ছুরির ফলার মতো
আঁচল বেয়ে যুবতী সন্ধ্যা নামছে
ঠোঁট বেঁকে যাচ্ছে
কেউ কেউ তাকে জানে
বোঝে তার লেখাদের ভাষা
মুহূর্তে খুলে নিতে পারে ভদ্রতা
সে কবিতা লিখছে
তোমাকে ধর্ষণ চেনাবে বলে
দিগন্তচেরা লাল রঙে
মিশিয়ে দিচ্ছে শরীর
ছাইপাঁশ
সুদীপ চৌধুরী
স্বপ্নগুলো এমনিভাবেই ভাঙতে থাকে রোজ
কেউ রাখে না খোঁজ।
আলুথালু জীবন মঞ্চে ঝাপসা চোখের আলো
এমনি করেই গল্প শুরু, আজ নয় কাল ভালো।
আলু ভাতের দিন যাপনে বিস্বাদ থালা বাটি
আগুন-মানুষ জীবন-ফানুস এক টুকরো রুটি।
নিজের ছায়ার সাথে কেবল লুকোচুরি খেলা
নিজের সাথে নিজের মতো মিথ্যে ছলাকলা।
চাঁদের হাসি তাও ও বাসি বাসি থালাবাসন
কাল যা ছিল আজ ছলনায় তারই নিমন্ত্রণ।
সুখের ছোঁয়ায় দুঃখ জাগে সুখের প্রলোভন
বিপন্নতার অন্ধকারে ভিজছি সারাক্ষণ।
অন্বেষণ
সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়
ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে
মৃত্যুর সংলাপ।
এখানে কেউ কথা বলে না,
পাশাপাশি শুধু সময় মাপে।
জীবন শুরুর পথ এখানে
থমকে যায়
সামনে বাঁধাহীন দোদুল্যমান সাঁকো ।
তবুও আমরা বসন্ত খুঁজি।
নৈশ-শামিয়ানা
স্বপ্ননীল রুদ্র
বেদেনিদের মতন পরিশ্রান্ত মেঘ-পরিবার
তিস্তা ছাড়িয়ে আরও সুদূর পূর্ব দিকের অজানা
কোনও প্রদেশের থেকে হেঁটে এসেছে, মাথা গোঁজার
ঠাঁই খুঁজে হয়রান…দিয়েছি ছাদ, করিনি মানা
ছাদের উপরে তারা শ্লেটরঙা শামিয়ানা টাঙিয়ে
শীতল পাটি পেতেই শুয়ে পড়ে, গড়ায় আরামে
দীর্ঘ হাঁটার পদবেদনা মুড়েছে বিশ্রাম দিয়ে
সন্ধ্যার আকাশে ইস্তাহার বিলি করে ভেজা খামে
যত সব বজ্রপাত আমন্ত্রিত রাত্রির সভায়
সভা ভেঙে গেলে তারা সুনিবিড় কোলাকুলি করে
অনন্ত শূন্যতা জুড়ে বারিতোপ কামান গর্জায়
সমস্ত রবীন্দ্র-বর্ষাগান যেন আজ নিশা-চরে
গীতবিতানের পাতা খুলে আমি চেয়ে নিই ক্ষমা
নাদীমেঘ আরও ঢেলে দেয় যত জল আছে জমা…
ওড টু দ্য রেইন
সাহানুর হক
এরকম কারসাজি কার জন্য? বৃষ্টিই জানে সেই কথা
অসময়ে টিনের চালে ঝমঝমিয়ে মুখরিত রিংটোন
মাঝে মাঝে ভেঁপুতে ফুঁ দেয় সহভাগী মেঘ, দ্রুম শব্দে
আঁধার কাঁদে বিদ্যুৎ চমকিয়ে, বজ্রপাত হয়
এও কি সম্ভব হল?
কতটা সহজ ছিল আঁধারের এই কান্না?
শিউলিরা সব ঝরে পড়ছে এক এক করে, উঠোনে
আঁচল পেতে সেগুলি কুড়িয়ে নিচ্ছে ভেজা ভেজা কাদা মাটি
গর্ভবতী মায়ের মতোই অনন্ত সাধক ঘরভর্তি তার দুঃখ
তাই বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করা সময়ের আশ্চর্য এই উপহার
এ কথা আমি বলছি না, একদিন আঁধার বলেছিল কানে কানে
আমি তাই মধ্যরাতের নিগূঢ় ঘোরে বাইরে দৌড়ে যাই
শুয়ে পড়ি উন্মত্ত বৃষ্টিতে বাড়ির আঙিনায়
বৃষ্টিকে আগলে রাখতে দুই হাত মেলে ধরি আকাশের দিকে
বৃষ্টি আমাকে ছুঁয়ে কিছুদূর গড়িয়ে যায়, আমি বৃষ্টিকে ছুঁয়ে কিছুদূর
আমাদের এই একাত্ম হয়ে যাওয়ার মাঝে কেউই থাকে না
যতটুকু বিরহ, ততটুকু রূপকথা, এটুকুই জীবন!
পায়েল
পঙ্কজ কুমার ঝা
আমার পায়ে যে পায়েলটি বাঁধা,
সে শুধু অলংকার নয়,
একটা বন্ধন —
মিষ্টি সুরের মতো শব্দ করা এক শৃঙ্খল।
যখন আমি
জনসমুদ্রে একা হয়ে যাই,
অথবা নিঃসঙ্গতায়
নিজের সঙ্গে কথা বলি,
তখন সেই মৃদু ঝুনঝুন
আমার পথ আটকে দেয়,
বলতে থাকে —
‘থেমে যাও, তুমি নারী।’
আমি জন্মেছিলাম
নগ্ন, নিষ্পাপ,
পায়ে কোনও পায়েল ছিল না।
তবে কে পরিয়ে দিল এই পায়েল?
কে দিল এই মিষ্টি সুরের আওয়াজ
যা প্রতিটি পদক্ষেপে
আমাকে মনে করিয়ে দেয়
আমার সীমারেখা?
যখন আমি তার সঙ্গে
নিঃশব্দে কথা বলি,
সে বলে —
‘আমি সেই রেখা
যা তুমি অতিক্রম করতে পারবে না।
আমি তোমার সৌন্দর্য নয়,
তোমার শালীনতা।
আমি তোমার পরিচয় নয়,
তোমার বন্ধন।
আমি তোমার পায়েল।’
The publish কবিতা appeared first on Uttarbanga Sambad.
