- রামসিংহাসন মাহাতো
ঘটনাস্থল রায়গঞ্জ কলেজ লাইব্রেরি। সেই সময়ে লাইব্রেরিয়ান ছিলেন পীযূষকান্তি ঘোষ। তাঁর তিনটে শখ ছিল। জর্দা দেওয়া পান খেতে খুব ভালোবাসতেন। আর যে ঘরে বসতেন সেখানে দামি ধূপকাঠি জ্বালাতেন। মোটা মোটা বইয়ে ঠাসা সারা ঘর সেই ধূপকাঠির গন্ধে ম-ম করত। আর একটা শখ ছিল, যেখানে যেতেন সেখানে চোখে পড়ার মতো কলম দেখলেই তা সংগ্রহ করতেন। সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর গভীর অনুরাগ এবং রসবোধ ছিল। সেই সূত্রেই মাঝেমধ্যে তাঁর ঘরে যেতাম। ঘরে গেলে জানতে চাইতেন, এখন ক্লাস আছে কি না। না থাকলে বসতে বলতেন। কী লিখছি দেখতে চাইতেন। একদিন জানালেন, কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কলেজে আসছেন। তাঁকে নিয়ে দুটো অনুষ্ঠান হবে। তার একটা হবে কলেজ লাইব্রেরিতে। কবিতা পাঠের আসর। বললেন, ‘তোমাকেও কবিতা পড়তে হবে।’ আমি তখন উলঙ্গ রাজার কবিকে সামনাসামনি দেখার জন্য দু’পায়ে খাড়া।
অনুষ্ঠান হল। কবিতাও পড়লাম। কবিতা শুনে উলঙ্গ রাজার কবি প্রশংসাও করলেন। আমার তখন কলেজে টিআরপি চড়চড় করে চড়ছে। পরদিন লাইব্রেরিতে যেতেই পীযূষদা পাকড়াও করলেন। বললেন, ‘কবিতাটি এনেছ?’ ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘আবার পড়ো।’ কাঁধের সাইড ব্যাগ থেকে খাতা বের করে পড়লাম।
শুনে বললেন, ‘মানে কী?’
আমি বললাম, ‘কীসের?’
পীযূষদা বললেন, ‘ওই যে লিখেছ, খেতের মধ্যে ভেজা কালো পাথরে বসতে গিয়েও কাক ফিরে গেল। বসল না।’
আমি বললাম, ‘বসবে কী করে? ওটা তো পাথর নয়, কৃষকের ঘামে ভেজা পিঠ। কাকটা খালি গায়ে কৃষকের পিঠকে পাথর ভেবেছে।’
পীযূষদা চশমা খুলে আমার মুখের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘লেখার জন্য এই দেখার চোখটা খুব জরুরি।’ তারপর ড্রয়ার খুলে আমার হাতে দিলেন কাঠের কারুকাজ করা লাল গালার ওপর অজস্র পাথর বসানো একটি খুব সুন্দর কলম। একেবারে রাজা বাদশাদের হাতে শোভা পাওয়ার মতো। সে আমার কবিতার প্রথম স্বীকৃতি। ভালোবাসার এই কলমের কাছে নোবেল তখন তুচ্ছ।
বাঁশের কঞ্চি
কথায় আছে, ‘কলমে কায়স্থ চিনি, গোঁফে রাজপুত। বৈদ্য চিনি তারে, যার ওষুধ মজবুত।’ ছোটবেলায় এই কলমকে বাগে আনতে আমাদের ঝকমারির শেষ ছিল না। বিশেষ করে ড্রপার ছাড়া দোয়াত থেকে কলমে কালি ভরা ছিল খুবই দিকদারি ব্যাপার। সাবধানে কালি ভরতে গেলেও একটা বাবল তৈরি হতই। একহাতে কলম, আর এক হাতে দোয়াত। সেই বাবলকে ফুঁ দিয়ে ফাটাতে গেলে কালি ছিটকে চোখে-মুখে-নাকে লাগত। কলমে কালি ভরা শেষ হলে দেখা যেত দু’হাতেই কালি লেগে গিয়েছে, নীচেও কয়েক ফোঁটা পড়েছে। সেসব মোছামুছির পালা শেষ হত অভিভাবকদের বকাঝকার মধ্যে দিয়ে। এসব সামলানোর জন্য আমাদের দোয়াতের সঙ্গেই থাকত এক টুকরো ন্যাকড়া। আর পরীক্ষার সময় কলম ঝাঁকানোর সময় বেশি কালি খাতার ওপর ঝুপ করে পড়ে গেলে তার জন্য স্কুল থেকে দিত এক টুকরো ব্লটিং পেপার।
এইসব দিনে মিলনপাড়া প্রাইমারি স্কুলের নির্মল নন্দী মাস্টারমশাইয়ের কলমকে বড়লোক বাড়ির সুন্দরী বৌ বলে মনে হত। কি সুন্দর সোনালি আর খয়েরি তার গায়ের রং। আমাদের মতো খাপখোলা বেহায়া উদলা নিব নয়। একেবারে গলা পর্যন্ত ঢাকা ভদ্র সভ্য পাইলট। তার দাগও বড় মসৃণ আর মায়াবী। আমাদের কলমের মতো থ্যাবড়ানো নয়। মনে মনে ভাবতাম বড় হলে ওই ধরনের একটা সুন্দর কলম কিনবই।
কুমারডাঙ্গির করিম চাচার কাছে শিখেছিলাম কলমের অন্যরকম পাঠ। রায়গঞ্জ পুরসভা ভবনের পাশের গলিতে তিনি থাকতেন। তাঁর কাছে গিয়েছিলাম উর্দু শিখতে। তিনি আরবি বর্ণমালা লেখার জন্য বাঁশের কঞ্চি দিয়ে আমাকে একটা কলম বানিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দেখছ না, হরফগুলো কেমন নীচে মোটা দাগ আর উপরে সরু। সেই কলম হাতে নিয়ে আরবি লেখা প্র্যাকটিস করতে গিয়ে তখনও বুঝিনি আমি কয়েক হাজার বছর পেছনে চলে গিয়েছি। এই কলম আসলে প্রাচীন ভারতের অবদান। ভারতে ও মিশরে একসঙ্গে ব্যবহৃত হত খাগের কলম বা বাঁশের কলম। প্রাচীন ভারতীয় লেখকরা তালপাতা বা ভূর্জপত্রে এই কলম দিয়ে সংস্কৃত শ্লোক ও বেদের অংশ লিখতেন। এ থেকেই তৈরি হয় ফারসি শব্দ কালাম (Qalam) যার অর্থ কাটা বাঁশের কলম। ইসলামিক ও পারসিক সংস্কৃতিতে Qalam মানে শুধু লিখন যন্ত্র নয়, এর মানে ক্যালিগ্রাফি শিল্পও। আরবি বর্ণমালা শেখানোর জন্য বাঁশের কঞ্চির কলম যেভাবে কেটে দিয়েছিলেন করিম চাচা আজও সেভাবেই খাগের কলম কাটা হয় সরস্বতীপুজোর জন্য।
বাবার বোধ
তখন বিদ্যাচক্র স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ি। সন্ধ্যাবেলা চাটাই পেতে হ্যারিকেনের আলোয় বাড়ির বারান্দায় পড়তে বসেছি। দেবনাগরী অক্ষর জানা বাড়িতে আমি তখন সবচেয়ে বেশি বাংলা অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন পুরুষ মানুষ। বাবা এক বান্ডিল পুরোনো কাগজ সামনে রাখলেন। বললেন, ‘এটা বাড়ির দলিল। এর মধ্যে থেকে বাড়ির চৌহদ্দিটুকু শুধু আলাদা কাগজে লিখে দিতে হবে।’ ভাব দেখে বুঝলাম তাঁর জরুরি দরকার আছে। আমি ওই দলিল উলটেপালটে কলম হাতে নিয়ে থরথর করে কাঁপছি। কোথাও বাড়ির চৌহদ্দি খুঁজে পাচ্ছি না। পাশে বসে মামা তাঁর মাছের ব্যবসার হিসাব মেলাচ্ছিলেন। আমার পরিস্থিতি দেখে বললেন, ‘জামাইবাবু দলিলের লেখা ও বোধহয় উদ্ধার করতে পারছে না।’ বাবা বুঝলেন, ‘আমাকে লেখাপড়া করানোটা খুব একটা কাজে লাগছে না। ভবিষ্যতে লাগবে কি না তা নিয়েও তিনি সন্দিহান।
আমার এখন মনে পড়ে চার হাজার বছর আগে লেখা আরেক বাবার চিঠির কথা। তখন কলম মানে কাঁচা অবস্থায় মাটির ফলকে দাগ দেওয়ার গাছের ডালের বা লোহার একটা শলাকা। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয় এক বাবা অন্য অনেকের মতো মাটির পাতে লেখালেখির কাজ করতেন। এইসব লেখালেখির কাজ হত কিউনিফর্ম লিপিতে। দিন গুজরানের কাজের ফাঁকেই এ নিয়ে তাঁর এক বোধ জন্ম নেয়। এক ফলকে তিনি তার কিশোর ছেলের উদ্দেশ্যে লেখেন, ‘আমার ছেলে, মনোযোগ দিয়ে লেখার বিদ্যা শেখো। যে লেখে, সে অন্যকে নির্দেশ দিতে পারে। কিন্তু যে লেখে না, সে অন্যের নির্দেশ মানে।’ লেখালেখি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাবাণী করতে গিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘লেখাই জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়। লেখকরা রাজাদের পাশে বসেন। তাঁদের লেখা দূরদেশে পৌঁছে যায়। একদিন পৃথিবীর সবকিছু বদলে যাবে, কিন্তু লেখা চিরকাল অমর থাকবে।’
কলম ও যুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইজেনহাওয়ার জার্মান বাহিনীর আত্মসমর্পণের নথিতে স্বাক্ষর করলেন। যে কলম দিয়ে স্বাক্ষর করলেন সেটি ছিল একটি পার্কার কলম। তার কয়েক মাস পর জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার জাপানের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের নথিতে সই করেন। সেই কলমও ছিল একটি পার্কার। প্রথমটি ছিল পার্কার ৫১ এবং পরেরটি পার্কার ডুওফোল্ড। সন্দেহ নেই এই দুই কলমের খোঁচায় পৃথিবীতে শান্তি ফিরেছিল। কিন্তু রোমে তা হয়নি। রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার বিশ্বাস করতেন যে কলমে তিনি সাম্রাজ্যের আইন লিখেছেন, জীবনের যুদ্ধে সেই কলমই হবে তাঁর ঢাল।
তখনকার কলম ছিল ব্রোঞ্জের তীক্ষ্ণ শলাকা। তার পোশাকি নাম ছিল স্টাইলাস। খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সালের ১৫ মার্চ। স্থান : রোমের সেনেট ভবন। সেনেটর ক্যাসিয়াস একটি পত্র বাড়িয়ে দেন। বলেন, ‘এ কাগজ জনগণের আবেদন, সিজার। একবার দয়া করে দেখুন।’ ষড়যন্ত্রকারীরা গোপনে একে অপরকে ইঙ্গিত করলেন। কাসকা, ব্রুটাস, ক্যাসিয়াসের মুখ গম্ভীর। সিজার পড়তে যান, হঠাৎ কাসকা পিছন থেকে ছোট ছুরি তোলে। সিজার টের পেয়ে ফিরে তাকান। চমকে দেখেন কাসকা। কাসকার আঘাত কাঁধ ছুঁয়ে যায়। সিজার দ্রুত পোশাকের ভেতর থেকে ব্রোঞ্জের স্টাইলাস বের করে স্টাইলাসটি কাসকার হাতে আঘাত করেন। কাসকা চিৎকার করে পিছিয়ে যায়। মুহূর্তেই অন্য সেনেটররা সম্রাটকে আক্রমণ করে। সিজার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরিণতিতে অবধারিত গৃহযুদ্ধের পর রোম সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। কলম বাঁচাতে পারেনি রোমকে।
