কংক্রিটের লোভে বিপন্ন ভবিষ্যৎ

কংক্রিটের লোভে বিপন্ন ভবিষ্যৎ

ব্লগ/BLOG
Spread the love


(অন্ধের মতো জলাভূমি ভরাট, বৃক্ষনিধন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের জেরে বর্ষার শহরগুলো আজ এক ভয়ংকর পরিবেশগত ও স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে)।

কৌশিক কর্মকার

শহরের আকাশে ঘন কালো মেঘ জমলেই আজকাল মানুষের মনে এক অদ্ভুত ত্রাস সঞ্চারিত হয়। বৃষ্টি নামার রোমান্টিসিজম এখন আর মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে জায়গা পায় না; বরং তার বদলে জায়গা করে নেয় এক বুক অজানা আতঙ্ক। গত কয়েক দশকে আমাদের দেশের শহরগুলোর চরিত্র এমনভাবে বদলে গিয়েছে যে, সামান্য বৃষ্টিতেই নাগরিক জীবন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে যায়। প্রশাসনের দুর্নীতি আর পরিকাঠামোর অভাব নিয়ে আমরা বিস্তর আলোচনা করি ঠিকই, কিন্তু যে নীরব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ধ্বংসলীলা আমাদের শহরগুলোকে তিলে তিলে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করছে, তা নিয়ে আমরা বড়ই উদাসীন। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম খামখেয়ালিপনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের আত্মঘাতী নগর পরিকল্পনা। এই দুইয়ের মারাত্মক ককটেল আজ শহরগুলোকে কার্যত অবাসযোগ্য করে তুলেছে। প্রকৃতির নিজস্ব ভারসাম্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমরা যে কংক্রিটের অহংকার তৈরি করেছি, আজ সেই অহংকারই আমাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে কোনও শহরের ভৌগোলিক গঠনের একটি নিজস্ব প্রাকৃতিক নিকাশি ব্যবস্থা থাকে। নদী, খাল, বিল এবং বিশাল আকৃতির জলাভূমিগুলো শহরের ‘স্পঞ্জ’ বা অতিরিক্ত জল শুষে নেওয়ার প্রাকৃতিক আধার হিসেবে কাজ করে। কলকাতা শহরের পূর্ব দিকের সুবিশাল জলাভূমি এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই জলাভূমিগুলো শুধু যে শহরের অতিরিক্ত জল ধারণ করত তা নয়, প্রাকৃতিকভাবে শহরের তরল বর্জ্য পরিশোধনের কাজও করত অত্যন্ত নিপুণভাবে। কিন্তু গত দুই দশকে রিয়েল এস্টেট মাফিয়াদের আগ্রাসনে এই প্রাকৃতিক আধারগুলো আজ কার্যত বিলুপ্তির পথে। আইনের চোখে ধুলো দিয়ে, রাতের অন্ধকারে মাটি ফেলে দিনের পর দিন বোজানো হয়েছে বিঘার পর বিঘা জলাজমি। আর সেই নরম মাটির ওপর মাথা তুলেছে আকাশছোঁয়া সব আবাসন। জল যাওয়ার প্রাকৃতিক পথগুলোকে কংক্রিট দিয়ে চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়ার পর, যখন বৃষ্টির জল রাস্তায় জমে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন আমরা আকাশপানে চেয়ে ভগবানকে দোষারোপ করি। অথচ নিজেদের হাতে প্রকৃতির স্পঞ্জটিকে ধ্বংস করে আমরাই এই কৃত্রিম বন্যার জন্ম দিয়েছি। যে শহর তার নিজস্ব জলাভূমিগুলোকে রক্ষা করতে পারে না, তাকে ডোবার হাত থেকে কোনও আধুনিক পাম্পিং স্টেশন বাঁচাতে পারবে না, এটাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম।

এই অপরিকল্পিত নগরায়ণের আর একটি বীভৎস দিক হল শহরের সবুজের অবলুপ্তি। আধুনিকায়নের নামে এবং রাস্তা চওড়া করার অজুহাতে আমরা শহরের ফুসফুসগুলোকে নির্বিচারে কেটে সাফ করেছি। যে ক’টি পুরোনো এবং বিশাল গাছ এখনও শহরের বুকে কোনওক্রমে টিকে আছে, তাদের প্রতি আমাদের আচরণ আরও নির্মম। ফুটপাথ বাঁধাই করার সময় গাছের গোড়া পর্যন্ত নিরেট কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। ফলে গাছের শিকড় মাটির নীচে ছড়ানোর বা পর্যাপ্ত জল ও পুষ্টি সংগ্রহ করার কোনও জায়গা পায় না। শিকড় দুর্বল হয়ে পড়ায় সামান্য কালবৈশাখী বা বর্ষার ঝোড়ো হাওয়ায় সেই বিশাল গাছগুলো শিকড় সমেত উপড়ে পড়ে। রাস্তায় চলন্ত গাড়ি বা পথচারীদের ওপর গাছ পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা আজ আর কোনও নতুন খবর নয়। আমরা প্রকৃতির স্বাভাবিক শ্বাস রোধ করে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছি, আর অন্যদিকে কংক্রিটের জঙ্গলে বসে গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে বড় বড় সেমিনার করছি।

বর্ষার এই জল জমার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে এক বিশাল ‘রোগের অর্থনীতি’ বা ডিজিজ ইকনমি। বৃষ্টি শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেশের শহরগুলোতে ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া এবং টাইফয়েডের মতো মশাবাহিত ও জলবাহিত রোগের বিস্ফোরণ ঘটে। আর এই মরশুমেই ফুলেফেঁপে ওঠে শহরের কর্পোরেট হাসপাতাল এবং প্যাথলজি ল্যাবগুলোর ব্যবসা। জমা জলে মশার লার্ভা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে পুরসভাগুলোর চরম অপদার্থতা আজ আর কারও অজানা নয়। মশা মারার ধোঁয়া ছড়ানো বা ব্লিচিং পাউডার ছেটানোর যে ছবি আমরা খবরের কাগজে দেখি, তা আসলে এক চূড়ান্ত আইওয়াশ। কোটি কোটি টাকার কীটনাশক কেনার টেন্ডার পাশ হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। ফলে প্রতি বছর বর্ষা মানেই ঘরে ঘরে জ্বরের প্রকোপ, হাসপাতালে বেড না পাওয়ার হাহাকার এবং চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে মধ্যবিত্তের চরম আর্থিক সংকট। প্রশাসন শুধু ডেঙ্গিতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান লুকোতেই ব্যস্ত থাকে, কিন্তু ডেঙ্গির আঁতুড়গুলো ধ্বংস করার কোনও বিজ্ঞানসম্মত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তাদের কাছে নেই। মানুষের জীবনের বিনিময়ে গড়ে ওঠা এই চিকিৎসা ব্যবসার রমরমা দেখলে শিউরে উঠতে হয়।

এই নাগরিক বিপর্যয়ের আরও একটি মর্মান্তিক দিক হল এর আর্থসামাজিক বৈষম্য। শহরের রাস্তায় যখন কোমরসমান জল জমে, তখন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এসইউভি গাড়িতে বসে থাকা বিত্তবান মানুষটি হয়তো ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন। কিন্তু এই জমা জল শহরের দরিদ্র প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনে এক ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে নেমে আসে। বস্তিগুলোতে যখন নর্দমার জল ঢুকে পড়ে, তখন দিনমজুর, রিকশাচালক বা ফুটপাথের হকারদের সারা জীবনের সামান্য সঞ্চয়টুকুও নষ্ট হয়ে যায়। কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে, দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বর্ষার এই কয়েকটা দিন তাঁদের কাছে বেঁচে থাকার এক কঠিন লড়াই। শহরের উন্নয়ন বা স্মার্ট সিটির গালভরা প্রতিশ্রুতিগুলো এঁদের কাছে এক নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে এঁরাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

আর দুর্যোগ এলেই শুরু হয়ে যায় রাজনীতিকদের এক জঘন্য উৎসব— ত্রাণের রাজনীতি। বুকসমান জলে দাঁড়িয়ে কয়েকটা সস্তার ত্রিপল আর শুকনো খাবারের প্যাকেট বিলি করার ছবি ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়ে তোলার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সাধারণ মানুষের চরম দুর্গতির সুযোগ নিয়ে নিজেদের মসিহা হিসেবে প্রমাণ করার এই নির্লজ্জ পিআর এক্সারসাইজ আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক চরম অবক্ষয়। মানুষের অধিকারকে ভিক্ষে হিসেবে তাদের হাতে তুলে দিয়ে রাজনীতিকরা বোঝাতে চান যে তাঁরা কতটা দয়ালু। অথচ যে নিকাশি ব্যবস্থা ঠিক থাকলে মানুষটার এই অবস্থাই হত না, সেই আসল কাজটা করার কোনও তাগিদ কারও নেই। আমরা বিপর্যয়কে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি, আর ত্রাণ পাওয়াটাকে সরকারের দয়া বলে ভাবতে শুরু করেছি।

এই সর্বনাশা পথ থেকে ফিরে আসার সময় হয়তো ইতিমধ্যেই পেরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু ধ্বংসের গতি কমানোর সুযোগ এখনও আছে। এর জন্য প্রয়োজন এক আমূল মানসিকতার বদল। নগর পরিকল্পনাকে শুধু ইটের পর ইট সাজানোর ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে দেখলে চলবে না; একে দেখতে হবে এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তুতান্ত্রিক বা ইকোলজিক্যাল প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে। জলাভূমি ভরাট সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং বেদখল হয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক জলপথগুলোকে যে কোনও মূল্যে উদ্ধার করতে হবে। প্রকৃতিকে তার নিজের স্পেস বা জায়গা দিতেই হবে। আমরা যদি প্রকৃতির সীমানাকে সম্মান না করি, তবে প্রকৃতি একদিন তার রুদ্রমূর্তিতে আমাদের সমস্ত কংক্রিটের দম্ভ গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজের জমি ঠিক ছিনিয়ে নেবে। তখন কোনও অজুহাত বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতিই আমাদের বাঁচাতে পারবে না।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *