ঐতিহ্যে কালি লাগালেন নকল রাজা

ব্লগ/BLOG
Spread the love


শুভঙ্কর চক্রবর্তী

কোচবিহারের প্রকৃত রাজারা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, রুচিশীল এবং অত্যন্ত প্রগতিশীল মানসিকতার অধিকারী। রাজ্যের মঙ্গলের জন্য এবং প্রজাদের সার্বিক কল্যাণের জন্য তাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আধুনিক কোচবিহার শহর, সেখানকার সুপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, হাসপাতাল থেকে শুরু করে সমস্ত নাগরিক পরিষেবার শক্ত বুনিয়াদ প্রকৃত রাজাদেরই হাতে গড়া। মানুষে মানুষে কোনও ভেদাভেদ না রেখে, সকল ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষকে তাঁরা এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। তাঁদের সেই অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপেক্ষ নীতিই কোচবিহারকে অবিভক্ত বাংলার অন্যতম উন্নত ও আধুনিক একটি জনপদে পরিণত করেছিল।

সেই রাজাদের ভাবমূর্তিতে কালি লাগিয়েছেন নকল রাজা নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজ। দিনহাটার গোসানিমারির উপিন ঢোঁড়ার ‘মহারাজ’ হয়ে ওঠার কাহিনী এখন আর কারও অজানা নয়। শুধু নিজের চতুরতাতেই ভেকধারী রাজা হয়ে বসেননি নগেন্দ্র। তাঁর গগনচুম্বী উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে রাজ্যের দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের চরম সুবিধাবাদী নীতি। আজ এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বর্তমান শাসকদল বিজেপি, উভয় দলই নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে এবং নিছক ভোটব্যাংকের অঙ্কে নগেন্দ্রকে মাথায় তুলে নেচেছে।

রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের আবেগ এবং তাঁদের মূল্যবান ভোট নিজেদের বাক্সে টানতে দুই দলই এই স্বঘোষিত রাজাকে তাদের কাছের মানুষ বানানোর এক নগ্ন প্রতিযোগিতায় মেতেছে। তৃণমূল সরকারে ক্ষমতায় থাকার সময় নগেন্দ্রকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে এক প্রকার সামাজিক মান্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে বিজেপি তাঁকে সরাসরি রাজ্যসভার সাংসদ করে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় পাঠিয়েছে। সমাজে এমন বহু রাজবংশী মানুষ আছেন যাঁরা প্রকৃত অর্থেই যোগ্যতাসম্পন্ন, উচ্চশিক্ষিত এবং নিঃস্বার্থভাবে সমাজের জন্য কাজ করে চলেছেন। কিন্তু তাঁদের সম্পূর্ণ ব্রাত্য রেখে, শুধুমাত্র ভোটের সস্তা পাটিগণিত মেলাতে নগেন্দ্রর মতো একজন বিতর্কিত ও ভুয়ো পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে এই বিরাট রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তুলে দেওয়া হয়েছে। আর রাজনীতিকদের এই অন্ধ তোষণ নীতির সুযোগ নিয়ে নগেন্দ্রও ষোলোআনা নিজের আখের গুছিয়ে চলছেন।

প্রকৃতপক্ষে বৃহত্তর রাজবংশী সমাজের স্বার্থের সঙ্গে এই স্বঘোষিত মহারাজের দূরতম কোনও সম্পর্ক নেই। রাজবংশী আবেগ তাঁর কাছে কেবলই একটি নিশ্ছিদ্র ঢাল এবং রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার সিঁড়ি মাত্র। যখনই উত্তরবঙ্গ বা কোচবিহারের সাধারণ মানুষ কোনও ঘোর বিপদে পড়েছেন, তখন এই ‘মহারাজ’-এর টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। বন্যা, খরা বা অন্য কোনও ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় যখন গরিব, খেটে খাওয়া রাজবংশী মানুষরা একটু ত্রাণের আশায় দিন গোনেন, ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে বসেন, তখন নগেন্দ্র রায়কে কখনও দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়ে এক মুঠো অন্ন বা ত্রাণ বিলি করতে দেখা যায় না। সমাজের বিপদে তিনি কখনোই ত্রাতা হয়ে ওঠেননি। রাজবংশী সমাজের সার্বিক উন্নয়ন, তাঁদের নতুন প্রজন্মের উচ্চশিক্ষা, বেকারদের কর্মসংস্থান বা আর্থসামাজিক মানোন্নয়নের জন্য তাঁকে কখনও কোনও গঠনমূলক কাজ করতে বা সংসদে জোরালো গলায় সরব হতে দেখা যায়নি। এর বদলে তিনি কী করেছেন? তিনি কেবল নিজের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা সুনিশ্চিত করেছেন। সাধারণ মানুষের আবেগকে মূলধন করে তিনি আক্ষরিক অর্থেই নিজের সম্পত্তি ও প্রতিপত্তি বাড়িয়েছেন, গড়ে তুলেছেন জোড়া রাজপ্রাসাদ।

তাঁর দৈনন্দিন রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যকলাপের দিকে নজর দিলেই বোঝা যায়, তিনি আসলে আত্মপ্রচারের এক অন্ধ মোহে আচ্ছন্ন একজন ব্যক্তি। বিভিন্ন এলাকায় বিশাল লোক জড়ো করে তিনি যেসব সভার আয়োজন করেন, তার একমাত্র উদ্দেশ্য হল নিজের নামে জয়ধ্বনি শোনা এবং নিজের স্তুতিতে মেতে ওঠা। গ্রামের সাধারণ, সহজ-সরল এবং ধর্মপ্রাণ মানুষদের সামনে নানা ভিত্তিহীন, মিথ্যে এবং কাল্পনিক গল্প শুনিয়ে তিনি দিনের পর দিন গুজব ছড়িয়ে গিয়েছেন। সমাজের মধ্যে সম্প্রীতি বা ভালোবাসার বাণী প্রচার করার বদলে, তাঁর রাজনৈতিক বয়ানে বারবার উঠে এসেছে উসকানি এবং বিদ্বেষের সুর। মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলে, বিভাজনের বিষাক্ত বীজ বপন করে তিনি নিজের আধিপত্য কায়েম রাখতে চাইছেন। ভালোবাসার বদলে ঘৃণা ছড়িয়েই তিনি তাঁর তথাকথিত ‘সাম্রাজ্য’ টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। নগেন্দ্রর এই উগ্র আচরণ ও কার্যকলাপ কোচবিহারের গৌরবময় ইতিহাস এবং প্রকৃত রাজপরিবারের মহান ঐতিহ্যের প্রতি এক চরম অপমান।

প্রকৃত রাজাদের পুণ্য মাটিতে দাঁড়িয়ে একজন নকল রাজা তাঁর হিংসা, বিদ্বেষ এবং মিথ্যার রাজনীতি দিয়ে কোচবিহার সম্পর্কে এক সম্পূর্ণ ভুল এবং বিকৃত বার্তা দেশ ও রাজ্যের বিভিন্ন মহলে পৌঁছে দিচ্ছেন। তাঁর এই সংকীর্ণ ও স্বার্থান্বেষী রূপ দেখে বাইরের মানুষের কাছে কোচবিহারের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। স্বঘোষিত এই মহারাজের বাড়বাড়ন্ত এবং রাজবংশী সমাজকে ধোঁকা দিয়ে নিজের পকেট ভরানোর এই জঘন্য খেলা এবার বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। আর সবার আগে প্রয়োজন সেই রাজনৈতিক দলগুলির বোধোদয়, যারা কেবল কয়েকটা ভোটের লোভে এমন একজন ভেকধারী এবং ঘৃণাচাষিকে সমাজের মাথায় বসিয়ে কোচবিহারের ঐতিহ্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সাধারণ মানুষদের এই নকল রাজার আসল চেহারা সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে।

কুকথা, বিভ্রান্তিমূলক বিবৃতি দিয়ে কোচবিহার তথা উত্তরবঙ্গকে কেন উত্তপ্ত করছেন, চিকেনস নেক এলাকায় মানু্‌ষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে কেন জাতীয় নিরাপত্তাকে দুর্বল করে দেশবিরোধী শক্তিকে সুযোগ করে দিচ্ছেন- নগেন্দ্রর কাছে তার উত্তর চাইতে হবে। একইসঙ্গে উত্তর চাইতে হবে বিজেপি এবং তৃণমূলের কাছেও। এটা মনে রাখা দরকার, রাজবংশী মানুষের আবেগ কোনও ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। আর সেই আবেগকে রাজনৈতিক সিঁড়ি বানিয়ে কেউ নিজের ‘রাজ্য’ তৈরি করলে, তার মূল্য শেষপর্যন্ত দিতে হয় সেই সমাজকেই। সবশেষে একটাই কথা বলার, নৃপেন্দ্রনারায়ণ, জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের রাজ্যে হিংসা ছড়ানো নগেন্দ্রর কোনও প্রয়োজন নেই। আর, পঞ্চানন বর্মা যে সমাজের পথপ্রদর্শক তাদের উজ্জ্বলতা কখনোই ম্লান হওয়ার নয়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *