এলোমেলো হাওয়ায় নূপুর বাজায়  – Uttarbanga Sambad

এলোমেলো হাওয়ায় নূপুর বাজায়  – Uttarbanga Sambad

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


গৌতমেন্দু রায় 

আজকাল সবকিছুই খুব এলোমেলো মনে হয়।  কেউ এলোমেলো হেঁটে চলেছেন, কেউ এলোমেলো কথা বলছেন, কেউ এলোমেলো কিছু না কিছু লিখেই চলেছেন। কাজী নজরুলের ভাষায় তারা সবাই ‘এলোমেলো হাওয়ায় নূপুর বাজায়’। ভাগ্যের নির্মম নির্দেশে আমি ওই শেষোক্ত শ্রেণিতে পড়ি। যতটুকু লিখি তার চাইতেও বেশি ড্রাম পেটাই। নিজের ড্রাম নিজে পেটানোর মধ্যে একটা অদ্ভুত সুখ আছে। অবদমিত ইচ্ছেকে সাকার করার সুখ। একেবারে ছেলেবেলায় নারকেল তেলের খালি কৌটোকে জয়ঢাক ভেবে বাজাতাম। আর একটু বড় হওয়ার পর কোনও এক পরম আত্মীয় মেলা থেকে সস্তার মিনি ঢোল কিনে দিয়েছিলেন। সেই ঢোল কালীরামের না হওয়া সত্ত্বেও দু’একটা বাড়ি দেওয়ার পরেই ফেঁসে গিয়েছিল। সেই থেকে কোনও পার্থিব ঢাকঢোল আর বাজাই না। পরিবর্তে বাজাই ভার্চুয়াল ড্রাম। এলোমেলোই বাজাই। জানি, এই ড্রামবাজনার পুরোটাই একটা মেলোড্রামা। তবুও বাজাই। অষ্টপ্রহর সেই ভার্চুয়াল ড্রামার অ্যাকচুয়াল আওয়াজে চারপাশের লোকজন বিস্তর বিরক্ত হন জানি, তবু, আমার বিবেক কখনও আমাকে সেই ড্রাম বাজাতে নিষেধ করে না।

প্রায় সব বাঙালিই একজন কবি অথবা লেখক। তাঁদের কেউ নিয়মিত লেখেন, কেউ লেখেন না। যাঁরা লেখেন না তাঁদের মধ্যে এমন একটা দৃঢ় প্রত্যয় আছে যে ইচ্ছে করলেই তাঁরা লিখতে পারতেন। জাস্ট সময় পান না তাই লেখেন না। এর বাইরেও কিছু মানুষ আছেন যাঁদের লেখালেখি না করার কারণ ভিন্ন। যেমন শশধর ঘোষ। পাড়ার মোড়ে ঘোষবাবুর অতিপ্রাচীন মিষ্টির দোকান। না, যা ভাবছেন তা নয়। দোকানটি খুব প্রাচীন না হলেও সেই দোকানের মিষ্টিগুলো অতিপ্রাচীন। কবে সেগুলো বানানো হয়েছে স্বয়ং কারিগরেরও তা স্মৃতিতে নেই। বানানোর সময় যে মিষ্টিগুলোর রং থাকে সাদা, সময়ের প্রলেপে সেগুলো কালো হয়ে যায়। সুতরাং ঘোষবাবু রসগোল্লাকে কালোজাম নামেই বিক্রি করতে বাধ্য হন। যাঁদের পৈটিক শক্তি অসাধারণ তাঁদের কেউ কেউ সেই মিষ্টি খান। এবং বেঁচেও থাকেন। মিষ্টির ফসিল খেয়ে বেঁচে থাকা সত্যিই এক মিস্টিরিয়াস ব্যাপার। এতে কোনও সন্দেহ নেই।

আমার ওপর ঘোষবাবু মোটেই যে সন্তুষ্ট নন সেটা আমি বেশ টের পাই। কারণটা অনুমান করা একটা হনুমানের পক্ষেও সরল। আমি এলোমেলো লিখেও নিজের ঢাক নিজে পেটানোর সুযোগ পাই অথচ উনি সাদাকে কালো আর কালোকে সাদা বানাবার মিস্ট্রি করায়ত্ত করেও ঢাকঢোল পেটানোর ট্রেন্ডে নিজেকে ঠিক ফিট করাতে পারছেন না। অথচ ফিটফাট জামাকাপড় পরে সারাক্ষণ ছটফট করেই চলেছেন। কিন্তু ঢোলটা বাজছে না। তাঁকে বুঝিয়ে পারি না যে তাঁর অমরসৃষ্টি লালমোহনের ব্যাপারে ঢোল বাজানো কিন্তু সম্ভব। বলেছি রবীন্দ্রনাথের গানের কলির কথাও। অন্বেষণ করতে বলেছি সেই মিষ্টি স্বভাবের ক্রেতার যিনি তাঁর হয়ে ঢোল না বাজালেও কবিগুরুর সেই গানটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গাইবেন – ‘তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে।/ জানি না কি মরণ নাচে, নাচে গো ওই চরণমূলে।’

ঠুনকো লেখক হিসেবে আমি শশধর ঘোষ মশাইয়ের কাছে কুঁকড়ে থাকি। খুব ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তিনি লিখতে পারছেন না অথচ আমি লিখেই চলেছি। একই পাড়ায় বসবাস করে এটা তো ভীষণই বৈষম্যমূলক ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে!  তাই, একদিন, প্রস্তাবটা তাঁকে দিয়েই ফেললাম। বললাম– ‘শশধরবাবু, যে হাত এত বিচিত্র মিষ্টি বানাতে পারে সেই হাত কেন মিস্ট্রি বানাতে পারবে না? আপনি মিস্ট্রি লিখুন। মার্ডার মিস্ট্রি। জমে ক্ষীর হয়ে যাবে। আপনি মিলিয়ে নেবেন।’ আমার এই হৃদয়স্পর্শী প্রস্তাবে শশধরবাবু রীতিমতো আপ্লুত হয়ে পড়লেন। আবেগে, কৃতজ্ঞতায় তাঁর মুখটা তাঁরই দোকানের পান্তুয়ার মতো হয়ে গেল। তিনি খুব লজ্জিত মুখে ম্লান হেসে আমাকে বললেন –‘‘চেষ্টা কি আমি করিনি দাদা? লেখালেখি করার প্রতিভা যে আমার মধ্যে রয়েছে সেটা আমি জানি। কিন্তু মুশকিলটা কোথায় জানেন? ‘বানাম টানাম’ সব ভুলে মেরে দিয়েছি। অভ্যাস নষ্ট হয়ে গিয়েছে কি না। ‘অ’ লিখতে গেলে পেনটা বাঁ দিকে ঘোরাতে হয় নাকি ডানদিকে, সে নিয়ে গোলকধাঁধায় পড়ে যাই। তা না হলে কবেই কতকিছু লিখে ফেলতাম!’’ বলতে দ্বিধা নেই, ঘোষদার এই অকপট সত্যকথনে, আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। সত্যিই তো! আধা শতক আগে আমরা বলপেন ব্যবহার করতে শুরু করেছি। পঞ্চাশ বছরে বলপেনের অগ্রস্থ বলটা জ্যাম হয়ে যাওয়ারই তো কথা। মাত্রা টেনে ফুটকি দেওয়ার পর একচুটকিতে সেটা বাঁ দিকে নাকি ডান দিকে ঘুরিয়ে ‘অ’ লিখতে হয় সেটা ভুলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। ওঁকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই। উলটোদিকে কিন্তু আবার এমন এমন মানুষও আছে যে লিখতে পারে কিন্তু পড়তে পারে না। কি, বিশ্বাস হচ্ছে না?  তাহলে তো মলয়ের কথা এখানে বলতেই হয়। মলয় সূত্রধরের বাড়িও আমাদের পাড়াতেই। হাতেখড়ির আগেই তার হাতেবিড়ি হয়েছিল বলে শুনেছি। এলাকার যে প্রাইমারি স্কুলের দরজার চৌকাঠ নিজের হাতে বানিয়েছিল তার বাবা সেই চৌকাঠ সে নিজে কখনও মাড়ায়নি। বাবার হাতের কাজে সে পা রাখবে কী করে!  পিতৃদেবকে এত বড় অসম্মান সে করতে পারেনি দুঃস্বপ্নেও। ফলে, যা হওয়ার তাই হল। ওর বয়সি ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে নানা পেশায় নিযুক্ত হয়ে কমবেশি রোজগার করতে শুরু করলেও মলয় রয়ে গেল বেকার-ই।

শুনেছি, বেচারি মলয় একবার নৈশপ্রহরীর একটা ইন্টারভিউ দিয়েছিল। ইন্টারভিউ বোর্ডে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল সে লেখাপড়া কিছু জানে কি না। মলয় খুব স্মার্টলি জানিয়েছিল, সে লিখতে অবশ্যই পারে কিন্তু পড়তে পারে না। মলয়ের এমন বয়ানে প্রশ্নকর্তাদের চোয়ালগুলো ঝুলে পড়েছিল কি না সেটা জানা নেই। শুধু এটুকু জানা গিয়েছে তাকে সাদা কাগজে কিছু লিখতে বলা হয়েছিল। কাগজটা টেনে নিয়ে মলয় তাতে পেন দিয়ে হিজিবিজি দাগ কেটে বসে থাকে। ‘এটা কী লিখেছেন?’ এই প্রশ্নের জবাবে সে নির্লিপ্ত মুখে বলে– ‘স্যর, আগেই তো বলেছি, আমি লিখতে পারি কিন্তু পড়তে পারি না।’

ফেলে আসা দিনগুলোর এইসব ছাইপাঁশ কথা এলোমেলো ভাবতে ভাবতে আমি এখন হাঁটছি। কী কাকতালীয় ব্যাপার দেখুন, পেছন থেকে সেই মলয়-ই ডাকছে আমাকে। আমি এখন থামি কেমন? ডাকিছে মলয়, এলোমেলো হাওয়ায় নূপুর বাজায়…!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *