এক শরীরে দুই মানুষ! তিশা-কাণ্ডে স্কিৎজোফ্রেনিয়ার মিথ ভাঙলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

এক শরীরে দুই মানুষ! তিশা-কাণ্ডে স্কিৎজোফ্রেনিয়ার মিথ ভাঙলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

ইন্ডিয়া খবর/INDIA
Spread the love


প্রাক্তন মিস পুণে তিশা শর্মার মৃত্যুকে ঘিরে দেশজুড়ে যখন তীব্র আলোড়ন, তখনই নতুন করে সামনে এল স্কিৎজোফ্রেনিয়া ও মানসিক রোগ নিয়ে সমাজে ছড়িয়ে থাকা বহু ভুল ধারণা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনও অনেকেই মনে করেন স্কিৎজোফ্রেনিয়া মানেই একজন মানুষের মধ্যে দু’টি আলাদা ব্যক্তিত্ব কাজ করে, অথবা এই রোগে আক্রান্তরা বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন। বাস্তবে এই ধারণাগুলোর কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

গত সপ্তাহে ভোপালের শ্বশুরবাড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হন ৩৩ বছরের তিশা শর্মা। এরপর তাঁর শাশুড়ি গিরিবালা সিং দাবি করেন, তিশা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসাও চলছিল। তাঁর বক্তব্যের পর থেকেই সোশাল মিডিয়ায় স্কিৎজোফ্রেনিয়া নিয়ে নানা মন্তব্য, বিতর্ক এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে শুরু করে।

আরও পড়ুন:

এই পরিস্থিতিতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, কোনও ব্যক্তির মানসিক অসুস্থতাকে অহেতুক চাঞ্চল্য তৈরির হাতিয়ার না বানিয়ে, বিষয়টিকে সংবেদনশীল ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা জরুরি।

আরও পড়ুন:

সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কথায়, স্কিৎজোফ্রেনিয়া এমন একটি মানসিক রোগ, যাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই ভাবেন, এই রোগ মানেই ‘স্প্লিট পার্সোনালিটি’ বা এক শরীরে দুই মানুষ। আসলে স্কিৎজোফ্রেনিয়া এবং ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার সম্পূর্ণ আলাদা সমস্যা।

twisha sharma case dual personality myth
তিশা শর্মা। ছবি: সংগৃহীত

স্কিৎজোফ্রেনিয়া কী?
স্কিৎজোফ্রেনিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অসুস্থতা, যা মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ, আচরণ এবং বাস্তবকে বোঝার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় এমন কিছু শুনতে, দেখতে বা বিশ্বাস করতে পারেন, যা বাস্তবে নেই। ফলে কাজ, সম্পর্ক, সামাজিক জীবন ও মানসিক স্থিতি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য, স্কিৎজোফ্রেনিয়া মানেই কেউ হিংস্র হয়ে উঠবেন, এমন নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীরা সমাজের কুসংস্কার, অবহেলা ও একঘরে হওয়ার শিকার হন।

উপসর্গ

  • অবাস্তব শব্দ শোনা বা কিছু দেখা
  • ভুল বিশ্বাস বা অতিরিক্ত সন্দেহ
  • এলোমেলো চিন্তাভাবনা
  • মানুষের সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে চলা
  • আবেগ প্রকাশে সমস্যা
  • মনোযোগ কমে যাওয়া
  • আচরণ ও কথাবার্তায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগের উপসর্গ ব্যক্তি ভেদে আলাদা হতে পারে।

twisha sharma case dual personality myth
মানসিক অসুখ নিয়ে ভাঙুক মিথ। ছবি: প্রতীকী

স্কিৎজোফ্রেনিয়া নিয়ে সবচেয়ে বড় ৫টি ভুল ধারণা
১. এক শরীরে দুই মানুষ
এটাই সবচেয়ে প্রচলিত এবং সবচেয়ে ভুল ধারণা। স্কিৎজোফ্রেনিয়া কখনও একাধিক ব্যক্তিত্ব তৈরি করে না। এটি মূলত চিন্তা ও বাস্তব উপলব্ধির সমস্যা।

২. স্কিৎজোফ্রেনিয়া মানেই হিংস্রতা
চিকিৎসকদের মতে, সিনেমা ও ধারাবাহিকে এই রোগকে ভুলভাবে দেখানোর কারণেই এই ভয় তৈরি হয়েছে। বাস্তবে অধিকাংশ রোগী কারও জন্য বিপজ্জনক নন।

৩. মানসিক রোগের ওষুধ মানুষকে বদলে দেয়
মনোরোগের ওষুধের কাজ হল উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করা। এগুলো কোনও মানুষের ব্যক্তিত্ব মুছে দেয় না।

৪. এই রোগের চিকিৎসা নেই
স্কিৎজোফ্রেনিয়া দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হলেও নিয়মিত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পারিবারিক সহায়তায় বহু মানুষ স্বাভাবিক জীবন কাটান।

৫. মানসিক অসুস্থতা ব্যক্তিগত দুর্বলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক রোগ কোনও চরিত্রগত দুর্বলতা নয়। এর পিছনে জৈবিক, মানসিক ও পরিবেশগত নানা কারণ কাজ করে।

twisha sharma case dual personality myth
লজ্জা বা ভয় নয়, জরুরি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিদের পরামর্শ। ছবি: প্রতীকী

কেন মানসিক রোগের ওষুধ নিয়ে এত ভয়?
চিকিৎসকদের মতে, সমাজে এখনও সাইকিয়াট্রিক ওষুধ নিয়ে ভয় ও লজ্জা কাজ করে। অনেকেই ভাবেন, এই ওষুধ খেলে তাঁকে ‘পাগল’ বলা হবে। ফলে বহু মানুষ চিকিৎসা শুরু করতেই ভয় পান।

আসলে এই ওষুধ মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং বিভ্রম, ভয় বা মানসিক অস্থিরতা কমায়। শুধু স্কিৎজোফ্রেনিয়া নয়, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, তীব্র অবসাদ বা সাইকোসিসের ক্ষেত্রেও এই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

কেন জরুরি দ্রুত চিকিৎসা?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যত দ্রুত রোগ ধরা পড়বে এবং চিকিৎসা শুরু হবে, ততই সুস্থ জীবনে ফেরার সম্ভাবনা বাড়বে। ভয়, সামাজিক লজ্জা ও ভুল ধারণার কারণে অনেকেই চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

চিকিৎসার মধ্যে থাকে

  • অ্যান্টি-সাইকোটিক ওষুধ
  • কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি
  • কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি
  • পারিবারিক সহায়তা
  • স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ
  • স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিশা শর্মা-কাণ্ড ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনও সমাজে সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে। তাই ভয় বা কুসংস্কার নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা, সঠিক তথ্য এবং সময়মতো চিকিৎসা।

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *