কর্মসূত্রে আপাতত আমি থাকি জোহানেসবার্গে। ঘড়িতে তখন সকাল এগারোটা বেজে পঁচিশ, যখন খবরটা পাই। অনীকদার সঙ্গে প্রথম আলাপ ফেসবুকে কোভিডের সময়। সিগারেট খেতেন বেশ আর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট ছিল, ওঁর কিছু প্রশ্ন ছিল আমার কাছে। তখন আমি কোভিড নিয়ে মাঝে মাঝেই নানা জায়গায় বক্তব্য রাখতাম। লিখলেন, ‘লম্বা টাইপ করতে ভালো লাগে না, ফোন করা যায়? কিছু জানার আছে।’ আমার কাছে উনি তখনও “দ্য গ্রেট অনীক দত্ত হু মেড ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’।” প্রথমেই বললেন, ‘তোমায় সায়েন্টিস্ট মনে হয় না, তোমার চশমা নেই। বরং অনেক বেশি নায়িকা-নায়িকা দেখতে।’ খুব সম্ভবত বলেছিলাম, ‘আপনার কাছে কিন্তু গ্রে ম্যাটারের দাম বেশি আশা করেছিলাম।’ উত্তর এসেছিল ‘শিরদাঁড়া। মাথা উঁচু রাখার জন্য ওটা সবথেকে দামি।’ এই ছিলেন অনীক দত্ত-আজীবন সত্যি কথা, সঠিক কথা বলতে পিছু না হটা একজন দামি বাঙালি। কলকাতায় শেষ দু’বছরে আমি আমার স্বল্প সফরে ওঁর মতো নির্ভীক কাউকে দেখিনি।
২০২৪ সালে প্রথম মুখোমুখি দেখা হলে বলেছিলেন, ‘তুমি অতটা সুন্দরী নও, যতটা ছবিতে।’ নাও, এবার বোঝো। মানে আবার চাইছিলেন একটা জম্পেশ তর্ক হোক। কনস্ট্রাকটিভ তর্ক করতে ভালোবাসতেন খুব, অনেকে যদিও ওঁর এই ‘সেন্স অফ হিউমার’ বুঝতেই পারতেন না। মনে আছে, আমি সিনেমা জগতের নায়ক-নায়িকারা আদ্যন্ত নিরেট বলায় আমাকে কয়েক জনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে আবার তর্ক করে ভুল ভাঙিয়েছিলেন। অনেকেই জানেন, উনি ইউবিআই ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত নরেন্দ্রচন্দ্র দত্তের নাতি ছিলেন। পরিচালক বিমল রায় ছিলেন ওঁর মায়ের দিক থেকে খুড়তুতো দাদু। কিন্তু ওঁর ডোভার লেনের বাড়িতে যাঁরা গেছেন দেখেছেন হয়তো কী সাংঘাতিক অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। সাদা রঙের বাইরে কোনও রং পছন্দ করতেন না। যদিও গত বছর একটা ঘরে সাদার সঙ্গে নীল রং মিশেছিল বলে বলেছিলাম, ‘কলকাতার থিম কালারে সাজালে? এ তো পুরো মা ফ্লাইওভারের পর্দা হয়ে গেছে।’
আরও পড়ুন:

তারপর টানা তিন-চার দিন আমাকে কল্লোলিনী কলকাতার সৌন্দর্য তৎকালীন সরকার কী করে খর্ব করে দীনহীনা করেছে এই নিয়ে কখনও ভাব সম্প্রসারণের মতো, কখনও যুক্তি-তক্কের মতো, কখনও রচনার মতো ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। তর্কে বহুদূর যাওয়া যেত না ওঁর সঙ্গে, কারণ তর্কে অপরাজিত থাকতে পছন্দ করতেন, তবে তর্কটা বিশ্বাসে মিলিয়েই করতেন ও মিলিয়ে দিতেনও। অনীক দত্তর মতো মানুষেরা ভীরু বাঙালি সমাজে কমই হন যাঁরা নিজের প্রতিফলন প্রতিসরণে বিস্মৃত হন না। নিজেই উনি নিজের সব থেকে বড় সমালোচক ছিলেন। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর থেকেও ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ আর ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ ওঁর অনেক বেশি প্রিয় সৃষ্টি ছিল। আমি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছাড়া কিছু দেখিনি বলে ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ ওঁর বাড়িতে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন আমাকে।’ খারাপ লেগেছিল বলায় বলেছিলেন, ‘সিনেমার কিছুই বোঝো না। সায়েন্সটাই করো, সেটাও বোঝো কি না সেটা অবশ্য আমি বুঝব না।’

আমার মেয়ে প্রীজা আর হাজব্যান্ড পল্লবের সঙ্গেও অনীকদার স্মৃতি কিছু কম নয়। আমাদের ইচ্ছায় আমার মেয়ের হাতেখড়ি করেছিলেন অনীকদা। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মজা করে বলেছিলেন, ‘আমার মতো তথাকথিত প্রথায় যাকে অশিক্ষিত বলে, তাকে দিয়ে হাতেখড়ি করাচ্ছ কেন?’ এর উত্তর তো এতক্ষণ যাঁরা এই লেখাটা পড়ে ফেলেছেন বা অনীকদাকে চেনেন নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন কেন। প্রীজার মতো ছোট ছোট বাচ্চাদের এনার্জি দেখে বারবার বলতেন, ‘ছোট ছোট বাচ্চাদের এত কাইনেটিক এনার্জি কী করে নানা কাজে লাগানো যায় সেটা বিজ্ঞানীরা কেন ভাবে না? ভাবনার বিস্তার ছিল অপরিসীম ও স্বতন্ত্র।’ অনীকদাকে গতবছর গিয়ে একটু বিষন্ন দেখেছি, পারিপার্শ্বিকতার নানা মিথ্যে ওঁকে খুব কষ্ট দিত, মিথ্যে সহ্য করতে পারতেন না একদম আর অতীতকে কোনওদিন ভুলে যাননি। আমরা যারা বলতাম- ‘অনীকদা মুভঅন’। উনি বলতেন, ‘কীসের মুভ অন, কোথায় মুভ অন? চারপাশটা দেখছ, এতটুক কষ্ট হয় না, কিছুই মনে হয় না?’
আমি শেষ পাঁচ বছরের ফেসবুক আলাপে আর দুবছরের সামনাসামনি আলাপে অনীকদাকে কোনওদিন মিথ্যে বলতে বা তথ্য টুইস্ট করে বলতে দেখিনি, যেটা সত্যি আজ কলকাতার জনজীবনে সাংঘাতিকভাবে প্রোথিত। যে কথা বললে অনীকদার সঙ্গেই হয়তো সব থেকে খারাপ ঘটবে, সেটা বলতে উনি কখনও পিছপা হতেন না। বলতেন, ‘তুমি জানো আমি মিথ্যে বলতে পারি না।’ সত্যিই, মিথ্যে কী করে বলতে হয়, সেটা অনীক দত্তর ছায়াও জানত না। আমাদের শেষ স্মৃতি মূলত ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ ছবিকে ঘিরে ছিল। তারপর শেষ দেখা পল্লবের কলকাতা সফরে ডিসেম্বর মাসে। বললেন, ‘আমি ড্রিঙ্ক করছি না, দামি দামি ড্রিঙ্ক পড়ে আছে তোমরা খাও।’ ড্রিঙ্ক করছেন না শুনে খুব খুব ভালো লেগেছিল। খুব আড্ডা জমেছিল সেদিন, ‘এআই’ নিয়ে অনীকদার অনেক জ্ঞান ছিল, জানার ইচ্ছাও ছিল, তাই আমাদের আড্ডা খুব জমেছিল।

অনীকদাকে নিয়ে আমি একটা বই লিখতে শুরু করেছিলাম গত বছর, প্রাথমিক নাম উনি বলেছিলেন, ‘টুকরো টুকরো ফ্ল্যাশব্যাক’। মূলত ওঁর ছোটবেলা নিয়ে, কোনও সিনেমা বা পরিচালক অনীক দত্তকে নিয়ে নয়। আমি বাইরে থাকি বলে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে রাখতেন গল্পের মতো করে। শুরু করেছিলেন, ‘নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত’কে নিয়ে ওঁর স্মৃতি দিয়ে। সেই ভয়েস মেসেজগুলোই আজ রয়ে গেল অক্ষরে অক্ষরে ওঁর কাছে গেল না। এবছর বইমেলার সময় বলেছিলেন একবার, ‘তুমি বইটা লিখবে না?’ আজ উত্তর দিলাম- ‘লিখব অনীকদা।’
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
