রুদ্র সান্যাল
বর্তমান শ্রমবাজারে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম গিগ ইকনমি। স্থায়ী চাকরির বদলে স্বল্পমেয়াদি বা প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহ এখন বিশ্বজুড়ে নতুন ধারা। ভারতের সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের মধ্যে প্রায় ২.৩ কোটি মানুষ গিগ ইকনমির সঙ্গে যুক্ত হবেন। উত্তরবঙ্গও এই পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে।
শিলিগুড়িতে প্রতিদিন চোখে পড়ে শত শত ডেলিভারি বয়, বিভিন্ন অনলাইন সংস্থার হয়ে পিঠে ব্যাগ নিয়ে ছুটে চলছেন। বেসরকারি এক হিসেবে শুধু শিলিগুড়ি শহরেই চার–পাঁচ হাজার তরুণ খাবার ও পণ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। পাহাড়ি এলাকায় অনেক তরুণ ফ্রিল্যান্স কাজ করছেন-অনলাইন টিউশন, কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা গ্রাফিক ডিজাইনের। কালিম্পংয়ের এক কলেজ পড়ুয়া ছাত্র ইউটিউবে ভিডিও বানিয়ে মাসে কয়েক হাজার টাকা উপার্জন করছেন- এটিও গিগ ইকনমির একটি বাস্তব চিত্র। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের বহু তরুণও এখন গিগ ইকনমিতে যুক্ত হচ্ছেন। চা শিল্পে মজুরি কম ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হওয়ায় অনেকে বাইকে খাবার ডেলিভারি বা রাইড-শেয়ারিং পরিষেবায় যুক্ত হচ্ছেন। এতে তাঁদের পরিবারে বাড়তি আয় হচ্ছে এবং শ্রমিকনির্ভর জীবনে এক নতুন ভরসা তৈরি হচ্ছে। গিগ ইকনমির সুবিধা হল স্বাধীনতা ও বিকল্প কর্মসংস্থান। কৃষি ও চা বাগান নির্ভর অর্থনীতির বাইরে নতুন দিগন্ত খুলছে। শিক্ষিত তরুণরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়তি আয় করছেন। আবার ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় গ্রামীণ এলাকাতেও সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে সমস্যাও যথেষ্ট। গিগ কর্মীদের জন্য কোনও সামাজিক সুরক্ষা নেই- না আছে স্বাস্থ্যবিমা, না আছে পেনশন। প্ল্যাটফর্ম কোম্পানিগুলি কমিশন কেটে নেওয়ায় আয় সীমিত হয়ে যায়। উত্তরবঙ্গের মতো অঞ্চলে যেখানে স্থায়ী শিল্পের সুযোগ কম, সেখানে এই ধরনের অনিশ্চিত কাজই অনেকের ভরসা হয়ে উঠছে। ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবও একটি বড় বাধা। গ্রামীণ এলাকার বহু তরুণ এখনও অনলাইন লেনদেন বা প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজের নিয়ম জানেন না। ফলে প্রকৃত সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তথ্য বলছে, সারা ভারতে গিগ কর্মীদের প্রায় ৮০ শতাংশ ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। উত্তরবঙ্গেও চিত্র ভিন্ন নয়- বিশেষত কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের বড় অংশই পার্ট-টাইম ডেলিভারি বা ফ্রিল্যান্স কাজ করছেন। এক সমীক্ষা অনুযায়ী, শিলিগুড়ির প্রায় ৩৭ শতাংশ ডেলিভারি কর্মীই গ্রামীণ পটভূমি থেকে উঠে আসা। অর্থাৎ, এই খাত শুধু শহর নয়, গ্রাম থেকেও তরুণদের টেনে আনছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত গিগ কর্মীদের জন্য আইনি সুরক্ষা, ন্যায্য মজুরি ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে গিগ ইকনমি সংক্রান্ত কর্মশালা হলে তরুণরা আরও প্রস্তুত হবেন।
সবশেষে বলা যায়, উত্তরবঙ্গের গিগ ইকনমি একদিকে নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করছে, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার ছায়াও রেখে দিচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতনতা থাকলে এটি ভবিষ্যতের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা ও পাহাড়ি অঞ্চলে, যেখানে প্রচলিত শিল্প তেমন নেই, সেখানে গিগ ইকনমি তরুণদের আত্মনির্ভরতার নতুন ভরসা হতে পারে।
(লেখক পেশায় শিক্ষক। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)
