- কৌশিক দত্ত
পশ্চিম সিকিমের রাবাংলা থেকে মিনিট দশেকের রাস্তা রাবডানসে। একসময় সিকিমের চোগিয়ালদের রাজধানী। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সাহায্য নিয়ে সেই ইতিহাসকে সাজিয়েছে সিকিম সরকার। এন্ট্রি পয়েন্টে ছোট্ট একটা পার্ক। পাখিঘর দিয়ে সাজানো। মিনিট পনেরো জঙ্গলের রাস্তায় ট্রেক করে পৌঁছে যাওয়া যায় ফুনসং নামগিয়ালের (চোগিয়াল বংশের রাজা) রাজধানীতে। সোলার আলোয় সাজানো সেই ধ্বংসস্তূপ। গাইড বুঝিয়ে দেন কোথায় রাজা বসতেন, কোথায় উচ্চবিত্তরা পুজো দিতেন, কোথায় আমজনতার উপাসনার জায়গা ছিল। আরও কত কী। দূরে পেমিয়াংসি মনাসটেরি ইতিহাসের সাক্ষী থাকে।
দমনপুর থেকে রাজাভাতখাওয়া হয়ে বক্সা মোড় পেরিয়ে সোজা সান্তালাবাড়ি। তারপর ভাঙাচোরা রাস্তা ধরে কিছুটা গাড়ি উঠলেও হাঁটাপথে যেতে হবে বাকিটা। ইতিহাসের বক্সা দুর্গ। ইংরেজ আমলে অদম্য কিছু তরুণের লড়াইয়ের ইতিহাস এই দুর্গের প্রতি ইটে লেখা। বন্দিদের নিজের হাতে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেসবও লেখা আছে এখানকার ফলকে। নেই শুধু ইতিহাসকে ধরে রাখার একবিন্দু আন্তরিকতা। দুর্গে বন্দিদের থাকার সেলগুলো একের পর এক ধসে পড়ছে। বিসদৃশ টাইলস বসিয়ে স্মৃতি ফলক করা হয়েছিল বাম আমলে। তারও কয়েকটা খসে পড়েছে। সর্বত্র ছড়িয়ে আবর্জনা আর গবাদি পশুর মল। যতদূর জানি, দুর্গ সংস্কারের কথা বলা হলেও তার জন্য কোনওদিনই কোনও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া হয়নি।
অথচ দু’জায়গাতেই পা পড়ে পর্যটকদের। দুই রাজ্যের দুই ছবি বলে দেয় পর্যটন নিয়ে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির তফাত কতটা। সিকিম পর্যটনকে তাদের প্রধান শিল্পের মর্যাদা দিয়ে বিশ্বে অন্যতম টুরিস্ট ডেস্টিনেশন হয়ে উঠেছে আর পশ্চিমবঙ্গ সেই দৌড়ে ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছে।
সমস্যাটা কোথায়? এর কারণ খুঁজতে আমাদের কয়েক দশক পিছিয়ে যেতে হবে। তার আগে দেখে নেওয়া যাক, কেন্দ্রীয় সরকারের পর্যটন পরিকাঠামোর দিকটা। উত্তরবঙ্গ এবং সিকিমকে নিয়ে যে পর্যটন সার্কিট গড়ে উঠেছিল তার পিছনে কোনও সরকারি উদ্যোগ সেভাবে ছিল না। বরং সেই পর্যটন সার্কিট অনেকটা ধাক্কা খেয়েছে কেন্দ্রের অদ্ভুত নিয়মে। পর্যটনের যে অঞ্চলভিত্তিক ভাগ রয়েছে, তাতে পূর্বাঞ্চল সার্কিটে গোটা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে রয়েছে ওডিশা থেকে আন্দামান। আর সিকিমকে রাখা হয়েছে অসম সহ সেভেন সিস্টারের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে। ফলে সিকিমের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যটন নীতি পরিচালনা করা হয় গুয়াহাটি থেকে আর উত্তরবঙ্গের জন্য কলকাতা থেকে। উত্তরবঙ্গ আর সিকিমকে ধরে কোনও সামগ্রিক পরিকল্পনা তাই কোনওদিনই করা হয়নি। তাই দার্জিলিং আর সিকিমকে ঘিরে পর্যটন সার্কিটের যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে তার সামগ্রিক বিকাশ আঁতুড়েই ধাক্কা খেয়েছে অঞ্চল বিভেদে। আরও রূঢভাবে বললে, কলকাতায় বসে যাঁরা পূর্বাঞ্চলের পর্যটন পরিকল্পনা করেন, তাঁরা আন্দামান আর উত্তরবঙ্গের জন্য একটাই নীতি নির্ধারণ করেন। সিকিম সম্পর্কে তাঁদের কোনও ধারণাই থাকে না। অন্যদিকে গুয়াহাটিতে বসে মেঘালয়ের সঙ্গে একই নীতি নির্ধারণ হয় সিকিমের জন্য। উত্তরবঙ্গ সম্পর্কে সেখানকার পর্যটনকর্তাদের কোনও ধারণাই থাকে না।
ভাবতে অবাক লাগে, ইংরেজ আমলে নেপাল-সিকিম-ভুটানকে নিয়ে গড়ে ওঠা থ্রি কিংডম নামে যে পর্যটন সার্কিট গড়ে উঠেছিল তা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা হত দার্জিলিং থেকে। বিদেশি পর্যটকরা এখানে আসতেন দার্জিলিংয়ের টানে। তাঁরাই দার্জিলিং থেকে সিকিমের পথে প্রথম পা বাড়ান। কয়েক দশক আগে হিমালয়ান ট্যুরিজম অ্যাডভাইজারি বোর্ড (হিমট্যাব)-এর অধীনে সিকিমে পর্যটনের পথচলা যখন শুরু হয়েছিল তারও সূত্রধর ছিল উত্তরবঙ্গ। পরবর্তীকালে ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে সিকিম যখন পর্যটনকে পাখির চোখ করল তখনও কিন্তু উত্তরবঙ্গই তাদের পথপ্রদর্শক ছিল। তথ্য বলছে, দার্জিলিংয়ের এক পর্যটন সংস্থা ক্লাব সাইড মোটরস পর্যটকদের নিয়ে গিয়েছিল সিকিমে। সেটাই আধুনিক সিকিমে পর্যটনের শুরু।
১৯৭৫-এ ভারতের অঙ্গরাজ্য হওয়ার পর সিকিমের পর্যটনে দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা। প্রথম ১০ বছর সিকিম তাদের প্রশাসনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার পর নজর দেয় পর্যটনে। তখন থেকেই গ্যাংটক ছাড়িয়ে সিকিমের পর্যটন ছড়াতে শুরু করে পেলিং-রাবাংলা- ইয়কসাম ঘিরে। একে একে যুক্ত হয় উত্তর সিকিমের লাচেন-লাচুন- ইউমথাংয়ের মতো নতুন গন্তব্য। ইয়কসাম থেকে জোংরি-গোচালার ট্রেকিং রুটের সোনালি দিনের শুরু তখনই। যতদূর জানা যায়, গ্যাংটককে বাদ দিয়ে পশ্চিম সিকিমে পর্যটনের প্রসার ঘটেছিল এই উত্তরবঙ্গের হাত ধরেই। দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান ট্যুর অ্যান্ড ট্রেক কোম্পানি ছিল পথপ্রদর্শক।
পর্যটনে সিকিম সাবালক হয়ে উঠতে শুরু করল মোটামুটি ১৯৯৫ থেকে। ১৯৯৯ সালে ইস্ট হিমালয়া ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে সিকিমকে কেন্দ্র করে ‘ভিজিট হিমালয়া-২০০০’ অনুষ্ঠিত হল। বলা যেতে বিশ্ব পর্যটনে সাবালক সিকিমের প্রথম একক উপস্থিিত এটাই। এরপর ২০০৫-’১৫ পর্যটনে নিজেদের আমূল বদলে ফেলেছে সিকিম। আর তার জন্য অনেকটাই কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন সিকিমের এক দশকের মুখ্যমন্ত্রী পবনকুমার চামলিং। পর্যটনই প্রথম পরিচয়- এই স্লোগানে সিকিমের আমজনতাকে বদলে দিয়েছেন তিনি।
এবার পশ্চিমবঙ্গের দিকে একবার তাকানো যাক। প্রথমে একটা ঘটনার কথা এখানে বলা দরকার। বাম আমলে উত্তরবঙ্গে পর্যটন নিয়ে এক বৈঠকে এক মন্ত্রী বলেছিলেন, তাঁদের সামনে শিক্ষা, খাদ্য এমন নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তাই পর্যটন তাঁদের কাছে সবচেয়ে কম গুরুত্ব পায়।
২০০২ সালকে ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার অফ ইকো ট্যুিরজম ঘোষণা করেছিল ইউনেসকো। সেই বছরই ইকো ট্যুরিজম প্রসারে ইউনেসকোর দূত হয়ে ভারতে আসেন নন্দিতা জৈন নামে এক আধিকািরক। কলকাতায় পর্যটনকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে পশ্চিমবঙ্গে ইকো ট্যুরিজম নিেয় একটা রূপরেখা তৈিরর কথাও বলেছিলেন তিনি। কিন্তু কলকাতায় বসে থাকা পর্যটন দপ্তরের আমলারা বিশেষ কান দেননি নন্দিতার কথায়। উত্তরবঙ্গে এসে এখানকার ট্যুর অপারেটরদের মারফত নন্দিতা চলে যান সিকিমে। গল্প আর না বাড়িয়ে শুধু এইটুকু বলা যায়, ২০০২ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার অফ ইকো ট্যুরিজমের সমাপ্তি অনুষ্ঠান হয়েছিল সিকিমে। দেশ-বিদেশের নামী পর্যটন সংস্থাগুলির কর্তাদের আর ইউনেসকোর পর্যটন বিভােগর আধিকারিকদের পা পড়েছিল সিকিমে। বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে ‘ইকো ট্যুরিজম স্টেট’ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল সিকিম। পশ্চিমবঙ্গের দিকে সেদিন ফিরেও তাকায়নি বিশ্ব পর্যটন সংস্থাগুলি।
২০০৫-’১৫ সিকিম নিজেকে পর্যটনের রাজ্য হিসাবে গড়ে তুলছে। আর পশ্চিমবঙ্গ শুধু দার্জিলিংয়ের মূলধন ভাঙিয়ে চলেছে। উত্তরবঙ্গ ও সিকিম মিলিতভাবে যে একটা পর্যটন সার্কিট, তা যেমন দিল্লির পর্যটনকর্তারা বোঝেননি, তেমনই বুঝতে চাননি বা চরমভাবে সেই সত্যকে অবজ্ঞা করেছেন কলকাতায় বসে থাকা রাজ্য পর্যটনের কর্তারা। সিকিম সেই সুযোগে পশ্চিমবঙ্গের ওপর নির্ভরতা ক্রমশ কমিয়েছে। কীভাবে, তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বিদেশি পর্যটকদের সিকিমে ঢোকার এন্ট্রি পারমিট দেওয়া হত চারটি জায়গা থেকে। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মল্লি আর রংপো এবং পশ্চিমবঙ্গের রিশি ও সিংগলাবাজার থেকে। সিকিম এখন শুধু মল্লি আর রংপো থেকেই বিদেশিদের এন্ট্রি পারমিট ইস্যু করে। পশ্চিমবঙ্গের দুটি জায়গাকে নিঃশব্দে বাদ দিয়েছে তারা।
আসলে পর্যটনকে সিিকম তাদের আয়ের প্রধান উৎস হিসাবে যে গুরুত্ব দিয়েছে তার সুফলও পেয়েছে তারা। গোটা রাজ্যকে ইকো ট্যুরিজম স্টেট হিসবে গড়ে তোলার জন্য গ্রামীণ পর্যটনকে তারা সাজিয়েছে। গোটা রাজ্যকে প্লাস্টিকমুক্ত আর অর্গানিক স্টেটে পরিবর্তন করেছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গকে এখনও সংরক্ষিত জঙ্গল থেকে প্লাস্টিক কুড়িয়ে আনতে রীতিমতো অভিযান চালাতে হয়।
পশ্চিমবঙ্গের হাত ধরে হাঁটতে শেখা সিকিম এখন পশ্চিমবঙ্গের হাত ছাড়িয়ে পর্যটনে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। আর তফাতটা সেখানেই।
