চিরদীপা বিশ্বাস
তোমার সময় আর আমার সময়ের মধ্যে একটা হিউজ ডিফারেন্স আছে মা, ইউ নেভার আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট। থেমে থাকা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে বেশ উচ্চস্বরে বলা কথাগুলো আশপাশের পথচারীকে খানিকটা অস্বস্তিতে ফেললেও চিৎকারের তীব্রতা কমল না। অন্যদের মতো আমিও ঘাড় ঘুরিয়ে বক্তার দিকে তাকাতেই অবাক। পরিচিত একজন, তবে ঘনিষ্ঠ নয়, তাই আগ বাড়িয়ে কথা বলার দুঃসাহস দেখালাম না। মায়ের সঙ্গে তার মিনিটখানেকের উত্তপ্ত ফোনালাপে ততক্ষণে আশপাশের লোকজন জেনে গিয়েছেন যে, বক্তা কোনও ‘নিউ ইয়ার রেট্রো থিম পার্টি’তে যাচ্ছে মায়ের কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়ে। ‘টিউশন ফি নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, আমি স্যরের সঙ্গে কথা বলে নেব’ বলে ফোন রেখে গটগটিয়ে সিগন্যালের ওপারে চলে গেল মেয়েটি যার বেশভূষা, আদব-কায়দা দেখে বোঝার উপায় নেই, পিতৃহীন মেয়েটির দু’দিন বাদে মাধ্যমিক এবং তার মা অতীব কষ্টে দিন গুজরান করে মেয়েকে ‘মানুষ’ করার চেষ্টা করছেন।
ক্রিসমাস কিংবা নিউ ইয়ারে এধরনের থিম পার্টির জমজমাটি আয়োজন আজকাল চতুর্দিকেই। দেদার খাওয়া-দাওয়া, হইহল্লা সঙ্গে অফুরন্ত রঙিন জলের ফোয়ারা। এসব পার্টির ভিড়ে যদিও স্কুল পড়ুয়া টু প্রাপ্তবয়স্ক চাকরিজীবী সকলেরই অবাধ বিচরণ। তাই নির্দিষ্ট একটি প্রজন্মের দিকে আঙুল তোলার ভুল করবেন না যেন।
আসলে উল্লাস, উদযাপন কিংবা স্ট্রেস রিলিফের এই পন্থা এক্কেবারে নতুন আবিষ্কার তো নয়। নতুন হল এর ভয়াবহতাটা, নতুন হল সামাজিক মাধ্যমে হিরো হিরোইন সাজার টক্করটা। নিজেকে পণ্য হিসেবে তুলে ধরে লাইক কামানোর নেশাটা। এ যেন ‘সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’-এর এক ভয়ংকর বিকৃত রূপ। নিজেকে যোগ্যতম প্রমাণের তাড়নায় তাই অতি দরিদ্র এক কিশোরী মায়ের কষ্টার্জিত টাকায় ফুর্তি করার সাহস দেখাতে পারে। ‘বাবা, তুমি ব্যাকডেটেড’ বলার আগে দু’বার ভাবে না। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে নিজের স্ট্যাটাস মেলানোর জন্য হাতে আশি হাজার টাকার মোবাইল নিয়ে ঘুরে বেড়ায় অথচ বাড়ির দিন আনি দিন খাই অবস্থা বুকের ভেতর মোচড় দেয় না। বরং রাস্তার মোড়ে ঝুলে থাকা প্ল্যাকার্ডে নিউ ইয়ার থিম পার্টি বা ক্রিসমাস ইভ সেলিব্রেশন-এর বিজ্ঞাপনী প্রচার তাদের ভীষণরকম আকর্ষিত করে।
‘কিন্তু ওরাও তো বাচ্চা মানুষ, ইচ্ছে তো করতেই পারে’ ভেবে নিজের মনেই যখন একটা প্রচ্ছন্ন ভীষণ রকম ভুল সমর্থন খাড়া করব করব ভাবছি, হঠাৎ তখন অনেক দূরে একটি বাচ্চা ছেলেকে দেখলাম, কাঁধে ঝোলা মতো কিছু আর হাতে এক গোছা পেন। আগেও মুখোমুখি হয়েছিলাম স্পষ্ট মনে আছে। বাবা-মা নেই, ঠাকুমার সঙ্গে থাকে। সম্ভবত ক্লাস এইটে পড়ে আর ঘুরে ঘুরে পেন বিক্রি করে। খুব বেশি বিক্রি হয় না যদিও, কারণ রেট্রো পার্টির রঙিন গ্লাসের মতো পেন কি আর স্ট্রেস রিলিফ করতে জানে! ‘দিদি, পেন নিবা?’ ভাবনায় ছেদ পড়ে। দুটো পেন কেনা হয়। ছেলেটা চলে যায় অন্য খদ্দের খুঁজতে, সঙ্গে মাথায় চাপিয়ে যায় বড়লোক হওয়ার বিশাল রকম একটা ভূত। ঠিক ততটা বড়লোক যতটা হলে ওর ঝোলার সবগুলো পেন কিনে নেওয়ার ক্ষমতা জন্মায়।
(লেখক কোচবিহারের বাসিন্দা)
