রাহুল মজুমদার ও শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি: একদিকে ক্রিসমাস আর নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর তোড়জোড়, অন্যদিকে শহরের (Siliguri) অধিকাংশ পাব (Pub) ও বার রাত তিনটে পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্তে পুলিশ এবার অনেক বেশি সতর্ক। তার ওপর বাড়তি মনোযোগ দিতে হচ্ছে বড়দিন এবং নিউ ইয়ার পার্টির আড়ালে ব্রাউন সুগার ও কোকেনের কারবার শহরে জাঁকিয়ে বসায় (Drug)।
পুলিশের নজর এড়াতে উৎসবের মরশুমে মাদক কারবারিরা ব্যবহার করছে অদ্ভুত সব সাংকেতিক নাম। ‘রক’, ‘চার্লি’, ‘অ্যাডাম’, ‘ইভ’, ‘স্নো’ বা ‘নোজ ক্যান্ডি’- অনেকের কাছে অর্থহীন মনে হলেও, এই নামেই শহরের বার, পাব থেকে শুরু করে প্রভাবশালী মহলে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক। সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হল, নেপাল, সিকিম, মিজোরাম ও অসম হয়ে এই মাদক সরাসরি শিলিগুড়িতে জেন জেড প্রজন্মের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। চম্পাসারি মোড় এবং বেঙ্গল সাফারির মতো এলাকা পার করে সেবকের আগের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এই মাদকের হাতবদল হয় বলে সূত্রের খবর।
এই কারবারের মূলে রয়েছে এক অভিনব সরবরাহ ব্যবস্থা। নিজেদের ‘সমাজকর্মী’ পরিচয় দেওয়া কিছু তরুণ আসলে এই মাদকচক্রের ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করছে। এদের মধ্যে একজন সেবক রোড সংলগ্ন এলাকারই বাসিন্দা এবং অন্যজন ভিনরাজ্যের বাসিন্দা হয়েও শিলিগুড়িতে ঘাঁটি গেড়েছে। এজেন্টদের হাত ঘুরে নিয়ম করে এই মাদক পৌঁছে যাচ্ছে শহরের নামী পাবগুলিতে।
সেবক রোডের দুটি পাবে এই মাদক কারবার সবথেকে বেশি বলে অভিযোগ। সেখানে মাদক সেবনের জন্য রীতিমতো ছোট ছোট কুঠুরি বা গোপন কেবিন বুকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে বন্ধুবান্ধব বা প্রিয়জনকে নিয়ে একান্ত সময় কাটানোর আড়ালে চলে মাদক সেবন। সম্প্রতি সেবক রোডের একটি পাবের মালিকের মাদক সেবনের ভিডিও (যার সত্যতা যাচাই করেনি উত্তরবঙ্গ সংবাদ) সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। সেই ভিডিওয় দেখা যাচ্ছে, নিজের পাবে দাঁড়িয়েই বেশ কয়েকজন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে টাকার নোটে মুড়িয়ে কাউন্টারের সামনে রাখা পাত্র থেকে নাক দিয়ে ব্রাউন সুগার টানছেন ওই মালিক, আর বাকিরা তাঁকে উৎসাহ দিচ্ছে।
শিলিগুড়ি পুলিশের কাছে এই ভিডিও পৌঁছানো সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। এ বিষয়ে ডিসিপি (সদর) তন্ময় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বা এসএমএসের জবাব দেননি। শুধু পাব বা বার নয়, ‘কোড নেম’ ব্যবহার করলে শহরের যে কোনও পার্টিতে বা পছন্দের জায়গাতেও এই মাদক মিলছে দেদার।
মাদকের এই অবাধ বিস্তারের পাশাপাশি রাত ৩টে পর্যন্ত পাব খোলা রাখায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। গত বছর ৩১ ডিসেম্বর রাতে সেবক রোড সহ বিভিন্ন রাস্তায় একাধিক দুর্ঘটনা ও গাড়ি উলটে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এই আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে বিহারি সেবা সমিতির মতো সংগঠন রাত ১০টার মধ্যে পাব বন্ধের দাবিতে পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে। আইনজীবী মণীশ বারির মতে, ‘বছরের শেষ সপ্তাহে রাতে শহরে ট্রাফিক নজরদারির অভাবে লাগামহীন মাতলামি চলে। তাই প্রশাসনের কঠোর হওয়া উচিত। যদিও ডিসিপি (ট্রাফিক) কাজি সামসুদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ট্রাফিক সামলাতে ১০টি বিশেষ আউটপোস্ট তৈরি করা হচ্ছে এবং কড়া নজরদারি থাকবে। বিধায়ক শংকর ঘোষ প্রশাসনিক মদতের অভিযোগ তুলে পুলিশ কমিশনারের দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকার মাদক কারবারের ঘটনাকে ‘অপপ্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। মুম্বই-দিল্লি থেকে আসা ডিজে, লাইভ ব্যান্ড আর ককটেল পার্টির চাকচিক্যের আড়ালে শিলিগুড়ির যুবসমাজ যেভাবে মাদকের গ্রাসে তলিয়ে যাচ্ছে, তা রুখে দেওয়াই এখন প্রশাসনের কাছে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
