- মনোনীতা চক্রবর্তী
ক্ষমার গায়ে বুকভাঙা প্রপাত। সুখের গায়ে নিরাময়হীন অসুখ। পোশাকের গায়ে শতচ্ছিন্ন মিছিল ও মোম। চামড়ার গায়ে চিলশকুনের উদ্দাম সংগত। রক্তের কত শেড কার্ড! ক্ষয়ের ভিতর ভুল সুর। বিভাজিকায় অপ্রতিরোধ্য উড়ান। প্রযুক্তির ভাঁজে ভাঁজে বিনিময়ের কৌশল। শ্লীল-অশ্লীলের মাঝের সূক্ষ্ম রেখায় গাঢ় কালো মার্কারের হিজিবিজি ভোঁতা দাগের ভিতর অশালীন সময়। উল্লেখযোগ্য এক-একটি অন্ধকার ও জখম। এবং উৎসব। পেলবতা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে অমসৃণ। চারপাশে হিসেব হিসেব হিসেব; কেবল হিসেবের ছোবল। সন্ধানী ও সুযোগসন্ধানী কখন কোথায় হাত মেলাচ্ছে, মেলাচ্ছে পা; বোঝার আগেই সব বদলে যাওয়া সংলাপ। নাগরদোলায় খিদে, ভিক্ষে, লাভ ও লোভ। আহুতির আগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে যজ্ঞ। এবং উৎসব। শরীরের ঘন স্রোতে কিলবিল কীট। এবং কীটনাশক। ঘূর্ণনের ভিতর যাবতীয় বাঁশি লুটের স্বঘোষিত অযোগ্য সংলাপ। কুঞ্জবনের ভ্রমর কোথায়? উধাও হাইপার আরাধিকা। শিউলি তো যত না গাছে, তার চেয়ে বেশি উইভিং শাড়ির বিস্তারে। কুঁচিতে রাত পেরিয়ে যাওয়া গল্প। এবং উৎসব। শিশির এখন সারাবছর। বেছে নিয়েছে নরম দূর্বা নয়, আঁখিপল্লব। অনিশ্চয়তার ভিতর জীর্ণ, পরিত্যক্ত জীবিকাহারার হাহাকার; স্তব্ধতা। ঢাকে তবু কাঠি পড়ে। ঘাটে ঘটে মিলে অপেক্ষা ও উন্মাদনা। উড়ে যায় আকৃতিহীন আকুলতা। কাঠামোয় মাটি। চক্ষুদান। মাথা, গলা, বুক, পেট, কোমর, পা সেজে ওঠে নিজস্ব নিয়মে। মাতৃরূপেণ সংস্থিতা… কুমোরের আদর ও অব্যক্ত যন্ত্রণায় দেবীজন্ম।
ম-ম করা নতুন পোশাকের ভিতর ঝাঁঝালো গন্ধ। জিএসটিবিহীন হাসিতেও নেই আনারকলি ঘের! কৃত্রিমতা, কেবল অকৃত্রিম হিংসা। প্যান্ডেল নির্মাণের শীর্ষে ওঠা শ্রমজীবীরা বিপি চেক করে না। রক্তের চাপের তোয়াক্কা না করা মানুষের চিলতে হাসিতে বিষ নয়, আনন্দ থাকে। জ্বলজ্বলে দুটি মণিতে স্বপ্নপূরণের স্বপ্ন। বিরোধহীন পৃথিবী তার কাছে, এবং অনেক ‘তার’ কাছে। সভ্যতার ছিন্নভিন্ন লাশের ভেতর ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে সাবধানি পা। আত্মহোম এবং অস্ত্রের দোতারায় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। এবং উৎসব। সভ্যতা ধুঁকছে। মুখ লুকোচ্ছে। পালাচ্ছে। মরছে। পচছে। গলছে। সভ্যতার দুই জঙ্ঘার হাড় ফাটিয়ে দিয়ে মাঝখান দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া ধাতব রড, উদযাপনের উল্লাস। মৃত হলেও অসুবিধে নেই। সভ্যতা তো, নারী। বেবাক যাদের এখনও এগিয়ে আসা সমাজ দিব্যি ব্যঞ্জনবর্ণের মতো জুড়ে যায় ছেলেদের ঘাড়ে; ছেলেরা তো স্বরবর্ণ। আর মেয়েরা ‘মেয়েছেলে’! এবং উৎসব। নারীশক্তির আবাহনে মত্ত, যারা মাটি আর মাংস গুলে খেতে খেতে গিলে খায় দুর্লভ চেতনা! মৃন্ময়ী-চিন্ময়ী বিভাজনে জনারণ্যে মিশে যাচ্ছে অসুরের দল। এই ‘অসুর’ কমন জেন্ডার। এত ‘মা মা’ করতে করতে ভুলে গিয়েছে চোখের জলের ডাকে সাড়া দিতে! তাই তো, পুজোর ছুটিতে সপরিবারে ঘরে মাকে অথবা শাশুড়িমাকে একলা তালাবন্ধ ফ্ল্যাটে রেখে দিব্যি সমুদ্রনীল প্রকৃতির বুকে অথবা শব্দহীন পাহাড়জুড়ে স্ত্রী, সন্তান সহ রিয়েল লাইফ থেকে সরে, রিল লাইফের ধুমধাড়াক্কা উজাড়! এবং উৎসব। তিরের বেগে ছুটছে ত্রাস! নিটোল টোল থেকে উপচে পড়ছে সভ্যতার হাড়-মাস! এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালানোর মানুষ আণুবীক্ষণিক! মরা পাতার ভিতর বন্দিনীর ছায়া। ছায়ার বিপরীতে ছদ্মবেশ। ভুল সময়। ভুল মানুষ। আক্রান্ত আর আক্রমণকারীর এক দুরন্ত যুগলবন্দি। এসবই সময়ের উপচার। এসবই শারদসম্ভার। এসবই স্তুতিস্তব; আজকের সময়ে। কোথায় সেই মহামানব, যাকে নির্ভয়ে বলা যায় — ‘হে মহামনব, একবার এসো ফিরে
শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভিড়ে,
এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার;
লাকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।’
তবু শর্ত থেকে সরে শরৎ আসে। কাশগুচ্ছ থেকে একটি বা দুটি তুলোফুলের ডাঁটি ধরে আমরা বিভোর থাকি সেলফি তুলতে। ইনফ্যাক্ট আমরা দুটো মোডে অর্থাৎ সেলফি ও সাইলেন্ট মোডে ভীষণ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি! তাই আরাধনা বন্দি হয়ে যায় শো-অফে; কাপল-ওয়্যারে। রং সে রং মিলানা তো পরেগা হি… জি, হুজুর ঔর হুজুরানি, এইসব ম্যান্ডেটরি। এসব না করলে পাপ হয়। এমন দিনে স্খলিত, শিথিল কামনার মহাভার নেওয়ার প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়ে যায়। এমন দিনে শারদসংখ্যার মলাটে ফ্যাকাশে শুকনো চুলের ড্যাবড্যাবে চোখের কন্যাটি কাশফুল আর পদ্মকুঁড়ি বুকে-কাঁধে ফেলে ঠায় জেগে থাকে। প্যানেল ডিসকাশন হয়। নতুন বইয়ের গন্ধে মাতাল হয় অডিটরিয়াম। আরও কত কী! সেসব সমাজমাধ্যমে পুজোর জানান দেয়। প্রেম পর্যায় আর পূজা পর্যায় মিলেমিশে সুরম্য সোহাগ হয়। ১২০ ঘণ্টার হ্যাংওভার। মহালয়া পেরিয়ে গেলেও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ জারি থাকেন। মাইকে শত কণ্ঠের সংরাগ। লটারির ফলাফল ঘোষণা। সান্ধ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ঘোষণা। বিজ্ঞাপনের ক্লান্তিহীন সহাস্য দাঁড়িয়ে থাকা। আবার পোজড ক্লিকে তথাকথিত সমাজসেবীদের গৌরবান্বিত উজ্জ্বল মুখ ও বস্ত্র বিতরণের ধারাবিবরণী। উজ্জ্বল থিমের ভিতর অনুজ্জ্বল জীবনের ধামসা, মাদলের ছন্দে পায়ে পা মেলানো; বেশুমার ডোপামিন বর্ষণ!
১০৮টি পদ্ম ও প্রদীপের মায়াময় যুগলবন্দি ছড়িয়ে থাকে দেবীমঞ্চের পবিত্রতম বেদিতে। কলাবৌ রেডি। সপরিবারে দেবী হাজির। ‘তথাকথিত’ বারাঙ্গনার বাড়ির মাটির সুঘ্রাণ। যদিও ঘরে ঘরে লালবাতি ও দালালের অভাব নেই, তবুও ওই আলাদা করে ‘বেশ্যাবাড়ি’-র মাটির উল্লেখ না করা ঘোর পাপ, হিন্দুরীতি বলে কথা! যাইহোক, ষষ্ঠীর আড্ডা। ডে–আউট, হ্যাংআউট, প্রদর্শনীর কক্ষে কক্ষে বিবিধ উপচার।
প্রথম কক্ষ– অশক্ত ফ্রেমে মালা ঝোলানো আগুন যুবক, মেধাবী মনন
দ্বিতীয় কক্ষ– শিক্ষকের লাঠি ও লাথির সাদা-কালো প্রিন্টআউট নেওয়া এ ফোর সাইজের ছবি
তৃতীয় কক্ষ– বাইরে পড়তে পাঠানো সন্তানের চিরদিনের মতো না ফেরার খবরে অথবা বলাৎকারে মৃত কর্তব্যরত সন্তানের বাবা-মায়ের টুকরো টুকরো জীবন্ত লাশের পোড়ামাটির মূর্তি
চতুর্থ কক্ষ– মর্গের পাশে অপেক্ষারত প্রেমিক। এবং অপ্রেমিক
পঞ্চম কক্ষ-– অনড় মেয়েটির বুকে সাঁটা রক্তে লেখা একটা সাদা কাগজ – ‘আমার কোনও দাম্পত্য ছিল না কোনওদিন!’
ষষ্ঠ কক্ষ — বোঝাই করা শেকল পরানো আট থেকে আশি; জলরঙে
সপ্তম কক্ষ – প্রাণপণ চেষ্টা স্বামীর পাঠানো বাবুর মনোরঞ্জনের ভাস্কর্য
অষ্টম কক্ষ — মোবাইল ফোনে আটকে থাকা অসংখ্য পলকহীন নেশাচ্ছন চোখ। মিনিয়েচার পেন্টিং
নবম কক্ষ – রাজপথে হাঁটিয়ে নিয়ে চলা উলঙ্গ নারীর চলমান চিত্র
দশম কক্ষ — অপ্রেমিকদের স্ক্রিনশট ও ভাইরাল হওয়া যাপন, অবিশ্বাসের বাজারে, ডোকরা শিল্পের গ্যালারিতে
আপাতত, আর কোনও কক্ষে প্রবেশ করার সাহস ও শক্তি কোনওটিই ছিল না। অতএব…
মৃন্ময়ী মায়ের প্রাণপ্রতিষ্ঠায় আচারের খামতি নেই বিন্দুও। মায়ের বোধন। কিন্তু একটা প্রশ্ন বড় জাগে। আমার সুকান্ত ভট্টাচার্যকে মনে পড়ে। মনে পড়ে ‘বোধন’। এই দশ হাত কী কাজে আসে, মা গো, যদি চেতনার বোধন না হয়! বিসর্জনেই কি তবে এঁকে দেওয়া হয় না বোধন চিহ্ন? অথবা…
হে দেবী, কোথায় তোমার ত্রিনয়নের অহংকার? কেবল কি কোমর পেরোনো চুলের অন্ধকার! তবে কী লাভ ঐতিহ্যের এই কলরোলের? শিরদাঁড়ার অহংকারটুকুও তো ছড়িয়ে দিতে পারতে সভ্যতার অসংলগ্ন দেহে। অশালীন সময়ের বুকে তো ছুঁইয়ে দিতেই পারতে তোমার ঠোঁটের ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আসা আতর! পারতে না? না, করলে না তেমন কিছুই।
‘হে জীবন, হে যুগসন্ধিকালের চেতনা’ – আর কতকাল! কতকাল! তুমি জাগো জাগো জাগো…
