আচাভুয়া পাখির মতোই সে ফিরে ফিরে আসে – Uttarbanga Sambad

আচাভুয়া পাখির মতোই সে ফিরে ফিরে আসে – Uttarbanga Sambad

শিক্ষা
Spread the love


  • সুমন গোস্বামী

আকিরা কুরোশাওয়া তাঁর স্বপ্নগুলোকে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছিলেন সেলুলয়েডে। সে স্বপ্নের ছবি (Desires) আমাদের ভ্যান গগের চিত্রকলার দুনিয়ায় নিয়ে যায়; নিয়ে যায় এক আশ্চর্য ইউটোপিয়ান গ্রামে, যেখানে লোভী সভ্যতার বিষ নেই, মানুষের আয়ু একশো বছরেরও বেশি। সুখস্বপ্নের পাশে কুরোশাওয়া কি দুঃস্বপ্নও দেখেননি? পরমাণু চুল্লির বিষ কীভাবে ধ্বংস করছে একটা সভ্যতা, তা-ও তো তিনি দেখেছিলেন। হ্যাঁ, ফুকুশিমা দাইচি ঘটার আগেই ক্ষণজন্মা এই মানুষটি দেখে ফেলেছিলেন, কী ঘটতে চলেছে। কুরোশাওয়ার সেই আশ্চর্য ছবি যেন আসলে স্বপ্নকে ধরে রাখারই ছবি। স্বপ্নকে বুকে চেপে চলার ছবি। মানুষ কি আসলে স্বপ্ন দেখার জন্যই বেঁচে থাকে না? স্বপ্ন দেখতে দেখতেই বাঁচে না!

ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি বেতিলা গ্রামের কথা। শুনেছি পুকুরপাড়ে মাছের ঘাই। শুনেছি বৈঁচি ফুলের মালা আর বিশাল পদ্মা। সে বেতিলা গ্রামেই চলেফিরে বেড়াতেন এক মানুষ। যিনি পরে চলে যান সে মাটি থেকে অনেক দূরে। মানুষটার স্বপ্ন কী ছিল? একবারটি ফিরে যাওয়া সে মাটির কোলে? কেমন গন্ধ সেখানকার মাটির? শখ ছিল, ডাক্তার হবেন। হয়ে গেলেন স্কুল মাস্টার। পরবর্তীতে রাষ্ট্রনায়কদের কারিকুরিতে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সহ পড়ি কি মরি পালিয়ে এসে ঠাঁই মেলে কোন সে পাণ্ডববর্জিত ডুয়ার্সের কোলে। চা বাগানের মালের হিসেব করতে করতে মানুষটি কি ডুয়ার্সের ছোট্ট নদীর সঙ্গেও কথা বলতেন? ফেলে আসা বেতিলা, ফেলে আসা রংপুরকে ছোঁয়ার চেষ্টা করতে করতেই না কেটে গেল গোটা জীবন। আবার যদি… একটিবার যদি…। বার্লিন প্রাচীর ভেঙে দুই জার্মানি এক হল, আহা, দুই বাংলাও কি পারে না তেমনটি? শেষ ক’টি নিঃশ্বাস ফেলার সময়েও মৃত্যু ছুঁইছুঁই গলায় সে গান গেয়ে যান তিনি তৃতীয় প্রজন্মের কানে। বৈঁচি ফুল, পুকুরপাড় আর পদ্মা সহ গোটা বেতিলা ভেসে থাকে সে স্বপ্নে। যে স্বপ্নের জন্ম হয়েছিল কেবল ভেঙে যাবার জন্যই।

আটাত্তরটি বছর আগের কথা! সে ছিল এক মায়াবী স্বপ্নের রাত! মধ্যরাতের অভূতপূর্ব ভাষণে পণ্ডিতজি জানান দিয়েছিলেন গোটা বিশ্বকে যে, ভারত নামে এক নতুন স্বপ্নের জন্ম হয়েছে। অবশেষে প্রায় দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান। আসমুদ্রহিমাচল দুলে উঠেছিল একটিমাত্র শব্দে- স্বাধীনতা!! স্বপ্ন ছোঁয়ার সীমাহীন আনন্দে দোদুল্যমান এই উপমহাদেশ। এ দেশ এখন আমাদের। কী হয়, কেমন হয় স্বাধীনতা? তেভাগা বা তেলেঙ্গানার কৃষকরা গুলিবিদ্ধ হবার সময় কি এই প্রশ্ন করেছিলেন? ব্রিটিশ পুলিশের গুলির থেকে স্বাধীন দেশের স্বাধীন বুলেট তাঁদের রক্ত ঝরিয়েছিল বেশি। মিজোরাম-নাগাল্যান্ড-মণিপুরে ভারী মিলিটারি বুটের আওয়াজের স্বপ্ন কি ভুলেও লালন করেছিলেন কেউ? ‘এক দশকে সংঘ ভেঙে যায়’- বলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। স্বাধীনতার মায়াবী স্বপ্নও কি ভেঙে যায়নি? আর থাকবে না শোষণ- ভুল; আর সইতে হবে না অত্যাচার- ভুল; নিজের মতটা জোর গলায় বলতে আর থাকবে না বাধা- ভুল, ভুল, ভুল। দেশভাগ আর দাঙ্গার দগদগে ক্ষত সহ যে স্বাধীনতা এসেছিল, তা আর নতুন কোনও ব্যথা দেবে না- এমনটাই তো ভেবেছিলেন সবাই! কিন্তু তা কি আর পাওয়া গেল? এমন স্বাধীনতা তো চায়নি দেশের কোটি কোটি মানুষ! ধীরে ধীরে চুপসে যেতে থাকা সে স্বপ্নের ফানুস তাই তৈরি করছিল আশাভঙ্গের চোরাস্রোত। পড়শি দেশগুলির সঙ্গে পরপর যুদ্ধ আর উগ্র জাতীয়তাবাদের ফেনিল স্রোতও সে চোরাস্রোতকে দমাতে পারেনি কখনও। বুকের মাঝে তীব্র মোচড়ানো ব্যথা হয়ে সে থেকেই গেছে- স্বপ্নভঙ্গের ব্যথা! যা যা কিছু পাবার কথা ছিল- তা না-পাবার ব্যথা। এক দশকে স্বপ্নও ভেঙে যায় …। আচ্ছা, ব্যথা কি আবার কোনও স্বপ্নেরও জন্ম দেয়?

‘জগতের ব্যাখ্যা নয়, তার পরিবর্তন করাটাই আসল কাজ’ – কী অমোঘ স্বপ্নিল উচ্চারণ! উনিশ শতক থেকে গোটা বিশ্বের আনাচে-কানাচে লালিত হয়ে আসছে এই স্বপ্ন। বিশ শতকের ছয়ের দশক ছিল সে স্বপ্নের উল্লম্ফনের যুগ। ছোট্ট দেশ ভিয়েতনাম রুখে দিচ্ছে মার্কিন দাদাগিরি। ছায়াচ্ছন্ন আফ্রিকার বুকে জ্বলন্ত মশাল হাতে উঠে দাঁড়াচ্ছেন প্যাট্রিস লুমুম্বা। চে গেভারার স্বপ্ন বুকে নিয়ে উত্তাল আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে দামাল তরুণ-তরুণীরা। পাড়ার রাস্তায় সেনাবাহিনীর সামনে ব্যারিকেড গড়ছেন ছাত্ররা। সটান সেই ব্যারিকেডে উঠে বক্তৃতা করছেন জাঁ পল সার্ত্র। এ স্বপ্ন বড় ছোঁয়াচে! এসে পড়ল আমাদের ঘরেও। উত্তরের অখ্যাত অজ্ঞাত এক গ্রাম নিমেষে হয়ে উঠল আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান। দেওয়ালে দেওয়ালে রচিত হল স্টেনসিলে আঁকা মাও জে দং-এর মুখ। পাশে সেই অমোঘ লাইন- ‘বন্দুকের নলই রাজনৈতিক শক্তির উৎস’। নতুন এক তাজা স্বপ্ন বুকে ঘর ছাড়লেন এক দঙ্গল তরুণ-তরুণী।

                কত মানুষ ঘর ছেড়েছিলেন তখন? ঘরে আর ফিরতে পারলেন না কতজন? রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা ইতিউতি লাশেদের ভিড়ে জমে ছিল কত কত মায়ের কান্না? আস্ত একটা প্রজন্ম মেতে উঠেছিল বিপ্লবের স্বপ্নে। তারপর কেটে গিয়েছে বেশ ক’টা বছর। সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করার স্বপ্ন কোনও রাতজাগা আচাভুয়া পাখির মতোই গান গাইতে গাইতে মিলিয়ে গিয়েছে কালো ভ্যানের অন্ধকারে।

মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে কবে থেকে? এ প্রশ্নের উত্তর মানুষ এখনও পায়নি। তবে বুকের মধ্যে কঠিন কোনও কোণে আশার ধুকপুকুনি থাকলেই স্বপ্নের বেঁচে থাকা আছে, তার ডানা মেলা আছে। আর আশা হারালে আর মানুষ কী? তাই স্বপ্নও আছে। তার ভেঙে যাবার, মহাকালের বুকে লীন হয়ে যাবার প্রবল ভবিতব্য নিয়েই দিব্যি আছে। ভেঙে যায় সে, বারবারই ভেঙে যায়। কিন্তু আবার ফিরেও কি আসে না? রোয়াইঙ্গা (রোহিঙ্গা) শরণার্থীদের নিজের মাটিতে ফেরার ইচ্ছার মধ্যেই বেতিলা আর পদ্মাপার ঘুমিয়ে আছে। প্যালেস্তাইনের ধ্বংসস্তূপে একগুচ্ছ সাহায্য প্রত্যাশী শিশুর চোখেই ’৪৭ পূর্ববর্তী স্বপ্ন খেলা করছে, চুপচাপ অপেক্ষা করছে সব পেয়েছির আনন্দের বিস্ফোরণ। সত্তরের স্বপ্ন আবার ফিরে আসে নতুন শতকে বস্তারের বুকে। কাস্ত্রো-গেভারারা দিব্যি জেগে ওঠেন নেপালের পাহাড়ে। সাঙ্কারা আর লুমুম্বার অসম্পূর্ণ স্বপ্ন আবার দেখা দেয় ইব্রাহিম ট্যারোরে-র সতেজ ভাষণে। এ যেন কখনও না থামা এক রিলে রেস। ব্যাটনটা হাতবদল হয় শুধু। স্বপ্ন একেবারে মরে না। ভাঙে, কিন্তু মরে না। আচাভুয়া পাখির মতোই সে ফিরে ফিরে আসে- রৌদ্রে, বৃষ্টিতে, কুয়াশায়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *