(কর ভার লাঘবের পাশাপাশি শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বাস্তব সমীকরণ।)
শেখর সাহা
পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী ডঃ স্বপন দাশগুপ্ত সম্প্রতি রাজ্যের অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রসঙ্গে জার্মানির যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের উদাহরণ টেনে যে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন তা স্বাভাবিকভাবেই গভীর কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত পশ্চিম জার্মানি মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্প বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ প্রশাসন এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সমন্বিত নীতিই ছিল এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে। অনেক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মনে করেন, প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সবসময় করবৃদ্ধি করা একমাত্র পথ নয়; বরং উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতির সামগ্রিক আকার বড় করাই রাজকোষের আয় বাড়ানোর অধিক কার্যকর পন্থা।
জার্মানির সেই বিখ্যাত অর্থনৈতিক বিস্ময়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল বাজারকে গতিশীল করা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। যুদ্ধোত্তর সময়ে সেখানে মূল্যনিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়, শিল্প উৎপাদনে বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয় এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করা হয়। এর ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, শ্রমিকের মজুরি বাড়ে এবং অভ্যন্তরীণ বাজার অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ তৎকালীন সরকার করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির পথ বেছে নিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে এই দর্শন অনুসরণ করার অর্থ হল শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আনা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা কমানো।
এই প্রেক্ষাপটেই পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর কমানোর প্রশ্নটি সামনে আসে। জ্বালানির মূল্য কমলে পরিবহণ ব্যয় সরাসরি হ্রাস পায় এবং কৃষিপণ্য থেকে শিল্পপণ্য পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে উৎপাদন ও বিপণন খরচ কমে। ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমতে পারে এবং সাধারণ মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকে, যা তারা অন্যান্য পণ্য ও পরিষেবা ক্রয়ে ব্যয় করতে পারেন। এর ফলে বাজারে নতুন চাহিদা বাড়ে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হয়। এই যুক্তি থেকেই অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, করের বোঝা কমিয়ে জনগণের হাতে বেশি অর্থ তুলে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি জার্মানি ও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এক নয়। যুদ্ধোত্তর জার্মানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মার্শাল প্ল্যানের অধীনে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা পেয়েছিল, যা তাদের শিল্প ও অবকাঠামো পুনর্গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের সামনে সেই ধরনের কোনও বাহ্যিক সহায়তার সুযোগ নেই। উপরন্তু, রাজ্যের নিজস্ব বিপুল ঋণের বোঝা, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের ব্যয়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্রমবর্ধমান খরচ এবং অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা সরকারকে নিয়মিত রাজস্ব সংগ্রহে বাধ্য করে। ফলে কর কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া তাত্ত্বিকভাবে যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে তা ততটাই জটিল।
নতুন শিল্প, প্রযুক্তি বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখী উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি না হলে কর কমানোর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না, বরং রাজ্যে তীব্র রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই জার্মান মডেলের কথা বলা হলে শুধু কর কমানো নয়, একই সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং শিল্পায়নের রূপরেখাও স্পষ্ট করতে হবে। এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শিল্পায়নের বাস্তব রূপরেখা। জার্মানির অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ আমাদের জন্য অবশ্যই অনুপ্রেরণা হতে পারে, তবে পশ্চিমবঙ্গকে তার নিজস্ব বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেই উন্নয়নের নতুন পথ খুঁজে নিতে হবে।
(লেখক অক্ষরকর্মী। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)

